প্রথমতঃ, শ্রম-দিবসকে সীমাহীন ও বেপরোয়াভাবে বাড়াবার জন্য ধনিকদের আবেগ প্রথমে তৃপ্ত হয় সেইসব শিল্পে, যেগুলিতে জল-শক্তি, বাষ্প ও যন্ত্র প্রবর্তনের ফলে বিপ্লবী রূপান্তর এসেছিল—যেগুলি হচ্ছে আধুনিক উৎপাদন-পদ্ধতির প্রথম সৃষ্টি, যেমন, তুলো, শন, পশম ও রেশমের সুতোকাটা ও বোনা। উৎপাদনের বাস্তব পদ্ধতিতে পরিবর্তন এবং তদনুযায়ী উৎপাদকদের সামাজিক সম্পর্কসমূহের পরিবর্তনই[১] প্রথমে একটা সীমাহীন বাড়াবাড়ির উদ্ভব ঘটালো এবং পরে তারই প্রতিবাদে সমাজের পক্ষ থেকে আরোপিত হল একটি নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা যাতে শ্রম-দিবস এবং তার বিরতিগুলি নির্দিষ্ট, নিয়মিত ও অভিন্ন হল। তাই প্রথমে এই নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটিকে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে কেবল ব্যতিক্রমমূলক আইন হিসাবে দেখা যায়।[২] নোতুন উৎপাদন পদ্ধতি শিল্পের এই অংশে প্রথমে আধিপত্য বিস্তার সম্পূর্ণ করার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল যে, ইতিমধ্যে উৎপাদনের অন্যান্য শাখাতেই যে শুধু এই উৎপাদন-পদ্ধতি প্রসারিত হয়েছে তাই নয়, উপরন্তু কম-বেশি সেকেলে কায়দায় চালিত বহু শিল্প, যেমন মৃৎশিল্প ও কাচ শিল্প প্রভৃতি, একেবারে সাবেকি হস্তশিল্প, যেমন রুটি তৈরি, এবং শেষ পর্যন্ত এমনকি সেইসব তথাকথিত ঘরোয়া শিল্প যেমন পেরেক তৈরি,[৩]-এই সবগুলি শিল্পই, কারখানা-ব্যবস্থার মত, ধনতান্ত্রিক শোষণের সম্পূর্ণ শিকারে পরিণত হয়েছে। তাই আইনের বিধানে ব্যতিক্রমমূলক চরিত্রটি ক্রমেই বাদ দেওয়া প্রয়োজন হল, অথবা ইংল্যাণ্ডের মত দেশে, রোমান ক্যাস্টদের অনুকরণে ঘোষণা করা হল যে, যে-কোন বাড়ি যেখানে কাজ করা হয়, তাকেই বলা হবে কারখানা।[৪]
দ্বিতীয়ত, উৎপাদনের কয়েকটি বিশেষ শাখায় শ্রম-দিবস নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে যে সংগ্রাম এখনো চলছে তার থেকে চূড়ান্তভাবেই প্রমাণিত হয়েছে যে, একটি বিচ্ছিন্ন শ্রমিক যে নিজের শ্রমশক্তির স্বাধীন বিক্রেতা তার পক্ষে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন একটি বিশেষ স্তরে পৌছবার পরে বিনা প্রতিরোধে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। সেইজন্যই স্বাভাবিক শ্রম-দিবসের প্রতিষ্ঠা হচ্ছে ধনিক-শ্রেণী ও শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে দীর্ঘকালব্যাপী একটি মোটামুটি ছদ্মবেশী গৃহযুদ্ধের ফল। যেহেতু এই সংগ্রামের সূত্রপাত ঘটে আধুনিক শিল্পের বঙ্গমঞ্চে, সেইহেতু এর সূচনা হয় এই শিল্পের আবাসভূমি ইংল্যাণ্ডে।[৫] ইংল্যাণ্ডের কারখানা-শ্রমিকেরা কেবল ইংল্যাণ্ডের নয়, পরন্তু সাধারণভাবে আধুনিক শ্রমিক শ্রেণীরই প্রবক্তা এবং তাদের মতবাদের প্রবর্তকরূপে এরাই প্রথম ধনতন্ত্রের মত বাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণ করল।[৬] এইজন্যই মূলধন যখন ‘শ্রমের পূর্ণ স্বাধীনতা”-র জন্য পৌরুষ সহকারে সংগ্রাম করছে, তখন তাদের বিরুদ্ধে যে পতাকা শ্রমিকেরা উড্ডীন করেছিল, তার উপরে কারখানা আইনের গোলামি” কথাটি খচিত করাকে কারখানার দার্শনিক, উরে, তীব্র ভাষায় নিন্দা করে বলেছেন যে এটা ইংল্যাণ্ডের শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে অনপনীয় কলংকস্বরূপ।[৭]
