এইভাবে অতলান্তিক মহাসাগরের উভয় কৃলে যে-শ্রমিক-আন্দোলন উৎপাদনের অবস্থাবলী থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্ম গ্রহণ করল, তা ইংল্যাণ্ডের কারখানা-পরিদর্শক সণ্ডার্সের উক্তিকেই প্রতিপন্ন করল : “সমাজ-সংস্কারের পরবর্তী কোন পদক্ষেপ করতে গিয়ে সফলতার কোনো আশা করা যাবে না, যতদিন পর্যন্ত শ্রমের ঘণ্টা সীমাবদ্ধ না করা যায় এবং অনুমোদিত সীমাকে কঠোরভাবে কার্যকরী না করা যায়।[১২]
এটা স্বীকার করতেই হবে যে উৎপাদন-প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শ্রমিক যখন বেরিয়ে আসে, তখন সে আর ঐ প্রক্রিয়াটিতে প্রবেশের আগেকার ব্যক্তিটি নেই। বাজারে যখন সে নিজের পণ্য “শ্রমশক্তির” মালিকরূপে অন্যান্য পণ্যের মালিকদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, এখন সে ছিল অপর বিক্রেতাদের প্রতিদ্বন্দ্বী একজন বিক্রেতা। কিন্তু যে-চুক্তি মারফৎ সে নিজের শ্রমশক্তি ধনিককে বিক্রি করে, সেইটি বলা যায়, কাগজে-কলমে প্রমাণ করে যে সে নিজেকেই স্বাধীনভাবে বিক্রি করে দিয়েছে। কেনা বেচা সমাপ্ত হলে দেখা যায় যে সে “স্বাধীন বিক্রেতা” নয়, যতটা সময়ের জন্য সে শ্রম শক্তি স্বাধীনভাবে বিক্রি করে, ঠিক ততটা সময়ের জন্যই সে বিক্রি করতে বাধ্য হয়।[১৩] অর্থাৎ বাস্তবিক পক্ষে রক্তচোষা ততক্ষণ তাকে ছাড়ে না যতক্ষণ পর্যন্ত একটিও পেশী, একটি স্নায়ু, একবিন্দু রক্তও শোষণ করা বাকি থাকে।”[১৪] “তাদের যাতনা আশীবিষের কবল থেকে রক্ষা পাবার জন্য শ্রমিকগণকে একত্র হয়ে উপায় উদ্ভাবন করতে হবে এবং শ্রেণীগতভাবে এমন একটি আইনের প্রবর্তন করাতে হবে, যে আইনটি হবে একটি সর্বশক্তিসম্পন্ন সামাজিক নিষেধাজ্ঞা, যাতে ধনিকদের কাছে স্বেচ্ছামূলক চুক্তির দ্বারা ঐ একই শ্রমিকরা নিজেকে ও নিজের পরিবার-পরিজনকে বিক্রি করে গোলামী ও মৃত্যুর বলি হওয়া থেকে বাঁচে।[১৫] “মানুষের অলংঘনীয় অধিকারের আড়ম্বরপূর্ণ তালিকার জায়গায় এল এই আইনতঃ সীমাবৰ শ্ৰম-দিবসের বিনম্র মহাসনদ; যেটি স্পষ্ট করে দেবে যে “কখন থেকে শ্রমিকের আত্মবিক্রয়ের সময় শেষ হয়ে শুরু হবে তার নিজস্ব সময়।”[১৬] Quantum mutatus ab illo!
