উদ্বৃত্ত-মূল্য সম্পর্কে এ পর্যন্ত আমরা যে-আলোচনা করেছি, তা থেকে এটা অনুত হয় যে, যে-কোনো পরিমাণ অর্থ বা মূল্যের অংককেই খুশিমত মূলধনে রূপান্তরিত করা যায় না। বাস্তবিক পক্ষে, এই রূপান্তরণ ঘটাতে হলে, এটা অবশ্যই আগে থেকে ধরে নিতে হবে যে অর্থ বা পণ্যের ব্যক্তি-মালিকের হাতে একটা ন্যূনতম পরিমাণ অর্থ বা বিনিময়মূল্য রয়েছে। অস্থির মূলধনের ন্যূনতম পরিমাণ হল উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের জন্য দিনের পর দিন গোটা বছর ধরে নিযুক্ত একজন মাত্র শ্রমিক-পিছু ব্যয়-দাম। এই শ্রমিক যদি নিজেই তার উৎপাদন-উপায়গুলির মালিক হত এবং শ্রমিক হিসাবে বেঁচে থেকে খুশি থাকত, তা হলে তার জীবনধারণের দ্রব্য-সামগ্রী পুনরুৎপাদনের জন্য যতটা সময় দরকার, তার চেয়ে বেশি সময় কাজ করতে হত না। ধরা যাক, সেটা দৈনিক ৮ ঘণ্টা, তা ছাড়া, তার তখন লাগত কেবল ৮ ঘণ্টা কাজ করার পক্ষে যথেষ্ট হয়, এমন পরিমাণ উৎপাদন-উপকরণ। অপর পক্ষে, ধনিক তাকে দিয়ে করায় এই ৮ ঘণ্টারও বেশি, ধরা যাক, ৪ ঘণ্টা উদ্ব-শ্রম, এবং সেই কারণে অতিরিক্ত উৎপাদন-উপায় উপকরণের সংস্থানের জন্য তার দরকার হয় অতিরিক্ত পরিমাণ অর্থ। অবশ্য আমরা য: ধরে নিয়েছি, তদনুযায়ী তাকে নিযুক্ত করতে হবে দুজন শ্রমিক, যাতে সে দৈনিক আয়ত্তীকৃত উদ্বৃত্ত মূল্যের উপরে জীবনধারণ করতে এবং, শ্রমিকের মতই, তার অত্যাবশ্যক অভাবগুলি পূরণ করতে সক্ষম হয়। এক্ষেত্রে নিছক জীবন-ধারণই হবে তার উৎপাদনের লক্ষ্য, ধন-সম্পদের বৃদ্ধি নয়, কিন্তু এই দ্বিতীয়টিও ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-ব্যবস্থায় নিহিত থাকে, যাতে করে সে একজন সাধারণ শ্রমিকের তুলনায় কেবল দ্বিগুণ ভাল ভাবে বাঁচতে পারে, এবং, তা ছাড, উৎপাদিত উদ্ধত্ত মূল্যের অর্ধেকটা মূলধনে পরিণত করতে পারে, তার জন্য তাকে, শ্রমিক-সংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে, অগ্রিম প্রদত্ত ন্যূনতম মূলধনকে আট গুণ বাড়তে হবে। অবশ্য, তার শ্রমিকের মত সে নিজেও শ্রম করতে পারে, উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ভাবে অংশ নিতে পারে, কিন্তু ত! করলে সে হবে ধনিক এবং শ্রমিকের একটি সংকর নমুনা, “একজন ক্ষুদে মালিক। ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের একটি বিশেষ পর্যায়ে প্রয়োজন দেখা দেয় যে যখন ধনিক হিসাবে অর্থাৎ মূলধনের ব্যক্তি-রূপ হিসাবে কাজ করে তখন, সে যেন তার গোটা সময়টাকেই অপরের শ্রম আত্মীকরণ করতে এবং, সেই কারণেই, নিয়ন্ত্রণ করতে, এবং এই শ্রমের উৎপন্ন দ্রব্যাদি বিক্রয় করতে সক্ষম হয়।