অতএব সমার্ঘরূপের দ্বিতীয় বিশেষত্ব হল বিশিষ্ট শ্রম রূপেই তার বিপরীত তথ্য অমূর্তায়িত মনুষ্য-শ্ৰম আত্মপ্ৰকাশ করে থাকে।
কিন্তু যেহেতু এই বিশিষ্ট শ্রম, উপস্থিত ক্ষেত্রে দরজীর কাজ, অবিশিষ্ট মনুষ্য শ্রমের মধ্যে গণ্য, এবং সরাসরি অবিশিষ্ট শ্রম বলেই তাকে চেনা যায়। সেহেতু এই শ্ৰম অন্য যে কোন ধরনের শ্রমের মধ্যেই অভিন্ন বলে ধর্তব্য, কাজেই ছিটের মধ্যে যে শ্রম অঙ্গীভূত হয়ে আছে তার সঙ্গে তা অভিন্ন। তার ফলে যদিও অন্যান্য সর্বপ্রকার পণ্য-উৎপাদক শ্রমের মতো এই শ্রমও পৃথক পৃথক ব্যক্তির শ্রম, তথাপি সেই সঙ্গে তার চরিত্র প্ৰত্যক্ষভাবে সামাজিক বলে পরিগণিত! সেইজন্যই এই শ্ৰীমদ্বারা উৎপন্ন দ্রব্য সরাসরি অন্য যেকোনো দ্রব্যের সঙ্গে বিনিময়যোগ্য। তাহলে আমরা পাচ্ছি সমার্ঘরূপের তৃতীয় বিশেষত্ব, অর্থাৎ লোকের ব্যক্তিগত শ্রম ঠিক তার বিপরীত, তথা শ্রমের প্রত্যক্ষ সামাজিক রূপ ধারণ করে।
সমাৰ্ণরূপের শেষ দুটি বিশেষত্ব আরও সহজবোধ্য হয় যদি আমরা ফিরে যাই সেই মহান তত্ত্ববিদের কথায়, যিনি সর্বপ্রথম বহুবিধ রূপ বিশ্লেষণ করেছিলেন,- চিস্তায় সমাজের অথবা প্ৰকৃতিক-এবং এসবের মধ্যে মূলোর রূপও ছিল। আমি অ্যারিস্ততলের কথা বলছি।
প্রথমতঃ তিনি পরিষ্কারভাবেই এই সিদ্ধান্ত টেনেছেন যে, মূল্যের সরল রূপটিই ক্ৰমবিকাশ সূত্রে উন্নত স্তরে পৌছে অর্থব্ধপ ধারণ করে, এই অর্থব্ধপটি হলো এলোমেলোভাবে বাছাই করা অন্য যেকোন পণ্যের মূল্যের অভিব্যক্তি , কারণ তিনি বলেছেন–৫ বিছানা = ১ ঘর আর ৫ বিছানা = এতটা অর্থ–এর একটাকে অপরটি থেকে পৃথক বলে বিবেচনা করা চলে না। তিনি আরও দেখিয়েছেন যে, যে-মূল্যসম্পর্ক থেকে এই রাশিমালার উৎপত্তি তা থেকে দাঁড়ায় এই যে গুণগতভাবে ঘরটিকে বিছানার সমান হতে হবে, এবং এইরকম সমান না হলে এই দুটি স্পষ্টতঃ ভিন্ন জিনিসের মধ্যে পরিমাপযোগ্য পরিমাণের দিক থেকে তুলনা হতে পারে না। তিনি বলেছেন, ‘সমানে সমানে ছাড়া বিনিময় হয় না এবং পরিমাপযোগ্য না হলে সমান সমান হয়। না।” তিনি অবশ্য এখানেই থেকে গিয়েছেন এবং মূল্য রূপের আর কোন বিশ্লেষণ দেননি। যাহোক, এরকম ভিন্ন ভিন্ন জিনিসের পক্ষে প্রকৃতভাবে পরিমাপযোগ্য হওয়া অসম্ভব। অর্থাৎ গুণগতভাবে সমান হওয়া অসম্ভব। এরকম সমীভবন তাদের প্ৰকৃত চরিত্রের বিরোধী, কাৰ্যতঃ তা হচ্ছে “কেবল কাজ চালাবার মত একটি দায়-সারা ব্যবস্থা।”
