কিন্তু একজন ধনিকের অস্থির মূলধন বলতে বোঝায় : ধনিক যুগপৎ যতগুলি শ্রমশক্তি নিয়োগ করে, তাদের সমগ্র মূল্যের অথরূপ। অতএব, তার মূল্য পাওয়া যায় একটি শ্রমশক্তির গড় মূল্যকে কর্ম-নিযুক্ত সমস্ত শ্রমশক্তিব সংখ্যা দিয়ে গুণ করে। অতএব, শ্রমশক্তির মূল নির্দিষ্ট থাকলে, অস্থির মূলধনের আয়তন প্রত্যক্ষ ভাবে নির্ভর করে যুগপৎ নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যার উপর। যদি একটি শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্য হয় তিন শিলিং, তাহলে একশটি শ্রমশক্তিকে শোষণ করবার জন্য তিনশ শিলিং আগাম দিতে হবে, দৈনিক স’ শ্রমশক্তি শোষণের জন্য সx৩ শিলিং আগাম দিতে হবে।
ঐ একইভাবে, যদি তিন শিলিং পৰিমাণ অস্থির মূলধন একটি শ্রমশক্তির মূল্য হয় এবং দৈনিক তিন শিলিং উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টি করে, তাহলে তিনশ শিলিং অস্থির মূলধন দৈনিক তিনশ শিলিং উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টি করবে এবং “স” গুণ মূলধন “স” x ৩ শিলিং উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টি করবে। অতএব মোট উত্ত মূল্যের পরিমাণ হচ্ছে : একদিনে একজন শ্রমিকের সৃষ্ট উদ্ধৃত্ত মূল্য » কর্মে নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যা উপরন্তু, যেহেতু শ্রমশক্তির মূল্য নির্দিষ্ট থাকলে একজন শ্রমিক কত পরিমাণ উত্ত মূল্য উৎপাদন করে, তা নির্ধারিত হয় উদ্ধত্ত-মূল্যের হার দিয়ে, সেইহেতু নিচের নিয়মটি পাওয়া যায় : উৎপন্ন উদ্ব-মূল্যের মোট পরিমাণ হচ্ছে অগ্রিম-প্রদত্ত অস্থির মূলধন এবং উত্ত মূল্যের হারের গুণফল সমান; অন্যভাবে বলা চলে, এটা নির্ধারিত হয় একই ধনিকের দ্বারা যুগপৎ শোষিত শ্রমশক্তির সংখ্যা এবং প্রতিটি শ্রমশক্তির শোষণের হারের মিশ্র অনুপাত দিয়ে।
সব সময়েই ধরে নেওয়া হয় যে শ্রমশক্তির মূল্যই শুধু স্থির নয়, পরন্তু ধনিকের দ্বারা নিযুক্ত শ্রমিকেরা প্রত্যেকেই গড শ্রমিক। ব্যতিক্রম দেখা যায় যখন উৎপন্ন উদ্বৃত্ত-মূল্য শোষিত শ্রমিকদের সংখ্যার অনুপাতে বাডে, কিন্তু সেক্ষেত্রে শ্রম শক্তির মূল্য স্থির থাকে না।
অতএব, একটি বিশেষ পরিমাণ উত্তমূল্যের সৃষ্টিতে একদিকের হাস অন্যদিকে বৃদ্ধি দিয়ে পুষিয়ে যেতে পারে। যদি অস্থির মূলধন কমে যায় এবং একই সময়ে উদ্ধৃত্ত মূল্যের হার সমানুপাতে বাড়ে, তাহলে উদ্ব-মূল্যের মোট পরিমাণে কোন পার্থক্য হয় না। যদি আমাদের আগেকার হিসাবমত ধনিককে দৈনিক একশ শ্রমিক খাটাতে তিনশ শিলিং আগাম দিতে হয় এবং উদ্বৃত্ত মূল্যের হার যদি হয় শতকরা পঞ্চাশ ভাগ, তাহলে তিনশ শিলিং অস্থি মূলধণ দেডশ শিলিং উত্ত মূল্য অথবা ১০০X৩টি শ্রম ঘণ্টা দেয়। যদি উদ্বৃত্ত মূল্যের হার দ্বিগুণ হয় অথবা যদি শ্রম-দিবস ছটা থেকে নটা পর্যন্ত না হয়ে বেড়ে ছটা থেকে বারোটা পর্যন্ত হয় এবং যদি একই সময়ে অস্থিব মূলধন কমিয়ে অর্ধেক করা হয় এবং এটি হয় দেড়শ শিলিং তখন এতেও দেডশ শিলিং উদ্ধৃত্ত মূল্য অথবা ৫০ X ৬ শ্ৰম-ঘণ্টা হয়। এইভাবে। অস্থির মূলধনে হ্রাস অপরদিকে শ্রমশক্তির শোষণের হারে আনুপাতিক বৃদ্ধি দিয়ে পূরণ হয় অথবা নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যা-হ্রাস শ্রম-দিবসের আনুপাতিক বৃদ্ধি দিয়ে পূরণ করা যায়। অতএব, কিছুটা মাত্রার মধ্যে ধনিকদের শোষণযোগ্য শ্রমের সরবরাহ শ্রমিকদের সরবরাহ থেকে নিরপেক্ষ থাকে।