আমাদের বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে যে কোন একটি পণ্যের মূল্য কোন রূপে প্রকাশিত হবে, তা নির্ভর করে মূল্যের প্রকৃতির উপর, মূল্য এবং তার আয়তন বিনিময় মূল্যের প্রকাশভঙ্গির উপর নির্ভর করে না। এই ভুলই করেছেন বাণিজ্যবিদরা এবং ফেরিয়ে, গানিলহ(৭) প্রভৃতি তাদের আধুনিক পরিত্রাতারা, আবার ঠিক তাদের বিপরীত, মেরুর বাস্তিয়াতের মতো স্বাধীন বাণিজ্যের আধুনিক ফেরিওয়ালারাও। অর্থাৎ বাণিজ্যবিদরাও বিশেষ জোর দিয়ে থাকেন প্ৰকাশমান মূল্যের গুণগত দিকটার উপর, ফলতঃ পণ্যের সমঅৰ্ঘ রূপের উপর, এই সমঅৰ্থ রূপের পূর্ণ পরিণতি হল আর্থ। অপর দিকে স্বাধীন বাণিজ্যের আধুনিক ফেরিওয়ালারা সবচেযে বেশি জোব দেন আপেক্ষিক মূল্য রূপের গুণগত দিকটার উপর, কারণ যে-কোন দামে জিনিস তাদের ছাড়তেই হবে। তাল ফলে ওদের পক্ষে শুধুমাত্ৰ এক পণ্যের সঙ্গে অপর পণ্যের বিনিময়-ঘটিত সম্পর্ক প্রকাশের মাধ্যমে তথা দৈনিক চলতি দামের তালিকার মাধ্যমে ছাড়া আর কোথাও মূল্যও নেই মূল্যের পরিমাণও নেই। লম্বার্ড স্ত্রীটের ঘোলাটে ধারণাগুলিকে পাণ্ডিত্যেৰু পালিশ দিয়ে চটকদার করে সাজাবার ভার নিয়েছিলেন ম্যাকলিয়ড, তিনি হচ্ছেন সংস্কারাচ্ছন্ন বাণিজ্যবাদী এবং আলোকপ্ৰাপ্ত স্বাধীন বাণিজ্যের ফেরি সন্তান।
‘খ’-এর সঙ্গে ‘ক’-এর মূল্য-সম্পর্ক প্রকাশের সমীকরণের মধ্যে ‘খ’-এর সাহায্যে ‘ক’-এর মূল্য প্ৰকাশ করার ব্যাপারটা তলিয়ে বিচার করলে দেখা যায় যে ঐ সম্পর্কের ভিতর ‘ক’-এর দেহরূপটা কেবলমাত্র ব্যবহার-মূল্য স্বরূপ দেখা দেয়, ‘খ’-এর দেহরূপটা দেখা দেয় কেবলমাত্র মূল্যের রূপ বা আকৃতি হিসেবে। প্রতি পণ্যের মধ্যে ব্যবহার-মূল্য এবং মূল্য এই দুই-এর ভিতর যে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা বৈপরীত্য আছে তা বাহ্যতঃ প্ৰতিভাত হয়, তখন, যখন এই দুটি পণ্য একটি বিশেষ পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে আসে অর্থাৎ যার মূল্য প্ৰকাশিত হয়েছে সে সরাসরি হাজির হয় কেবলমাত্র ব্যবহার-মূল্য রূপে আর যার সাহায্যে তার মূল্য প্রকাশিত হয়েছে সে সরাসরি হাজির হয় মাত্র বিনিময়-মূল্যরূপে। সুতরাং কোন একটি পণ্যের প্রাথমিক মূল্য-রূপ হচ্ছে সেই রূপ, যে প্ৰাথমিক রূপে পণ্যের ভিতরকার ব্যবহার-মূল্য এবং মূল্য এই দুয়ের বৈপরীত্য আত্ম-প্ৰকাশ করে।
সমাজের প্রত্যেক অবস্থায়ই শ্রমজাত প্রত্যেকটি দ্রব্যই এক একটি ব্যবহার মূল্য , কিন্তু ঐ দ্রব্য পণ্যে পরিণত হয় সমাজ-বিকাশের একটি বিশিষ্ট যুগে অর্থাৎ যে যুগে কোন একটি ব্যবহারযোগা দ্রব্যের উৎপাদনে ব্যয়িত শ্ৰম প্রকাশিত হয়। সেই পণ্যের একটি বাস্তর গুণের আকারে, অর্থাৎ তার মূল্যের আকারে। সুতরাং কথাটা দাঁড়ালো এই যে, প্রাথমিক মূল্য রূপ হচ্ছে সেই আদিম রূপে শ্রমজাত দ্রব্য কালক্রমে পণ্যরূপে আবিস্তৃত হয় এবং ক্রমবিকাশ সূত্রে এই সমস্ত দ্রব্য যে মাত্রায় পরিণত হয়, পণ্যে সেই মাত্রায় বিকশিত হয় মূল্যরূপে।
