যাই হোক, এমনকি এই ক্ষেত্রেও উত্তমূল্যের বর্ধিত উৎপাদনের উদ্ভব ঘটে আবশ্যিক শ্রমময়ের হ্রাস-সাধন থেকে এবং উত্তমের আনুষঙ্গিক দীর্ঘায়ন থেকে। ধরা যাক, আবশ্যিক শ্রম-সময়ের পরিমাপ হচ্ছে ১০ ঘণ্টা, এক দিনের শ্রমশক্তির মূল্য হচ্ছে পাঁচ শিলিং, উদ্বৃত্ত শ্রম-সময় ২ ঘণ্টা এবং দৈনিক উত্ত মূল্য এক শিলিং। কিন্তু ঐ ধনিক এখন উৎপাদন করছে ২৪টি জিনিস, যা সে প্রত্যেকটি বিক্রি করছে ১০ পেন্স করে এবং মোট পাচ্ছে ২০. শিলিং। যেহেতু উৎপাদনের উপায়-উপকরণের মূল্য হল ১২ শিলিং, সেহেতু এই জিনিসগুলির ১৪ ২/৫ ভাগ আগাম দেওয়া স্থির মূলধনের পুনঃ সংস্থান করতে। ১২ ঘণ্টার এম-দিবসের শ্রমের প্রতিনিধিত্ব করে বাকি ৯ ৩/৫ জিনিস। যেহেতু শ্রমশক্তির দাম হচ্ছে ৫ শিলিং, সেই হেতু আবশ্যিক শ্রম-সময়ের প্রতিনিধি করে ৬টি জিনিস এবং উত্তমের প্রতিনিধিত্ব করে ৩ ৩/৫ ভাগ জিনিস। গড় সামাজিক অবস্থায় উদ্ধত্ত-এমের সঙ্গে আবশ্যিক শ্রমের যে অনুপাত থাকে ৫:১, সেই অনুপাত এখন দাঁড়ায় কেবল ৫:৩। নিম্নলিখিত উপায়েও এই একই ফলে উপনীত হওয়া যায়। ১২ ঘণ্টার এম-দিবসের উৎপাদনের মূল্য ২০ শিলিং। এই ২০ শিলিংয়ের মধ্যে ১২ শিলিং হচ্ছে উৎপাদনের উপায়-উপকরণের মূল্য—এমন একটি মূল্য যার কেবল পুনরাবির্ভাব ঘটে। বাকি ৮ শিলিং, যা হল টাকার অঙ্কে অভিব্যক্ত উক্ত শ্রম-দিবসটিতে নব-সৃষ্ট মূল্য। একই ধরনের গড় সামাজিক ম যে-অকে অভিব্যক্ত হয়, এই অঙ্কটি তার তুলনায় বৃহত্তর : গড় সামাজিক শ্রমের ১২টি ঘণ্টা অভিব্যক্ত হয় কেবল ৬ শিলি হিসাবে। অসাধারণ ভাবে উৎপাদনশীল যে শ্রম, তা কাজ করে নিবিড় শ্রম হিসাবে। সমপরিমাণ সময়সীমার মধ্যে নিবিড় শ্রম গড় সামাজিক শ্রমের তুলনায় অধিকতর মূল উৎপাদন করে ( বাংলা প্রথম খণ্ড, প্রথম অধ্যায়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য পৃঃ ৮)। কিন্তু ধনিক সেই আগের হারেই পারিশ্রমিক দিয়ে থাকে। এক দিনের শ্রমশক্তির মূল্য বাবদ পাঁচ শিলিং হিসাবে। সুতরাং এই পরিমাণ মূল্য উৎপাদন করতে শ্রমিকের আগে যেখানে লাগত ১০ ঘণ্টা, এখন সেখানে লাগে মাত্র ৭ ১/২ ঘণ্টা। অতএব, তার উত্তম বৃদ্ধি পায় ২ ১/২ ঘণ্টা এবং সে যে উত্তমূল্য উৎপাদন করে, তা ১ শিলিং থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৩ শিলিং। সুতরাং যে-ধনিক উন্নততর উৎপাদন-পদ্ধতি প্রয়োস করে, সে তার সম-ব্যবসায়ীদের চেয়ে শ্রম-দিবসের অধিকতর অংশ উদ্ধৃত্ত-শ্রমের জন্য কাজে লাগায়। আপেক্ষিক উত্তমূল্য উৎপাদনে নিয়োজিত বাকি সমস্ত ধনিকের দল যৌথ ভাবে যা করে, তা সে ব্যক্তিগত ভাবেই করে থাকে। অন্য