————
১. “এই শ্রেণীগুলি ( ধনিক ও শ্রমিক) যে আপেক্ষিক পরিস্থিতিতে স্থাপিত হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের আচরণ সেই পরিস্থিতিরই ফল।” ( রিপোের্ট ইত্যাদি, ৩১শে অক্টেবের, ১৮৪৮, পৃঃ ১১৩)।
২. শ্রমিক নিয়োগের যে ক্ষেত্রে নিষেধ আরোপিত হল, সেটি বাষ্প বা জল শক্তির সাহায্যে চালিত বস্ত্র শিল্প। পবিদর্শকদের আওতায় আসতে হলে কোন কারখানার পক্ষে দুটি পূর্বশর্ত ছিল আবশ্যিক: বাষ্প বা জলশক্তির ব্যবহার এবং কয়েকটি বিশেষ ধরনের তন্তু উৎপাদন। (রিপোর্ট ইত্যাদি ৩১শে অক্টোবর, ১৮৬৪, পৃঃ ৮)
৩. তথাকথিত ঘরোয়া শিল্পগুলির ব্যবস্থা সম্পর্কে শিশু নিয়োগ কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্টগুলিতে বিশেষ মূল্যবান তথ্য আছে।
৪. “গত অধিবেশনের (১৮৬৪) আইনগুলি এমন বিভিন্ন বৃত্তিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে যাদের রীতিনীতি বিপুলভাবে বিভিন্ন; আগে আইনের চোখে ‘কারখানা বলে গণ্য হতে হলে প্রতিষ্ঠানটি এমন হতে হত যেখানে মেশিনারিতে গতি সঞ্চার করতে যান্ত্রিক শক্তির ব্যবহার করতে হত, কিন্তু এই আইনে এই শর্তটি বাদ দেওয়া হয়েছে। রিপোর্ট ইত্যাদি ৩১শে অক্টোবর, ১৮৬৪ পৃঃ ৮)
৫. ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে উদার নীতিবাদের স্বর্গ বেলজিয়ামে এই আন্দোলনের চিহ্নমাত্র দেখা যায় না। এমনকি কয়লাখনি ও লোহার খাদে সব বয়সের নারী ও পুরুষ শ্রমিক, পূর্ণ স্বাধীনতার মধ্যেই যে কোন সময়ে এবং যতঘণ্টা খুশি ব্যবহৃত হয়। নিযুক্ত হাজার জনের মধ্যে ৭৩৩ জন পুরুষ, ৮ জন নারী এবং ১৩৫ জন বালক এবং ৪৪ জন ১৬ বছরের কম বয়সের বালিকা। ব্লাস্ট ফানেসে প্রতি হাজার জনে ৬৬৮ পুরুষ, ১৪৯ নারী, ৮ বালক ও ৮৫ জন ষোল বছরের কম বয়সের বালিকা। এর সঙ্গে যোগ করুন পরিণত ও অপরিণত শ্রমিকদের অল্প মজুরির দরুন বিরাট শোষণের হিসাব। একজন পুরুষের গড় দৈনিক মজুরি দুই শিলিং আট পেনি, নারী শ্রমিকের এক শিলিং আট পেনি, বালকের মজুরি এক শিলিং ২২ পেনি। এর ফলে ১৮৬৩ সালে ১৮৫০ সালের তুলনার বেলজিয়াম প্রায় দ্বিগুণ মূল্যের ও পরিমাণের কয়লা, লোহা প্রভৃতি রপ্তানি করে।
৬. ১৮১০ সালের ঠিক পরে রবার্ট ওয়েন শুধু যে নীতির দিক দিয়েই শ্রম দিবসের নিয়ন্ত্রণ সমর্থন করেন, তাই নয়, পরন্তু কার্যক্ষেত্রে তিনি নিউ লানাকে তার কারখানায় দশ ঘণ্টা এম-দিবস প্রবর্তন করেন। একে কমিউনিস্ট-কল্পনা বিলাস আখ্যা দিয়ে উপহাস করা হয়। তার পরিকল্পিত শিশুদের শিক্ষার সঙ্গে উৎপাদনশীল শ্রমের সমন্বয় সাধনের পদ্ধতি এবং তার দ্বারা সর্বপ্রথম গঠিত শ্রমিকদের সমবায় সমিতি নিয়েও হাসাহাসি চলে। বর্তমান সময়ে প্রথম নম্বর কল্পলোকটি (ইউটোপিয়া) রূপ নিয়েছে কারখানা-আইনে, দ্বিতীয়টি সমস্ত কারখানা-আইনের বয়ানে সরাসরি স্থান পেয়েছে, তৃতীয়টি ইতিমধ্যেই প্রতিক্রিয়াশীল ভণ্ডামীর আবরণ রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে।
৭. উরে : “Philosophie des Manufactures” প্যারিস, ১৮৩৬ ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৯, ৪০, ৬৭, ৭৭ ইত্যাদি।
৮. ১৮৫৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান কংগ্রেসের রিপোর্টে বলা হয়েছে : ফরাসী আইনে কারখানাগুলিতে দৈনিক শ্রমের ঘণ্টাকে বারো ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু তাতে কোন সময়ের ধরাবাধা নেই। শুধু শিশুদের শ্রমের ক্ষেত্রে সময় নির্দিষ্ট হয়েছে সকাল পাচটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত। সেইজন্য এই নীরবতার সুযোগ নিয়ে কোন কোন মালিক তাদের কারখানা প্রত্যহ অবিরাম দিনরাত চালাত, কেবল রবিবারের ছুটিটা সম্ভবতঃ বাদ দিয়ে। এইজন্য তারা দু’দল শ্রমিক নিয়োগ করত যাদের কেউই বারো ঘণ্টার বেশি। একাদিক্রমে কাজ করত না কিন্তু কারখানা দিনরাত চলত। আইন এতে সন্তুষ্ট, কিন্তু মানবতা? তাছাড়া মানুষের শরীরের উপর রাত্রের শ্রমের ক্ষতিকর প্রভাব বিচার করুন। তারপর জোর দেওয়া হয় “স্বল্প আলোকিত একই কারখানা ঘরে রাত্রে স্ত্রী পুরুষের একত্র অবস্থানের মারাত্মক কুফলের উপরে।”
