অতএব, প্রথম দিকে দুয়ের মধ্যে পার্থক্য কেবল পরিমাণগত। আমরা দেখিয়েছি যে একটি নির্দিষ্ট মূলধনের দ্বারা উৎপাদিত উত্তমূল্য সমান (=) প্রত্যেকজন শ্রমিকের দ্বারা উৎপাদিত উত্তমূল্য গুণ (x) একসঙ্গে কর্মরত শ্রমিকদের সংখ্যা। শ্রমিকদের নিছক সংখ্যা উত্তমূল্যের হার বা শ্রম শক্তির শোষণের মাত্রা—কোনটাকেই প্রভাবিত করে না। যদি ১২ ঘণ্টার একটি শ্রম দিবস ছয় শিলিংয়ে মূর্ত হয়, তা হলে এই রকম ১,২০০টি শ্রম-দিকা মূর্ত হবে ৬ শিলিংয়ের ১,২০০ গুণ শিলিংয়ের অঙ্কে। এক ক্ষেত্রে অন্তভুক্ত হয় ১২x১,২০০ শ্রম ঘণ্টা, অন্য ক্ষেত্রে উৎপন্ন ফলের মধ্যে অন্তভুক্ত হয় এইরকম ১২ ঘণ্টা। মুল্যের উৎপাদনে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক শ্রমিক কেবল তত জন ব্যক্তিগত শ্রমিক হিসাবে গণ্য হয়। সেই কারণে ১,২০০ জন মানুষ আলাদা আলাদা ভাবেই কাজ করুক আর একজন ধনিকের নিয়ন্ত্রণে ঐক্যবদ্ধ ভাবেই কল করুক, তাতে কিছু এসে যায় না।
যাইহোক, নির্দিষ্ট মাত্রার মধ্যে একটি পরিবর্তন ঘটে। মূল্যে রূপান্তরিত এম হচ্ছে একটি গড় সামাজিক গুণমানের শ্রম; স্বভাবতই তা গড় শ্রমশক্তির ব্যয়। কিন্তু যে-কোন গড় আয়ন হল কতকগুলি আলাদা আলাদা আয়তনের গড়, যে আয়তনগুলি প্রকৃতিতে অভিন্ন, তবে পরিমাণে বিভিন্ন। প্রত্যেকটি শিল্পে, প্রত্যেকজন ব্যক্তিগত শ্রমিক, তা সে পিটার হোত বা পল হোক, গড় শ্রমিক থেকে পৃথক। এইসব ব্যক্তিগত পার্থক্য, বা গণিত শাস্ত্রে যাকে বলা হয় “বিচ্যুতি, পরস্পরের কতিপুরণ করে দেয় এবং যখনি একটি ন্যূনতম সংখ্যক শ্রমিক এক সঙ্গে কর্ম-নিযুক্ত হয়, তখনি তা অস্তৃহিত হয়। প্রসিদ্ধ তার্কিক ও স্তাবক এভণ্ড বার্ক এতদূর পর্যন্ত যান যে, কৃষক হিসাবে তাঁর বাস্তব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি সজোরে এই উক্তি করেন। পাঁচজন কৃষিশ্রমিকের একটি এত ক্ষুদ্র উপদলেও সংশ্লিষ্ট শ্রমে ব্যক্তিগত সমস্ত পার্থক্য অন্তর্হিত হয়ে যায় এবং সেই কারণে যে-কোনো পাঁচ জন বয়স্ক কৃষি-শ্রমিক সমষ্টিগত অন্য যেকোনো পাচ জনের সমপরিমাণ কাজই করবে।[১] কিন্তু সে যাই হোক না কেন, এটা পরিষ্কার যে, একই সঙ্গে নিযুক্ত একটি বৃহৎ-সংখ্যক শ্রমিকের একটি সমষ্টিগত শ্রম-দিবসকে এই শ্রমিকদের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে গড় সামাজিক শ্রমের একটি দিবস পায়া যায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ধরা যাক, প্রত্যেকজন ব্যক্তির শ্রম-দিবস ১২ ঘণ্টা করে। তাহলে একই সঙ্গে নিযুক্ত ১২ জন মানুষের সমষ্টিগত শ্রম দিবস হবে ১৪৪ ঘণ্টা; এবং যদিও এই এক ডজন মানুষের প্রত্যেক জনেরই শ্রম গড় সামাজিক শ্রম থেকে কম-বেশি বিচ্যুত হতে পারে, কেননা একই কাজের জন্য তাদের প্রত্যেকেরই লাগতে পারে বিভিন্ন সময়, তবু যেহেতু প্রত্যেকেরই এম-দিবস হচ্ছে ১৪৪ ঘণ্টার সমষ্টিগত শ্রম-দিবসটির বারো ভাগের এক ভাগ, সেই হেতু তা একটি গড় সামাজিক শ্রম দিবসের সবকটি গুণের অধিকারী। তবে কিন্তু ধনিকের দৃষ্টিকোণ থেকে, যিনি এই ১২ জন লোককে নিয়োগ করেন, এম দিবসটি হচ্ছে সেই গোটা এক ডজনেরই শ্রম দিবস। প্রত্যেকটি ব্যক্তিগত মানুষের দিবস হল সমষ্টিগত এম-দিবসের একাংশ, তা সেই ১২ জন মা তাদের কাজে পরস্পরকে সহায়তা করুক বা তাদের কাজের মধ্যে সংযোগ কেবল এই ঘটনায় এক যে তারা একই ধনিকের জন্য করছে, তাতে কিছু এসে যায় না। কিন্তু যদি ঐ ১২ জন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ক্ষুদ্র মালিকের দ্বারা ছয়টি জোড়ায় নিযুক্ত হয়, তা হলে প্রত্যেকটি মালিক একই মূল্য উৎপাদন করে কিনা এবং, ফলত, প্রত্যেকেই উদ্বৃত্ত-মূল্যের সাধারণ হারটি আয়ত্ত করে কিনা, তা হবে একটি দৈবাৎ ব্যাপার। ব্যক্তিগত ক্ষেত্রগুলিতে বিভিন্ন বিচ্যুতি ঘটবে। যদি একজন শ্রমিক সামাজিক ভাবে আবশ্যক শ্রমের তুলনায় বেশ কিছু বেশি শ্রম লাগায়, তা হলে তার ক্ষেত্রে আবশ্যিক শ্রম-সময় যুক্তিযুক্ত ভাবেই সামাজিক ভাবে আবশ্যক গড় শ্রম থেকে বিচ্যুত হবে এবং সেই কারণেই তার এম গড় শ্রম হিসাবে গণ্য হবে না, তার শ্রমশক্তিও গড় শ্রমশক্তি বলে গণ্য হবে না। তা হলে, হয়, সেটা আদৌ বিক্রয়যোগ্য হবে না, আর নয়তো, শ্রমশক্তির গড় মূল্য থেকে কিছু কমে বিক্রয়যোগ্য হবে। সুতরাং সমস্ত শ্রমেই একটা নির্দিষ্ট ন্যূনতম মাত্রায় নৈপুণ্য ধরে নেওয়া হয় এবং পরবর্তী আলোচনায় আমরা দেখতে পাব যে, ধনতান্ত্রিক উৎপাদন এই ন্যূনতম মাত্রা নির্ধারণের উপায়েরও ব্যবস্থা করে। যাইহোক, এই ন্যূনতম মাত্রা গড় থেকে বিচ্যুত হয়, যদিও, অপর পক্ষে, ধনিককে দিতে হয় শ্রম শক্তির গড় মূল্য। ছয় জন ক্ষুদ্র মালিকের মধ্যে একজন আদায় করে নেবে উত্ত মূল্যের গড় মূল্যের বেশি, অন্য জন তার কম। সমগ্র সমাজের বেলায় এই বৈষম্য গুলির ক্ষতিপূরণ ঘটে যায়, কিন্তু ব্যক্তিগত উৎপাদনকারীর বেলায় তা ঘটে না। সুতরাং যখন ব্যক্তিগত উৎপাদনকারী ধনিক হিসাবে উৎপাদন করে এবং এমন সংখ্যক শ্রমিককে একসঙ্গে নিযুক্ত করে যাদের শ্রম তার সমষ্টিগত প্রকৃতির দরুণ সঙ্গে সঙ্গেই গড় সামাজিক শ্রম হিসাবে চিহ্নিত হয়ে যায়, কেবল তখনি মূল্য উৎপাদনের নিয়মগুলি তার পক্ষে পুরোপুরি কার্যকরী হয়।[২]