পক্ষে, যেইমাত্র এই নতুন উৎপাদন-পদ্ধতি সাধারণত্ব প্রাপ্ত হয় এবং তার ফলে হ্রাসমূল্য পণ্যটির ব্যক্তিগত মূল্য এবং তার সামাজিক মূল্যের মধ্যেকার পার্থক্যটি লোপ পায়, সেই মাত্র এই অতিরিক্ত উত্তমূল্য লুপ্ত হয়ে যায়। শ্রম-সময়ের দ্বারা মূল্য নির্ধারণের নিয়মটি— এমন একটি নিয়ম যা নোতুন উৎপাদন-পদ্ধতি-প্ৰয়োগকারী ব্যক্তিগত ধনিককেও তার দ্রব্যসামগ্রীকে তাদের সামাজিক মূল্যের নীচে বিক্রয় করতে বাধ্য করে তাকে আপন আধিপত্যের অধীনে নিয়ে আসে সেই নিয়মটিই প্রতিযোগিতার জবরদস্ত নিয়ম হিসাৰে কাজ করে, তার প্রতিযোগীদের বাধ্য করে নোতুন উৎপাদন-পদ্ধতিটিকে গ্রহণ করতে।[৫] সুতরাং উদ্বৃত্ত-মূল্যের সাধারণ হারটি শেষ পর্যন্ত কেবল তখনি সমগ্র প্রক্রিয়াটির দ্বারা প্রভাবিত হয়, যখন শ্রমের বর্ধিত উৎপাদনশীলতা উৎপাদনের সেইসব শাখায় আত্ম বিস্তার করে, যেসব শাখা এমন সমস্ত পণ্যের সঙ্গে যুক্ত থেকে সেগুলিকে সস্তা করে দিয়েছে, যে-সমস্ত পণ্য জীবনধারণের অত্যাবশ্যক উপকরণসমূহের অংশ এবং স্বভাবতই এম-শক্তির মূল্যের উপাদানও বটে।
পণ্যের মূল্য এমের উৎপাদনশীলতার সঙ্গে বিপরীতভাবে আনুপাতিক। এবং শ্রমশক্তির মূল্যও তাই, কারণ তা পণ্যের মূল্যের উপরেই নির্ভরশীল। উলটো দিকে, আপেক্ষিক উত্তমূল্য কিন্তু শ্রমের উৎপাদনশীলতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে আনুপাতিক। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেলে, আপেক্ষিক উত্তমূল্যও বৃদ্ধি পায় এবং প্রথমটি হ্রাস পেলে দ্বিতীয়টিও হ্রাস পায়। টাকার মূল্য স্থির ধরে নিলে, ১২ ঘণ্টার একটি গড় সামাজিক এম-দিবস সব সময়ে সেই একই নোতুন মূল্য—৬ শিলিং উৎপাদন করে, এই নোতুন মূল্য কিভাবে উক্তমূল্য ও মজুরির মধ্যে ভাগাভাগি হয়, তাতে কিছু এসে যায় না। কিন্তু যদি বর্ধিত উৎপাদনশীলতার ফলশ্রুতি হিসাবে, জীবনধারণের আবশ্যিক দ্রব্যাদির মূল্য হ্রাস পায় এবং তারা একদিনের শ্রমশক্তির মূল্য পাঁচ শিলিং থেকে তিন শিলিংয়ে হ্রাস পায়, তা হলে উত্তমূল্য এক শিলিং থেকে বেড়ে দাঁড়ায় তিন শিলিং। উক্ত এম-শক্তি পুনরুৎপাদনের জন্য আগে লাগত ১০ ঘণ্টা আর এখন লাগে মাত্র ৬ ঘণ্টা। ৪টি ঘণ্টাকে মুক্ত করা হয়েছে এবং তাকে উদ্ধত্ত-শ্রমের এলাকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সুতরাং মূলধনের মধ্যে নিহিত থাকে একটা অবিচল প্রবণতা, শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির দিকে একটা ঝোঁক, যাতে করে পণ্যকে সস্তা করা যায় এবং এইভাবে পণ্যকে সন্তা করে স্বয়ং শ্রমিককেই সস্তা করা যায়।[৬]