ফ্রান্স ইংল্যাণ্ডের পিছনে পিছনে খুড়িয়ে চলে। ফেব্রুয়ারী বিপ্লবের প্রয়োজন হয় বারো ঘণ্টার শ্রম-দিবস আইন প্রবর্তনের জন্য,[৮] যদিও মূল ব্রিটিশ আইনের চেয়ে এটা অনেক বেশী ত্রুটিপূর্ণ ছিল। সে যাই হোক, ফ্রান্সের বিপ্লবী পদ্ধতির কিছু বিশেষ সুবিধা আছে। ইংল্যাণ্ডের আইন ঘটনাবলীর চাপে যে ব্যবস্থা অনিচ্ছা সত্ত্বেও করতে বাধ্য হয়, প্রথমে একটি জায়গায়, পরে আর একটি জায়গায় এবং এইভাবে পরস্পর-বিরোধী আইনের ধারাগুলির এক বিভ্রান্তিকর ও হতাশা জনক জট পাকিয়ে ফেলে, সেক্ষেত্রে ফরাসীরা সর্বত্র, সমস্ত কারখানা ও কর্মশালায় বিনা ব্যতিক্রমে একই সঙ্গে একই শ্রম-দিবসের অধীনে এনে ফেলল।[৯] অপরপক্ষে, ফরাসী আইন যে জিনিসটিকে নীতি হিসেবে ঘোষণা করল, সেটি ইংল্যাণ্ডে
প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কেবল শিশু, নাবালক ও নারী শ্রমিকদের জন্য এবং মাত্র সম্প্রতি এই সর্বপ্রথম তাকে দাবি করা হচ্ছে সকলের অধিকার বলে।[১০]
উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে যতদিন দেশের একটি অংশ ছিল দাসপ্রথার দ্বারা বিকলাঙ্গ, ততদিন শ্রমিকদের প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র আন্দোলন হয়ে যেতে অসাড়। সাদা চামড়ার শ্রম ততদিন মুক্ত হতে পারে না, যতদিন পর্যন্ত কালো চামড়ার এম থাকে গোলাম। কিন্তু দাসত্বের সমাধি থেকে অচিরে ঘটল নব-জীবনের অভ্যুদয়। গৃহযুদ্ধের প্রথম ফল হল আট ঘণ্টার জন্য আন্দোলন যা ইঞ্জিনের মতই দ্রুতগতিতে অতলান্তিক উপকূল থেকে প্রশান্ত মহাসাগর এবং নিউ ইংল্যাণ্ড থেকে ক্যালি ফোর্ণিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। বাল্টিমোরে শ্রমিকদের সাধারণ কংগ্রেস ( ১৬ই আগষ্ট, ১৮৬৬ ) ঘোষণা করল : “বর্তমান সময় সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে আমাদের দেশের শ্রমিকদের জন্য আমেরিকার সকল অঙ্গরাজ্যে আট ঘণ্টা শ্রমের স্বাভাবিক শ্রম-দিবসের একটি আইন প্রবর্তন করে শ্রমিককে বনিকদের গোলামি থেকে মুক্ত করা। আমরা সঙ্কল্প করছি যে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আমরা এই গৌরবময় লক্ষ্য সাধন করবই।”[১১] ঐ একই সময়ে জেনেভায় অনুষ্ঠিত আন্তজাতিক শ্রমিক সংঘের ( ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেস্ অ্যাসোসিয়েশন-এর ) কংগ্রেস লণ্ডনের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের উপর সিদ্ধান্ত করলেন : “শ্রম দিবসকে সীমাবদ্ধ করাই হচ্ছে প্রাথমিক পূর্বশর্ত যেটি না হলে প্রগতি ও মুক্তির জন্য সমস্ত চেষ্টাই নিষ্ফল হতে বাধ্য…… কংগ্রেসের মতে আট ঘণ্টাই এম-দিবসের আইন সঙ্গত সীমা।”