অতএব, অ্যারিস্ততল নিজেই আমাদের বলেছেন কী সেই ব্যাপারটি যা তার পরবর্তী বিশ্লেষণের পথরোধ করে দাড়িয়েছে; তা হচ্ছে মূল্য সম্পর্কে কোন ধারণার অভাব। সেই সমান জিনিসটি কী, কী সেই সাধারণ সামগ্ৰীটি, যা একটি ঘরের মাধ্যমে বিছানার মূল্য প্ৰকাশ করায়। অ্যারিস্ততল বলছেন যে, সত্য সত্যই এরকম জিনিস থাকতে পারে না। এবং কেন পারে না? বিছানা এবং ঘর এই উভয়ের মধ্যে যা সত্য সত্যই সমান তারই পরিচায়ক হিসেবে, ঘরের মধ্যে এমন একটা জিনিস তো আছেই। যা বিছানার সঙ্গে তুলনায় সমান — এবং সেই জিনিসটি হচ্ছে মানুষের শ্রম। পণ্যের উপর মূল্য আন্দ্রেপ করা মানেই যে সর্বপ্ৰকল্প, শ্রমকেই সমান মনুষ্য শ্রমরূপে প্ৰকাশ করা এবং তার মানে দাঁড়ায় শ্রমকে ‘গুণগতভাবে সমান বলে গণ্য করা, সেকথা বুঝবার পথে অ্যারিস্ততাল-এর পক্ষে বাধা স্বরূপ ছিল একটি জরুরী তথ্য। গ্রীক সমাজের ভিত্তি ছিল গোলামি এবং সেইজন্যই মানুষের এবং তাদের শ্রম-শক্তির বৈষম্য ছিল তার স্বাভাবিক বনিয়াদ। যেহেতু সমস্ত শ্রমই সাধারণভাবে মনুষ্য শ্ৰম, সেইহেতু এবং সেই হিসেবেই, সর্বপ্রকার শ্রমই সমান এবং পরস্পরের সমার্ঘ্যরূপ, এই হলো মূল্য প্রকাশের গুপ্ত বৃহস্য, কিন্তু মানুষ মানুষের সমান এই ধারণা যতক্ষণ না জনগণের মনে সংস্কােররূপে বদ্ধমূল হয়ে যায় ততক্ষণ সে রহস্যের দ্বার উদঘাটন করা যায় না। এটা অবশ্য শুধু সেই সমাজেই সম্ভব যেখানে শ্ৰমদ্বারা উৎপন্ন রাশি রাশি দ্রব্যসম্ভার পণ্যরূপ ধারণ করে এবং যার ফলে মানুষের সঙ্গে মানুষের মুখ্য সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায় পণ্যের সম্পর্ক। তবু অ্যারিস্ততল এর প্রতিভার প্রোজ্জলতা এই থেকেই বোঝা যায় যে তিনি পণ্যমূল্য প্রকাশের ভিতর সমানতার সম্বন্ধ আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু অ্যারিস্ততল যে-সমাজে বাস করতেন তার বিশিষ্ট অবস্থাই তার বাধা ছিল এই সমানতার মূলে ‘সত্য সত্যই কি আছে তা আবিষ্কার করুবার পথে।
৪. মূল্যের প্রাথমিক রূপের সামগ্রিক বিচার
কোন পণ্য-মূল্যের প্রাথমিক রূপ এমন একটি সমীকরণের মধ্যে বিধৃত থাকে, যা ভিন্ন ধরনের আরেকটি পণ্যের সঙ্গে তার মূল্য-সম্পর্ক প্রকাশ করে : কিংবা বলা যে কোন পণ্য-মূল্যের প্রাথমিক রূপ বিধুতি থাকে ভিন্ন ধরনের আরেকটি পণ্যের সঙ্গে তার বিনিময়-সম্পর্কের মধ্যে। ‘ক’ পণ্যের মূল্য গুণগতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে এই তথ্য দ্বারা যে ‘খ’ পণ্যের সঙ্গে তা বিনিময়যোগ্য। অর্থাৎ কিনা পণ্যের মূল্য বিনিময় মূল্যের রূপ ধারণ করে স্বতন্ত্র এবং নির্দিষ্ট সত্তায় প্রকাশমান। যখন এই অধ্যায়ের গোড়ার দিকে আমরা মামুলিভাবে বলেছিলাম যে, পণ্য একাধারে ব্যবহার মূল্য ও বিনিময় মূল্য তখন আমরা আসলে ভুল বলেছিলাম। পণ্যের দুই পরিচয়, ব্যবহার মূল্য বা উপযোগের বিষয় এবং মূল্য। পণ্য এই দ্বিবিধরপে তখনি আত্মপ্রকাশ করে, যখন তার মূল্য একটি স্বতন্ত্ররূপ- অৰ্থাৎ বিনিময় মূল্যের রূপ ধারণ করে না। এটা যখন আমাদের জানা থাকে, তখন এ ধরনের প্রকাশ ভঙ্গিতে কোন ক্ষতি হয় না; বরং সংক্ষিপ্তাকারে কথাটা প্রকাশ করার সুবিধা হয়।
