শ্রম-দিবসকে দীর্ঘায়িত করে যে উত্তমূল্য উৎপাদিত হয়, তাকে আমি বলি অনাপেক্ষিক উত্তমূল্য। অপর পক্ষে, আবশ্যিক শ্রম-সময়কে হ্রাস করে এবং শ্রম-দিবসের দুটি অংশের দৈর্ঘ্যে প্রয়জনীয় পরিবর্তন ঘটিয়ে যে উদ্বৃত্ত-মূল্যের উদ্ভব হয়, তাকে আমি বলি আপেক্ষিক উদ্বমূল্য।
শ্রমশক্তির মূল্যে হ্রাস ঘটাতে হলে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে শিল্পের সেই সব শাখায়, যেসব শাখার উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রী শ্রমশক্তির মূল্য নির্ধারণ করে অর্থাৎ যেসব দ্রব্যসামগ্রী, হয়, গ্রাসাচ্ছাদনের মামুলি উপকরণগুলির শ্রেণীভুক্ত আর, নয়তো, ঐসব উপকরণের স্থান গ্রহণে সক্ষম। কিন্তু কোন পণ্যের মূল্য কেবল সেই পরিমাণ শ্রমের দ্বারাই নির্ধারিত হয় না, যা শ্রমিক সেই পণ্যটির উপরে প্রত্যক্ষ ভাবে অর্পণ করে। সেই সঙ্গে উৎপাদনের উপায়-উপকরণের মধ্যে যে শ্রম বিধৃত থাকে, তার দ্বারাও নির্ধারিত হয়। যেমন, এক জোড়া জুতোর মূল্য কেবল সংশ্লিষ্ট পাদুকাকারের এমের উপরেই নির্ভর করে না, সেই সঙ্গে চামড়া, মোম, সুলতা ইত্যাদির উপরেও নির্ভর করে। সুতরাং শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং তার ফলে শ্রমের উপায় উপকরণ ও কাঁচামাল সরবরাহকারী শিল্পগুলির পণ্যসমূহের মূল্যহ্রাসের লক্ষণও এম শক্তির মূল্যহ্রাস ঘটে; শ্রমের এইসব উপায়-উপকরণ ও কাঁচামাল জীন-ধারণের আবশ্যিক দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় স্থির মূলধনের বস্তুগত উপাদান। কিন্তু শিল্পের যেসব শাখা জীবনধারণের দ্রব্যসামগ্রী কিংবা সেগুলি উৎপাদনের উপায় উপকরণ কোনটাই সরবরাহ করে না, সেখানে যদি এমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, তাতে শ্রমশক্তির মূল্যে কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
অবশ্য, পণ্যের মূল্যহ্রাসের ফলে এম-শক্তির মূল্য কেবল আনুপাতিক ভাবেই হ্রাস পায় শ্রমশক্তির পুনরুৎপাদনে উক্ত পণ্য যে অনুপাতে নিয়োজিত হয়, সেই অনুপাতেই শ্রমশক্তির মূল্য হ্রাস ঘটে। যেমন সার্ট, জীবনধারণের আবশ্যিক দ্রব্যসামগ্রীর মধ্যে একটি। অবশ্য, জীবনধারণের জন্য আবশ্যিক দ্রব্যসম্ভার সমগ্রভাবে নানাবিধ পণ্যের দ্বারা গঠিত প্রত্যেকটি পণ্য একটি স্বতন্ত্র শিল্পের উৎপাদন এবং এই বহুবিধ পণ্যের প্রত্যেকটিরই মূল্য শ্রমশক্তির মূল্যের মধ্যে একটি উপাদান হিসাবে প্রবেশ করে। নিজের পুনরুৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় এম-সময় হ্রাস পেলে এম-শক্তির মূল্যও হ্রাস পায় শ্রমশক্তির মোট মূল্যহ্রাসের পরিমাণ দাঁড়াবে সংশ্লিষ্ট বিবিধ ও বিভিন্ন শিল্পে শ্রম-সময়ে যে ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ হ্রাস-প্রাপ্তি ঘটে, সেই সমস্ত হ্রাস-প্রাপ্তির মোট