প্রথম দৃষ্টিতেই মূল্যের প্রাথমিক রূপের যে দুর্বলতা আমরা অনুভব করি, এই প্রাথমিক রূপটি হচ্ছে একটা অংকুর মাত্র, এর অনেক রূপান্তর ঘটবে এবং শেষ পৰ্যন্ত তার পরিণত মূর্তিতে-দাম আকারে আবির্ভূত হবে।
‘খ’ নামক অন্য যে কোন পণ্যের মারফত “ক পণ্যের মূল্য প্রকাশ দ্বারা কেবলমাত্র ‘ক’-এর মূল্যের সঙ্গে তার ব্যবহার-মূল্যের পার্থক্য সুচিত হয়। কাজেই তার ফলে ‘ক’-কে মাত্র অন্য একটি ভিন্ন রকমের পণ্য ‘খ’-এর সঙ্গে বিনিময়-সম্পর্ক দিয়ে মুক্ত করা হয়ে থাকে। কিন্তু তখনো অন্য কোন পণ্যের সঙ্গে ‘ক’-এর গুণগত সমানতা এবং পরিমাণগত অনুপাত প্ৰকাশিত হয় না। পণ্যের আপেক্ষিক এবং প্ৰাথমিক মূল্যরূপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে সমঅৰ্ঘ্যরূপে বৰ্তমান মাত্র অপর একটি পণ্যে, তথা ছিটের সঙ্গে।
তাহলেও মূল্যের প্রাথমিক রূপ সহজ রূপান্তরের ভিতর দিয়ে তার পূর্ণতর রূপ প্ৰাপ্ত হয়। একথা সত্য যে প্রাথমিক রূপের মাধ্যমে, ‘ক’ পণ্যের মূল্য প্ৰকাশিত হয় অন্য একটিমাত্র পণ্যের সাহায্যে। কিন্তু সেই অপর পণ্যটি কোট, লৌহ, শস্য অথবা যে কোনো অন্য পণ্য হতে পারে। সুতরাং ‘ক’-এর মূল্য ঐ সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন পণ্যের মাধ্যমে প্ৰকাশ করলে আমরা একই পণ্যের ভিন্ন ভিন্ন প্রাথমিক মূল্য-রূপ পাই।দ(৮) এরকম প্ৰাথমিক মূল্য-রূপ ততগুলিই হতে পারে, যতগুলি ভিন্ন ভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়। কাজেই ‘ক’-এর মূল্যের একটি বিচ্ছিন্ন রূপকে মূল্যের প্রাথমিক রূপের একটি রাশিমালায় পরিণত করা যেতে পারে এবং তাকে যথেচ্ছ দীর্ঘ করা চলে।
খ. মূল্যের সামগ্রিক অথবা সম্প্রসারিত রূপ
উ পণ্য ক=ঊ পণ্য, খ কিংবা=চ পণ্য, ছ কিংবা=জ পণ্য, ঝ কিংবা ও পণ্য, ট কিংবা = ইত্যাদি ইত্যাদি। (২৪ গজ ছিট = ১ কোট অথবা ১০ পাউণ্ড চা, অথবা = ৪০ পাঃ কফি অথবা = ১ কোয়ার্টার, শস্য, অথবা = ২ আউন্স স্বর্ণ অথবা = অর্ধটন লৌহ অথবা = ইত্যাদি।)
১. মূল্যের সম্প্রসারিত আপেক্ষিক রূপ
যে কোন একটিমাত্র পণ্যের মূল্য, যেমন ছিটের মূল্য, এখন পণ্যজগতের অন্যান্য সংখ্য উপাদানের মাধ্যমে প্ৰকাশিত হয়। অন্য প্ৰত্যেকটি পণ্য এখন ছিটের মূল্যের দর্পণ স্বরূপ!(৯) এইভাবেই মূল্য সর্বপ্রথম নিবিশেষিত মনুষ্য-শ্রমের সংহতির আকারে নিজস্ব প্রকৃতরূপে আবির্ভূত হয়। কারণ, যে-শ্রম তাকে সৃষ্টি করল তা এখন আত্মপ্ৰকাশ করল নির্বিশেষ শ্রমের তা সে দরজীর কাজ, হাল চালনা, খনি খনন প্রভৃতি যে কোন ধরনের শ্ৰমই হোক না কেন; আর তার ফলে কোট, শস্য, লৌহ অথবা স্বর্ণ যে কোন দ্রব্যেরই উৎপাদন হয়ে থাক না কেন। ছিট এখন তার নিজস্ব মূল্যের রূপ হিসেবে কেবল একটি মাত্র পণ্যের সঙ্গে নয়, সমগ্র পণ্য জগতের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক পাতিয়েছে। পণ্য হিসেবে এখন সে সারা দুনিয়ার নাগরিক! সেই সঙ্গে মূল্য সমীকরণের অন্তনিহিত রাশিমালার মধ্যে এই তাৎপৰ্যও নিহিত আছে যে পণ্যের মূল্য যে আকার, যে প্ৰকার, যে বস্তুর মূল্যের মাধ্যমই প্রকাশিত হোক না কেন তাতে তার কোন ইতর বিশেষ ঘটে না।
