৫২. ‘খোলা হাওয়ায় ব্লিচিং’-এর মালিকপক্ষ এই মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে ১৮৬০ সালের আইন এড়িয়ে যেতে চাইত যে কোনো স্ত্রীলোকই রাত্রে ঐ কাজ করত না। কারখানা-পরিদর্শকেরা এই মিথ্যাটি ধরিয়ে দিলেন এবং ঐ একই সময়ে শ্রমজীবীদের বিভিন্ন আর্জি মারফৎ পালমেন্টের সদস্যদের মন থেকে স্নিগ্ধ ও সুগন্ধ তৃণপূর্ণ মাঠে, খোলা হাওয়ার পরিবেশে ব্লিচিং চলার কাহিনী দূরীভূত হল। এই খোলা হওয়ায় ব্লিচিং-এ যে সব শুকাবার ঘর ব্যবহৃত হত সেগুলির তাপমাত্রা ছিল ১০ থেকে ১০০° ফারেনহি এবং এখানে কাজটি করত প্রধানতঃ বালিকারা। ঠাণ্ডা হওয়া’-এই পারিভাষিক কথাটি তারা এই অর্থে ব্যবহার করত যে, তারা শুক্রবার ঘর থেকে পালিয়ে মুক্ত টাটকা হাওয়ায় যেত। স্টোভের কামরায় পনেরটি বলিকা। লিনেনের জন্য ৮০ থেকে ৯০ তাপমাত্রা এবং কেম্বিকের জন্য ১০০ বা ততোধিক। আড়াআড়ি দশ ফুটের মত একটি ছোট ঘরে বারোজন বালিকা ইস্ত্রি ও অন্যান্য কাজ করে, ঐ ঘরের ঠিক মাঝখানে একটি ক্লোজ স্টোভ। স্টোভটা নিদারুণ তাপ ছড়ায় এবং তার চারপাশে বাড়িয়ে বালিকারা তাড়াতাড়ি কেম্বিকগুলি শুকিয়ে ইস্ত্রিওয়ালাদের হাতে দেয়। এইসব শ্রমজীবীদের শ্রমের ঘণ্টার কোন নির্দিষ্ট সীমা নেই। কাজ থাকলে এরা পরপর রাত নয়টা অথবা এমনকি বারোটা পর্যন্ত কাজ করে। ( রিপোর্ট ইত্যাদি, ৩:শে অক্টোবর, ১৮৬২, পৃঃ ৫৬ ) একজন চিকিৎসক উক্তি করেন : ‘ঠাণ্ডা হবার জন্য কোন সময় নির্দিষ্ট করা নেই কিন্তু যদি তাপমাত্রা ভয়ানক উচু হয়ে যায় অথবা যদি কারিগর দের হাত ঘামে নোংরা হয়ে যায় তবেই তাদের অল্প কয়েক মিনিটের জন্য বাইরে। যেতে দেওয়া হয় ….. আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে, যার পরিমাণ বড় কম নয়, এই স্টোভের কারিগরদের রোগ-চিকিৎসা আমাকে এই মত প্রকাশ করতে বাধ্য করছে যে, এদের স্বাস্থ্যরক্ষার ব্যবস্থা কোনক্রমেই একটি সুতোকলের শ্রমিকদের ‘সমান পর্যায়ের নয় (এবং ধনিকরা পালমেন্টের কাছে পাঠানো তাদের স্মারক লিপিতে এদের বর্ণোজ্জ্বল স্বাস্থ্যের ছবি একেছিল প্রায় চিত্রশিল্পী রুবেন্স-এব অনুকরণে )। তাদের মধ্যে যেসব রোগের প্রাদুর্ভাব ছিল, সেগুলি হচ্ছে যক্ষ্মা, ব্রঙ্কাইটিস, জরায়ুর অনিয়মিত ক্রিয়া, অত্যন্ত উগ্ৰধরনের হিষ্টিরিয়া এবং বাত। আমি মনে করি যে, এই সবগুলিই প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে এসেছে ঐ সব ঘরে এই কারিগরেরা কাজ করে সেখানকার দূষিত ও অত্যন্ত গরম হাওয়া থেকে এবং যখন তার বিশেষতঃ শীতকালে বাইরের ঠাণ্ডা ও ভিজে বাতাসের মধ্যে দিয়ে বাড়ি ফিরে যায় তখন তাদের রক্ষার উপযুক্ত যথেষ্ট গরম পোশাকের অভাব থেকে। (1c. পৃষ্ঠা ৫৬-৫৭ )। ১৮৬০ সালের পরিপূরক আইন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ঐ আইনের সংরক্ষণের বাইরের এই খোলা হাওয়ায় ব্লিচিং কারিগরদের সম্পর্কে বলেন : “যে রক্ষাব্যবস্থা করবার কথা শুধু যে সেই ব্যবস্থা করতে আইনটি অক্ষম হয়েছে তাই নয়, পরন্তু এতে একটি ধারা আছে তদনুযায়ী তার শব্দবিন্যাস বাহত এমনই যে যদি না রাত্রি আটটার পরে কাজ করছে এমন অবস্থায় হাতে নাতে ধরা হয় তাহলে তাদের জন্য কোনো রক্ষণ-ব্যবস্থাই নেই এবং তেমন ক্ষেত্রেও প্রমাণের পদ্ধতি এমনই যে তাতে কোনো সাজা হতে পারে কিনা তাতেও সন্দেহ আছে।”…..(1. c. পৃঃ ৫২) “অতএব, সবদিক দিয়ে দেখা যায় যে আইন হিসেবে কোন সদুদ্দেশ্য সাধনে অথবা শিক্ষার মাধ্যমরূপে এটি ব্যর্থ হয়েছে, কারণ যেহেতু এই ব্যবস্থাকে সদাশয় বলা যায় না যাতে কার্যক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে নারী ও শিশুকে দিনে চোদ্দ ঘন্টা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে খেয়ে-না-খেয়ে কাজ করতে হয়, এবং হয়ত তার চেয়েও বেশি ঘণ্টা,—যেখানে বয়সের কোন সীমা নেই, নারী-পুরুষ বিচার নেই, এবং সন্নিহিত এলাকার বাসিন্দাদের সামাজিক অভ্যাস ও রীতি সম্পর্কে কোন ক্ষেপ নেই যে জায়গায় ঐসব (ব্লিচিং ও রংএর) কারখানাগুলি অবস্থিত।” (রিপোর্ট ইত্যাদি ৩০ এপ্রিল, ১৮৬৩, পৃঃ ৪০)।
৫৩. ২য় সংস্করণের নোট। ১৮৬৬ সাল থেকে অর্থাৎ আমি উপরের অধ্যায়গুলি লেখার পরে আবার এক প্রতিক্রিয়া এসেছে।
.
.
১০.৭ স্বাভাবিক শ্রম–দিবসের জন্য সংগ্রাম—অন্যান্য দেশে ইংল্যাণ্ডের কারখানা–আইনগুলির প্রতিক্রিয়া
পাঠক মনে রাখবেন যে, মূলধনের কাছে শ্রমের বশ্যতা থেকে যার উদ্ভব ঘটতে পারে, উৎপাদন-পদ্ধতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ভাবে, উত্তমূল্যের উৎপাদন অথবা বাড়তি শ্রমের নিষ্কর্ষণই হচ্ছে ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের বিশেষ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, তার মর্মসত্তা। পাঠক মনে রাখবেন যে, আমরা এখনো পর্যন্ত যতটা এগিয়েছি তাতে কেবল স্বাধীন শ্রমিক অর্থাৎ কেবল সেই শ্রমিক, যে আইনত: নিজের পক্ষে কাজ করতে আইনতঃ যোগ্যতাসম্পন্ন, একমাত্র সে-ই একটি পণ্যের ফেরিওয়ালা হিসাবে ধনিকের সঙ্গে চুক্তিতে প্রবেশ করে। অতএব আমাদের এই ঐতিহাসিক বিবরণে যদি একদিকে আধুনিক শিল্প এবং, অন্যদিকে, যারা শারীরবৃত্ত ও আইন—দুদিক থেকেই যারা নাবালক, তাদের শ্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে, তা হলে প্রথমটিকে আমরা দেখেছি উৎপাদনের একটি বিশেষ বিভাগরূপে এবং দ্বিতীয়টিকে শ্রম-শোষণের একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্তরূপে। যাই হোক, আমাদের পরবর্তী অনুসন্ধান সম্পর্কে আগে থেকে কোন অনুমান না করে, শুধু আমাদের হাতে মজুদ ঐতিহাসিক তথ্যসমূহ থেকেই এটা বেরিয়ে আসে।