যোগফল। এই সাধারণ ফলটিকে এখানে এমনভাবে গণ্য করা হচ্ছে যেন তা ভিন্ন ভিন্ন প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে ছিল প্রত্যক্ষ ভাবে উদ্দিষ্ট আশু ফল। যেমন, যখনি কোন ব্যক্তিগত ধনিক একাই শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে সার্টের মূল্য হ্রাস করে, তখন তার কোনক্রমেই উদ্দেশ্য থাকেনা যে সে এম-শক্তির মূল্য হ্রাস করবে। কিন্তু উল্লিখিত ফল সংঘটনে সে শেষ পর্যন্ত যতটা অবদান যোগায়, কেবল ততটা পর্যন্তই সে উদ্ধ মূল্যের সাধারণ হার বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।[৩] মূলধনের সাধারণ ও আবশ্যিক প্রবণতাগুলিকে অবশ্যই তাদের অভিব্যক্তির রূপগুলি থেকে আলাদা করে দেখতে হবে।
যে-পন্থায় ধনতান্ত্রিক উৎপাদনে অন্তর্নিহিত নিয়মগুলি ব্যক্তিগত মূলধন-সম্ভারের জঙ্গমতায় আত্মপ্রকাশ করে, যেখানে তারা প্রতিযোগিতার বাধ্যতামূলক নিয়মাবলী হিসাবে আত্মপ্রতিষ্ঠা করে এবং কাজ-কারবারের নির্দেশক উদ্দেশ্য হিসাবে ব্যক্তিগত ধনিকের মনেও চেতনায় প্রতিভাত হয়, তা নিয়ে এখানে আলোচনা করার ইচ্ছা আমাদের নেই। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, মূলধনের আন্তরপ্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা না করে প্রতিযোগিতার বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। যেমন, ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে অদর্শনীয় অন্তরীক্ষচারী সত্তাসমূহের যথার্থ গতি-প্রকৃতির সঙ্গে অপরিচিত ব্যক্তির পক্ষে তাদের বা গতিপ্রকৃতি বোধগম্য নয়। যাই হোক, আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-মূল্যের উৎপাদন সম্পর্কে আরো ভালভাবে ধারণা করার জন্য, আমরা এখানে কয়েকটি কথা বলতে পারি। যে কথাগুলি বলতে গিয়ে আমরা ইতিমধ্যে যে ফলাফল ধরে নিয়েছি, তার বেশি কিছু ধরে নিচ্ছি না।
যদি এক ঘণ্টার এম ছয় পেন্সে মূর্ত হয়ে থাকে, তা হলে বারো ঘণ্টার একটি এম দিবসে উৎপন্ন হবে ছয় শিলিং পরিমাণ মূল্য। ধরা যাক, শ্রমের বর্তমান উৎপাদন শীলতার অবস্থায়, এই ১২ ঘণ্টায় উৎপন্ন হয় ১২টি জিনিস। ধরা যাক, প্রত্যেকটি জিনিসে ব্যবহৃত উৎপাদনের উপায়-উপকরণের মূল্য ছয় পেন্স। এই অবস্থায় একটি জিনিসের মূল্য পাড়ায় এক শিলিং : উৎপাদনের উপায়-উপকরণের জন্য ছয় পেন্স এবং ঐ উপায়-উপকরণ কাজে লাগিয়ে নোতুন সংযোজিত মূল্য ছয় পেন্স। এখন ধরা যাক, কোন এক ধনিক শ্রমের উৎপাদনশীলতাকে দ্বিগুণ করার এবং ১২ ঘণ্টার একটি শ্রম দিবসে ১২টির জায়গায় ২৪টি জিনিস উৎপাদন করার ব্যবস্থা করল। উৎপাদনের উপায় উপকরণের মূল্য অপরিবর্তিত থাকায়, প্রত্যেকটি জিনিসের মূল্য কমে দাড়াবে নয় পেন্স –উৎপাদনের উপায়-উপকরণের জন্য ছয় পেন্স এবং শ্রমের দ্বারা নোতুন সংযোজিত মূল্য তিন