যে-উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদিত হয়, উত্তমূল্যের হার এবং অগ্রিম-প্রদত্ত অস্থির মূলধন—এই দুটি উপাদানের দ্বারা তার পরিমাণ নির্ধারণ থেকে তৃতীয় আরেকটি নিয়ম বেরিয়ে আসে। উত্তমূল্যের হার অথবা শ্রমশক্তির শোষণের হার এবং শ্রমশক্তির মূল্য অথবা আবশ্যিক শ্রম-সময়ের পরিমাণ নির্দিষ্ট থাকলে, এটা স্বয়ংসিদ্ধ যে অস্থির মূলধনের পরিমাণ যত বেশি হবে, মোট মূল্য ও উদ্ধৃত্ত মূল্যের উৎপাদনও তত বেশি হবে। যদি এম-দিবসের সীমা এবং আবশ্যিক অংশটিও নির্দিষ্ট থাকে, তাহলে একজন ব্যক্তিগত ধনিক কি পরিমাণ মূল্য ও উদ্ব-মূল্য উৎপাদন করবে, সেটি স্পষ্টতঃই নির্ভর করে একমাত্র কর্মে-নিযুক্ত মোট শ্রমের উপর। কিন্তু উল্লিখিত শর্ত সাপেক্ষ অবস্থায়, এই ব্যাপারটি নির্ভর করে শ্রমশক্তির পরিমাণ অথবা শোষিত শ্রমিকদের সংখ্যার উপর এবং এই সংখ্যা আবার নির্ধারিত হয় অগ্রিম-প্রদত্ত অস্থির মূলধনের পরিমাণ দিয়ে। অতএব, যখন উদ্বত্ত-মূল্যের হার এবং শ্রমশক্তির মূল্য নির্দিষ্ট, তখন উৎপন্ন উদ্ব-মূল্যের পরিমাণ অগ্রিম-প্রদত্ত মূলধনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে পরিবর্তিত হয়। এখন আমরা জানি যে ধনিক তার মূলধনকে দুভাগে ভাগ করে। এক ভাগ সে উৎপাদনের উপকরণে বিনিয়োগ করে। এটি হচ্ছে তার মূলধনের স্থির অংশ। অপর ভাগটি সে বিনিয়োগ করে জীবন্ত শ্রমশক্তির ক্রয়ে। এই অংশটি হচ্ছে অস্থির মূলধন। একই অভিন্ন সামাজিক উৎপাদন-পদ্ধতির ভিত্তিতে, স্থির ও অস্থির মূলধনে এই যে বিভাজন, তা উৎপাদনের বিভিন্ন শাখায় বিভিন্ন হয়; এমনকি উৎপাদনের একই শাখার মধ্যেও উৎপাদন-প্রক্রিয়ার সামাজিক সন্নিবেশে এবং কৃৎকৌশলগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু যে অনুপাতেই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধনকে স্থির অস্থির অংশে ভাগ করা হোক-না-কেন ঐ অনুপাত ১: ২ অথবা। ১:১০ অথবা ১: x যাই হোক না কেন, তাতে উপস্থিত সুত্রবদ্ধ নিয়মটি অক্ষুন্নই থাকে। কারণ আমাদের আগেকার বিশ্লেষণ অনুযায়ী স্থির মূলধনের মূল্য উৎপন্ন দ্রব্যের মূল্যের মধ্যে পুনরায় আবির্ভূত হয়; কিন্তু তা নোতুন উৎপন্ন মূল্যটির মধ্যে নোতুন সৃষ্ট মূল্য-ফলটির মধ্যে প্রবেশ করে না। একশ জনের জায়গায় এক হাজার জন কাটুনি নিয়োগ করতে হলে বেশি সংখ্যক টাকু ইত্যাদি নিশ্চয়ই দরকার। কিন্তু এই অতিরিক্ত উৎপাদন-উপকরণ-সমূহের মূল্য বাড়তে পারে কমতে পারে, অথবা অপরিবর্তিত থাকতে পারে, পরিমানে বেশি হতে পারে বা কম হতে পারে; কিন্তু শ্রম শক্তিকে সক্রিয় করার মাধ্যমে উদ্বন্ত মূল্য সৃজনের প্রক্রিয়াকে তা মোটই প্রভাবিত করে না অতএব এখন উল্লিখিত নিয়মটি এই আকার ধারণ করে : শ্রমশক্তির মূল্য নির্দিষ্ট থাকলে এবং তার শোষণের মাত্রা সমান থাকলে বিভিন্ন মূলধনের দ্বারা উৎপন্ন মূল্য ও উদ্ব-মূল্যের পরিমাণ মূলধনগুলির অন্তভুক্ত অস্থির অংশের পরিমাণের সঙ্গে, অর্থাৎ জীবন্ত শ্রমশক্তিতে যে অংশ রূপান্তরিত হয়, তার পরিমাণের সঙ্গে, প্রত্যক্ষ ভাবে পরিবর্তিত হয়।।
