যদি আমরা সরল শ্ৰম-প্রক্রিয়ার দিক থেকে উৎপাদন-প্রক্রিয়াকে বিচার করি তা হলে আমরা দেখি যে উৎপাদনের উপায়-সমূহের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে শ্রমিকেব অবস্থান মূলধন হিসাবে তাদের চরিত্রের দিক থেকে নয়, বরং তার নিজস্ব বুদ্ধি পরিচালিত কাজকর্মের নিছক উপকরণ ও সামগ্রী হিসাবে তাদের যে-চরিত্র সেই দিক থেকে। চামড়া ট্যান’ করার ক্ষেত্রে, সে ধনিকের চামড়া ‘ট্যান’ করেনা। কিন্তু যখন আমরা উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টির প্রক্রিয়ার দিক থেকে উৎপাদন-প্রক্রিয়াকে বিচার করি, তখনি ব্যাপারটা অন্য রকম দাড়িয়ে যায়। উৎপাদনের উপায়গুলি সঙ্গে সঙ্গে অপবে শ্রম আত্মীকরণের উপায়ে পরিবর্তিত হয়ে যায়। এখন আর শ্রমিক উৎপাদনের উপায়গুলিকে নিয়োগ করে না, পরন্তু উৎপাদনের উপায় গুলিই শ্রমিককে নিয়োগ করে। তার উৎপাদনশীল সক্রিয়তার বস্তুগত উপাদান হিসাবে পরিভুক্ত না হয়ে, সেগুলিই উলটো তাদের নিজেদের জীবন-প্রক্রিয়ার আবশ্যিক উদ্দীপক উপাদান হিসাবে তাকেই পরিভেগে করে, এবং মূলধনের জীবন-প্রক্রিয়া মানে নিরন্তর সম্প্রসারণশীল মূল্য হিসাবে, নিরন্তর আত্ম-প্রসারণশীল সত্তা হিসাবে, তার জঙ্গমতা। চুল্লী এবং কর্মশাল। রাতে অলস থাকলে এবং কোনো জীবন্ত শ্রম আত্মীকৃত না করলে সেগুলি ধনিকের কাছে হয়ে পড়ে “নিছক লোকসান”। সুতরাং, শ্রমজীবী জনগণের নৈশ-শ্রমের উপরে চুল্লী ও কর্মশালাগুলি হচ্ছে আইন-সম্মত দাবিদার। উৎপাদন-প্রক্রিয়ার বস্তুগত উপাদানসমূহে উৎপাদনের উপায়-উপকরণে অর্থের এই সরল রূপান্তর ঐগুলিকে রূপান্তরিত করে অপরের শ্রম ও উত্ত-শ্রমের উপরে একটি স্বত্বে, একটি অধিকারে। ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের একান্ত স্বকীয় চরিত্র-বৈশিষ্ট্য-স্বরূপ এই রূপান্তরকাণ্ডটি, মৃত এবং জীবিত এম, মূল্য এবং তাকে যে সৃষ্টি করে সেই শক্তি—এই দুয়ের মধ্যকার সম্পর্কের এই সম্পূর্ণ উৎক্ৰমণটি (inversion) কি ভাবে ধনিকদের চেতনায় প্রতিবিম্বিত হয়, উপসংহারে তার একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। ১৮৪৮-৫০ সালে ইংল্যাণ্ডের কারখানা-মালিকদের বিদ্রোহ চলাকালে, “স্কটল্যাণ্ডের পশ্চিমে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ও ও প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলির অন্যতম, পেইসলিতে অবস্থিত সুতো ও কাপড়ের কারখানার ‘মেসার্স কার্লাইল সন্স অ্যান্ড কোং’, যেটি এক শতাব্দীরও অধিক কাল ধরে চলে আসছে, ১৭৫২ সালেও চালু ছিল, এবং একই পরিবার চার পুরুষ ধরে যেটিকে পরিচালনা করছে, সেই কোম্পানিটির কর্ণধার”…………এই “অতিশয় বিচক্ষণ ভদ্রলোক তখন গ্লাসগো ডেইলি মেল’ পত্রিকার ১৮৪৯ সালের ২৫শে এপ্রিলের সংখ্যায় ‘পালা-দৌড় প্রথা’ শিরোনামে একটি পত্র লেখেন; সেই পত্রে, অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে, এই অদ্ভুত সাদামাটা অনুচ্ছেদটি স্থান পায়। এখন দেখা যাক … … কারখানার কাজের সময় ১ ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ করলে কি কি অনিষ্ট হতে পারে। …….