পেন্স। এমের দ্বিগুণিত উৎপাদনশীলতা সত্ত্বেও, গোটা দিনের শ্রম সৃষ্টি করে আগেরই মত ছয় শিলিং পরিমাণ নোতুন মূল্য, তার বেশি নয়; অবশ্য, তা এখন বিস্তৃত হয় আগের তুলনায় দ্বিগুণ-সংখ্যক জিনিসে। এই মূল্যের মধ্য প্রত্যেকটি জিনিস এখন ধারণ করে ১/১২ অংশের বদলে ১/২৪ অংশ, ছয় পেন্সের বদলে তিন পেন্স, যার মানে বাড়ায় যে, এখন যখন উৎপাদনের উপায়-উপকরণগুলি একটি করে জিনিসে রূপান্তরিত হয়, তখন একটি পুরো এক ঘণ্টার এম-সময়ের জায়গায় কেবল অর্ধ ঘণ্টার এম-সময় সেগুলির সঙ্গে সংযযাজিত হয়। এইসব জিনিসের ব্যক্তিগত মূল্য এখন তাদের সামাজিক মূল্য থেকে কম; অন্যভাবে বলা যায়, গড় সামাজিক অবস্থায় উৎপাদিত ঐ একই জিনিসের সুবিপুল পরিমাণের তুলনায় এইগুলিতে ব্যয় হয় অল্পতর শ্রম-সময়। প্রত্যেকটি জিনিসে এখন গড়ে ব্যয় হয় এক শিলিং এবং বিস্তৃত হয় ২ ঘণ্টার সামাজিক শ্রম। কিন্তু পরিবর্তিত উৎপাদন-পদ্ধতিতে এই ব্যয় হয় কেবল নয় পেন্স অর্থাৎ বিস্তৃত হয় ১২ ঘণ্টার সামাজিক প্রম। একটি পণ্যের আসল মূল্য কিন্তু তার ব্যক্তিগত মূল্য নয়, সামাজিক মূল্য; অর্থাৎ আসল মূল্য প্রত্যেকটি ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে জিনিসটির জন্য উৎপাদনকারীর কত ব্যয় হল তার দ্বারা মাপা হয় না, মাপা হয় তার উৎপাদনের জন্য সামাজিক ভাবে প্রয়োজনীয় এম-সময়ের দ্বারা। সুতরাং নোতুন পদ্ধতি প্রয়োগকারী ঐ ধনিক ব্যক্তিটি যদি তার পণ্য তার সামাজিক মূল্যে অর্থাৎ এক শিলিংয়ে বিক্রয় করে, তা হলে তার ব্যক্তিগত মূল্যের তুলনায় তিন পেন্স বেশিতে সেটি বিক্রয় করছে এবং এইভাবে অতিরিক্ত তিন পেল উত্তমূল্য হিসাবে হস্তগত করছে। অন্য দিকে, তার কাছে ১২ ঘণ্টার এম-দিবসের প্রতিনিধিত্ব করছে এখন আর ১২টি জিনিস নয়, ২৪টি জিনিস। অতএব, একটি এম-দিবসের উৎপন্ন জিনিস থেকে অব্যাহতি পেতে হলে, চাহিইতে হবে আগের তুলনায় দ্বিগুণ অর্থাৎ বাজার হতে হবে দ্বিগুণ বিস্তৃত। অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, তার পণ্যসম্ভার একটি বিস্তৃততর বাজার পেতে পারে, যদি সেগুলির দাম কমিয়ে দেওয়া হয়। সুতরাং সে তখন সেগুলিকে বিক্রি করবে সেগুলির সামাজিক মূল্যের উপরে কিন্তু ব্যক্তিগত মূল্যের নীচে, ধরুন, প্রত্যেকটি ছয় পেলে। এইভাবে সে প্রত্যেকটি জিনিস-পিছু বাড়তি উত্তমূল্য নিঙড়ে নেয়। উত্তমূল্যের এই বৃদ্ধিও তার পকেটে যায়—এম-শক্তির সাধারণ মূল্য নির্ধারণে জীবনধারণের যে সমস্ত আবশ্যিক দ্রব্যসামগ্রী অংশগ্রহণ করে, সেই দ্রব্যসামগ্রীর শ্রেণীতে তার পণ্য পড়ুক কি নাই পড়ুক। অতএব, এই শেষোক্ত পরিস্থিতি থেকে নিরপেক্ষ ভাবেই প্রত্যেক ব্যক্তিগত ধনিকেরই একটি উদ্দেশ্য থাকে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে তার পণ্যের মূল্য হ্রাস করার।