[১] বরং উদ্বৃত্ত মূল্যের হারের অধোগতি উৎপাদিত উদ্ধত্ত মূল্যের পরিমাণকে অপরিবর্তিত রাখে—যদি অস্থির মূলধনের পরিমাণ অথবা নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা সমানুপাতে বাড়ে।
যাই হোক, নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যা হ্রাসের অথবা অগ্রিম প্রদত্ত মূলধনের পরিমাণ হ্রাসের ক্ষতি উদ্ব-মূল্যের হার বৃদ্ধি করে অথবা শ্রম-দিবসকে দীর্ঘতর করে পূরণ করে নেবার পক্ষে অনতিক্রমনীয় সীমা আছে। শ্রমশক্তির মূল্য যাই হোক না কেন, শ্রমশক্তির ভরণ-পোষণের জন্য দুঘণ্টা অথবা দশ ঘণ্টা যে পরিমান শ্রম-ঘণ্টাই আবশ্যক হোক না কেন, একজন শ্রমিক দিনের পর দিন যে মূল্য সৃষ্টি করে, তার পরিমাণ সব সময়েই হবে চব্বিশ ঘণ্টার শ্রম যে মূল্যের মধ্যে বিধৃত, তার চেয়ে নিচে। যদি এই বাস্তবায়িত শ্রমের অর্থগত রূপ হয় বারো শিলিং তাহলে বারো শিলিং-এর চেয়ে কম হবে। আগে ধরে নিয়েছি, শ্রমশক্তির নিজের পুনরুৎপাদনের জন্য অথবা তার কয়ে আমাম দেওয়া মুলধন প্রতিস্থাপনের জন্য দৈনিক ছটি শ্রম-ঘণ্টা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে দেড় হাজার শিলিং অথবা অস্থির মূলধনে পাঁচশ শ্রমিক নিযুক্ত হলে এবং তাদের উদ্ধও শনের হার বারো ঘণ্টার শ্রম-দিবসে শতকরা একশ ভাগ হলে, দৈনিক মোট উদ্ধও মূল্য হবে ১৫০০ শিলিং অথবা ১২x১০০০ শ্রম-ঘণ্টা, এবং উৎপাদনের মোট মূল্য, যা হল অগ্রিম-প্রদত্ত অস্থির মূলধন ও উদ্বৃত্ত মূল্যের যোগফলের সমান, সেটি দিনের পর দিন কখনো ১২০০ শিলিং অথবা ১৪ x ১০০ শ্রম-ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। গড়-শ্রম-দিবসের চূড়ান্ত সীমা প্রকৃতির বিধানে যেটি সর্বদা চব্বিশ ঘণ্টার নিচে হতে বাধ্য—এটাই হচ্ছে সেই অলংঘনীর সীমা, যার জন্য অস্থির মূলধনের পরিমাণ কমলে উদ্বত্ত মূল্যের হার বাড়িয়ে শ্রমিকের সংখ্যা কমলে শ্রমশক্তির শোষণের হার বাড়িয়ে ক্ষতিপূরণ করা আর সম্ভব হয় না। এই সুস্পষ্ট নিয়মটির গুরুত্ব হচ্ছে এই যে, এতে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা অথবা মূলধনের অস্থির অংশ, যাকে শ্রমশক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়, তার পরিমাণ হ্রাসের যে ঝোক ধনিকদের মধ্যে দেখা যায় ( এই বিষয়টিকে পরে আরো বিশদ করা হবে) এবং সর্বাধিক পরিমাণ উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টির ঠিক বিপরীত ঝোক, এই দুয়ের সংযোগে যে ঘটনাগুলি উদ্ভূত হয়, সেগুলির ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। অপরপক্ষে, যদি নিয়োজিত সমগ্ৰ শ্ৰম-শক্তি বৃদ্ধি পায়, অথবা অস্থির মূলধনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, কিন্তু উদ্ধৃত্ত মূল্যের হারের হ্রাসপ্রাপ্তির সমান অনুপাতে নয়, তাহলে উৎপাদিত উত্তমূল্যের মোট পরিমাণ হ্রাস পায়।