কারখানা-মালিকের ভবিষ্যৎ ও সম্পত্তির পক্ষে সেগুলি হবে সবচেয়ে গুরুতর ক্ষতিজনক। যদি সে (অর্থাৎ তার হাত তথা শ্রমিক) আগে কাজ করত ১২ ঘণ্টা এবং এখন তার কাজের সীমা বেঁধে দেওয়া হয় ১০ ঘণ্টায়, তা হলে প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটি যন্ত্র প্রত্যেকটি মাকু সংকুচিত হয়ে যায় ১০-এ, এবং যদি কারখানাটিকে বেচে দেওয়া হয়, সেগুলির মূল্য ধার্য হবে কেবল ১-এ, যার ফলে দেশের প্রত্যেকটি কারখানার মূল্য থেকে এক-ষষ্ঠাংশ বাদ যাবে।'[৭]
স্কটল্যাণ্ডের পশ্চিমের এই বুর্জোয়া মাথাটি যার মধ্যে সঞ্চিত রয়েছে চার পুরুষের ধনতান্ত্রিক গুণাবলী, তার কাছে উৎপাদনের উপায়-উপকরণ, টাকু ইত্যাদির মূল্য মূলধন হিসাবে সেগুলির নিজেদের মূল্য সম্প্রসারিত করার এবং প্রতিদিন অপরের মজুরি-বঞ্চিত শ্রমের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্রাস করার সেগুলির যে ক্ষমতা তার সঙ্গে এমন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গিয়েছে যে, কার্লাইল অ্যান্ড কোম্পানির কর্ণধারটি সত্য সত্যই ভাবছেন যে, যদি তিনি তার কারখানাটি বিক্রি করে দেন, তা হলে তিনি কেবল টাকুগুলির মূল্যই পাবেন না, তার উপরে পাবেন সেগুলির উদ্ব-মূল্য আয়ত্ত করার ক্ষমতার মূল্যও, সেগুলির মধ্যে যে শ্রম মূর্ত রয়েছে এবং এই জাতীয় টাকু উৎপাদনে যার আবশ্যকতা আছে, কেবল সেই শ্রমই নয়, তার উপরে পেইসলির বীর স্কটদের দেহ থেকে প্রতিদিন সেগুলি যে-উদ্ধত্ত-শ্রম নিষ্কাশনে সাহায্য করে, সেই উত্ত-এমও; এবং ঠিক সেই কারণেই তিনি মনে করেন, কাজের দিন দু ঘণ্টা কমালে, ১২টি সুতো-কাটা যন্ত্রের দাম কমে গিয়ে দাড়াবে ১০টির দামে।
————
১. হাতুড়ে অর্থনীতিবিদরা এই প্রাথমিক নিয়মটি জানেন না বলে মনে হয়। আর্কিমিডিসকে উলটে দিয়ে ওঁরা যোগান ও চাহিদা দিয়ে শ্রমের বাজার-দাম ঠিক করতে গিয়ে কল্পনা করে নিলেন যে ওঁরা সেই আলটি (fulcrum) পেয়ে গিয়েছেন যাতে অবশ্য পৃথিবীকে জড়ানো না গেলেও তার গতি বন্ধ করে দেওয়া যায়।
২. চতুর্থ গ্রন্থে আরো বিবরণ দেওয়া হবে।
৩, শ্রম, যা হচ্ছে সমাজের অর্থ নৈতিকক্ষেত্রে ব্যয়িত সময়, সেটি হচ্ছে দিনের একটি অংশ ধরা যাক দশ লক্ষ লোকের দৈনিক দশ ঘণ্টা করে এক কোটি ঘন্টা। মূলধনের সম্প্রসারণের সীমানা আছে। যে কোন বিশেষ সময়ে এই সীমানা ঠিক হতে পারে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রযুক্ত-সময়ের বাস্তব পরিমাণ দিয়ে।’ (অ্যাান এসে অন দি পলিটিক্যাল ইকনমি অব নেশনস লণ্ডন ১৮২১ পৃঃ ৪৭, ৪৯)।