বাহ্য রূপের উপরে প্রতিষ্ঠিত সমস্ত অভিজ্ঞতাকেই এই নিয়মটি খণ্ডন করে। প্রত্যেকেরই জানা আছে যে, একজন সুতোকল-মালিক, শতকরা হিসাবে তার লগ্নীকৃত মোট মূলধনের বেশির ভাগটাই স্থির মূলধন এবং অল্প ভাগটা অস্থির মূলধনে বিনিয়োগ করে বলে সে একজন রুটি-কারখানার মালিক যে তুলনামূলকভাবে বেশির ভাগটা অস্থির মূলধনে এবং অল্প ভাগটা স্থির মূলধনে বিনিয়োগ করে, তার চেয়ে কম মুনাফা বা উদ্বৃত্ত-মূল্য করায়ত্ত করে। এই আপাতদৃশ্য স্ববিরোধ ব্যাখ্যা করার জন্য কতকগুলি মধ্যবর্তী স্তর জানা চাই, যেমন প্রাথমিক বীজগণিতের দিক থেকে বিচার করলে যে একটি যথার্থ রাশির প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, তার জন্য অনেকগুলি মধ্যবর্তী স্তব জানা দরকার। চিরায়ত অর্থনীতি এই নিয়মটিকে সূত্ৰরূপ . দিলেও এটিকে প্রবৃত্তিগতভাবে আঁকড়ে থেকেছে, তার কারণ এটি হচ্ছে মূল্য সম্পর্কীয় সাধারণ নিয়মের একটি অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতি। স্ববিরোধী ব্যাপারগুলির সঙ্গে সংঘর্ষ থেকে এই নিয়মটিকে রক্ষা করার চেষ্টায় চিরয়াত অর্থনীতি তাকে প্রচণ্ডভাবে নিষ্কর্ষিত করতে বাধ্য হয়েছে। পরে আমরা দেখতে পাব, [২]কেমন করে বিকাডোপন্থীরা এই প্রতিবন্ধকে বাধা পেয়ে বিপন্ন হন। হাতুডে অর্থনীতি যা “বস্তুতঃ কিছুই শেখে নি, তা যেমন অন্যত্র, তেমনি এক্ষেত্রেও, শুধু ব্যহত দৃশ্য ব্যাপারগুলিকেই আঁকড়ে থাকে এবং যে সাধারণ নিয়মটি তাদের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাখ্যা করতে পারে, সেটিকে বর্জন করে। শিনোজ-র উলটো এরা বিশ্বাস করেন যে “অজ্ঞতাই হচ্ছে একটি যথেষ্ট কারণ।
দিনের পর দিন একটি সমাজ যে-পরিমাণ শ্রমকে ক্রিয়াশীল করে, তাকে একটি মাত্র যৌথ শ্রম-দিবস বলে গণ্য করা যেতে পারে। ধরা যাক, যদি শ্রমিকদের সংখ্যা হয় এক মিলিয়ন এবং একজন শ্রমিকের গড় শ্রম-দিবস হয় ১০ ঘণ্ট। তা হলে সামাজিক শ্রম দিবম দাড়ায় দশ মিলিয়ন ঘণ্টা। এই শ্রম-দিবসেব দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট থাকলে, তা তার সীমা দৈহিক ভাবে বা সামাজিক ভাবেই নির্দিষ্ট হোক না কেন, উদ্ব-মূল্যের পরিমাণ বৃদ্ধি করা যেতে পারে কেবল শ্রমিকদের সংখ্যা অর্থাৎ শ্রমজীবী জনসমষ্টির আয়তন বৃদ্ধি করেই। মোট সামাজিক মূলধন কত উদ্ব-মূল্য উৎপাদন করে তার মাত্রা এখানে নির্ধারিত হয় জনসংখ্যায় বুদ্ধিব দ্বারা। বিপরীত পক্ষে জনস’থ্যা অতি নিদিষ্ট থাকলে, এই মাত্রা নির্ধারিত হয় শ্রম-দিবসের সম্ভাব্য বিস্তার সাধনের দ্বারা।[৩] অবশ্য, পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখতে পাব যে এই নিয়মটি কেবল সেই ধরনের উদ্ধও-মূল্যের পক্ষেই প্রযোজ্য, যা নিয়ে আমরা এ পর্যন্ত আলোচনা করেছি।