[৪] সুতরাং, মধ্য যুগের গিল্ডগুলি চেষ্ট করেছিল, একজন মালিক কত শ্রমিক নিযুক্ত করতে পারবে তার উচ্চতম সীমা একটি ন্যূনতম সংখ্যার মধ্যে বেঁধে দিতে, যাতে তাকে ধনিকে রূপান্তরিত হওয়া থেকে জোর করে নিবৃত্ত করা যায়। এই ধরনের ক্ষেত্রে অর্থ বা পণ্যের মালিক কেবল তখনি ধনিকে পরিণত হয়, যখন উৎপাদনের জন্য অগ্রিম-প্রদত্ত ন্যূনতম পরিমাণটি মধ্য যুগের নির্দিষ্ট উচ্চতম সীমাকে বিপুল ভাবে অতিক্রম করে যায়। একটা নির্দিষ্ট মাত্রার পরে কেবল পরিমাণগত পার্থক্যই পরিণত হয় গুণগত পার্থক্যে—হেগেল-এর আবিষ্কৃত (তার “লজিক” নামক গ্রন্থে ) এই নিয়মটির যথার্থতা যেমন প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে, তেমন এখানেও প্রতিপন্ন হয়।[৫]
ন্যূনতম যে-পরিমাণ মূল্যের উপরে অধিকার থাকলে, অর্থ বা পণ্যের ব্যক্তি মালিক নিজেকে ধনিকে রূপান্তরিত করতে পারে, তা ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন হয়, এবং বিভিন্ন উৎপাদন-ক্ষেত্রে উপস্থিত পর্যায়ে তাদের বিশেষ ও কারিগরি অবস্থা অনুযায়ী বিভিন্ন হয়। এমনকি ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের সুচনাতেই উৎপাদনের কয়েকটি ক্ষেত্র এমন পরিমাণ ন্যূনতম মূলধন দাবি করে, যা তখনো কোনো একক ব্যক্তি-মালিকের হাতে দেখা যায় না। এর ফলে অংশত দেখা দেয় ব্যক্তিমালিককে আংশিক ভাবে সরকারি অনুদান দেবার ব্যবস্থা, অংশত দেখা দেয় শিল্প ও বাণিজ্যের কয়েকটি শাখার শোষণের ক্ষেত্রে আইন অনুমোদিত একচেটিয়া অধিকার-সমন্বিত সমিতির উদ্ভব—যেগুলি আমদের আধুনিক যৌথ মূলধনী প্রতিষ্ঠানসমূহের পূর্বসূরী। [৬]
যেমন আমরা দেখেছি, উৎপাদন-প্রক্রিয়ার অভ্যন্তরে, শ্রমের উপরে, অর্থাৎ কর্মরত শ্রমশক্তির উপরে, তথা স্বয়ং শ্রমিকের উপরে মূলধন তার অধিপত্য অর্জন করল। যাতে করে শ্রমিক তার কাজ নিয়মিত ভাবে করে এবং যথানির্দিষ্ট তীব্রতার মাত্রা অনুসারে করে, সে ব্যাপারে ধনিক হুশিয়ার থাকে।
মূলধন আরো পরিণত হয় এমন একটি জবরদস্তিমূলক সম্পর্কে, যা শ্রমিক শ্রেণীকে তার নিজের জীবনের প্রয়োজন-পূরণের সংকীর্ণ গণ্ডীর বাইরেও অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করে। অপরের সক্রিয়তার প্রযোজক হিসাবে, উদ্ধত্ত-শ্রমের নিষ্কাশক ও শ্রমশক্তির শোষক হিসাবে, মূলধন উদ্যমশীলতায় বিধি-নিষেধের প্রতি অবজ্ঞায় বেপরোয়া তৎপরতায় এবং কর্ম-কুশলতায়, প্রত্যক্ষ বাধ্যতামূলক শ্রমের উপরে প্রতিষ্ঠিত পূর্ববর্তী সমস্ত উৎপাদন-ব্যবস্থাকে ছাড়িয়ে যায়।
প্রথমে, মূলধন যে-ঐতিহাসিক পরিবেশে শ্রমকে পায়, তার কারিগরি অবস্থাগুলির ভিত্তিতেই তাকে নিজের অধীনে আনে। সুতরাং, সে সঙ্গে সঙ্গে প্রচলিত উৎপাদন পদ্ধতিকে পরিবর্তিত করে না। শ্রম-দিবসের সরাসরি বিস্তার-সাধন করে উদ্ধত্ত মূল্যের উৎপাদন, যা নিয়ে আমরা এ পর্যন্ত আলোচনা করেছি, তা খোদ উৎপাদন পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন থেকে নিরপেক্ষ বলে নিজেকে প্রতিপন্ন করল। পুরনো কায়দার রুটি-কারখানাগুলিতেও যেমন সক্রিয় ছিল, আধুনিক কাপড়-কলগুলিতেও তা তেমন সক্রিয়ই রইল।
