কারখানা আইন সর্বপ্রথম তার মূল পরিধি অতিক্রম করল “১৮৪৫ সালের ছাপাখানা আইনে।” আইনটির প্রতি ছত্রে ফুটে উঠেছে যে এই নূতন “বাড়াবাড়িকে” ধনিকেরা কি রকম বিরক্তির সঙ্গে গ্রহণ করেছিল। এতে শিশুদের জন্য শ্রম দিবসকে আট থেকে তেরো ঘণ্টায় নির্দিষ্ট করা হয় এবং নারীদের জন্য সকাল ছটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ষোল ঘণ্টা, খাবার জন্য আইনে নির্দিষ্ট কোন বিরতি ছিল না। এতে তেরো বছরের বেশি বয়সের পুরুষদের দিনে ও রাতে খুশিমত খাটানো যেত।[৪৭] এই আইনটি পার্লামেন্টের একটি গর্তস্রাব।[৪৮]
যাই হোক আধুনিক উৎপাদন-প্রণালীর সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সৃষ্টি হল শিল্পের বৃহৎ শাখাগুলি; সেগুলিতে জয়লাভের সঙ্গে সঙ্গে এই নীতিটির বৈজয়ন্তী ঘোষিত হল। ১৮৫৩ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে এই শাখাগুলিতে বিস্ময়কর অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কারখানা শ্রমিকদের দৈহিক ও নৈতিক পুনকখান চলতে থাকে যাতে প্রায় অন্ধ ব্যক্তিরও চোখ খুলে যায়। অর্ধ শতাব্দীর গৃহযুদ্ধের ফলে মালিকদের কাছ থেকে। ধাপে ধাপে শ্রমের যে-সব আইনগত সীমা ও নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে হয়েছে, এরাই ঘটা করে এখন এইসব শাখায় শোষণের দিকে যেখানে ঐ শোষণ এখনও ‘স্বাধীন’[৪৯] ছিল সেইদিকে, তুলনামূলকভাবে অঙ্গুলি নির্দেশ করেন। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির হাতুড়ে পণ্ডিতরা এমন জ্ঞানগর্ভ ঘোষণা করলেন যে, আইন দ্বারা নির্দিষ্ট শ্রম-দিবসের নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা হচ্ছে তাদের বিজ্ঞানের”,[৫০] একটি বিশিষ্ট-নূতন আবিষ্কার। সহজেই বোঝা যায় যে কারখানা মালিকরা যখন হাল ছেড়ে দিয়ে অনিবার্যকে মেনে নিলেন, যখন ধনতন্ত্রের প্রতিরোধের ক্ষমতা ক্রমে কমে এল, একই সময়ে যখন এই প্রশ্নের সঙ্গে স্বার্থের দিক দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নয় এমন সব সহযোগীদের সংখ্যা বাড়তে থাকল, -সেই সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকল শ্রমিক শ্রেণীর আক্রমণের ক্ষমতা। এইজন্যই ১৮৬০ সালের পর থেকে অপেক্ষাকৃত দ্রুত অগ্রগতি ঘটল।
১৮৬০ সালে রং ও ব্লিচিং কারখানাগুলি সব ১৮৫০ সালের কারখানা-আইনের অধীনে এল[৫১], লেস ও মোজার কারখানাগুলি এল ১৮৬১ সালে।
শিশু নিয়োগ কমিশনের প্রথম রিপোর্টের (১৮৬৩) ফলে সব রকমের মৃৎশিল্প (কেবল পটারিই নয়, দেশলাই, কাতুজ, কার্পেট এবং অন্যান্য আরো অনেক প্রক্রিয়ায়, এককথায় যেগুলিকে বলা হয় ফিনিশিং, সেই সমস্ত কিছুর ম্যানুফ্যাকচার কারীদের অদৃষ্টে একই ব্যাপার ঘটল। ১৮৬৩ সালের খোলা বাতাসে[৫২] ব্লিচিং এবং রুটি সেঁকার কাজকে বিশেষ বিশেষ আইনের আওতায় আনা হল যাতে করে প্রথমো ঔ কাজে নাবালক ও নারী শ্রমিকদের জন্য রাত্রে কাজ ( রাত আটটা থেকে সকাল ছটা পর্যন্ত) এবং শেষেরটিতে আঠারো বছরের নিম্নবয়স্ক শিক্ষানবীশ রুটি কারিগরদের রাত নটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত কাজ নিষিদ্ধ হয়। আমরা পরে ঐ একই কমিশনের পরবর্তী প্রস্তাবগুলির আলোচনা করব, যেগুলির কৃষি, খনি ও যানবাহন ছাড়া ব্রিটিশ শিল্পের সকল গুরুত্বপূর্ণ শাখায় তাদের এই “স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করবার আশংকা সৃষ্টি করেছে।[৫৩]
————
১. “এটা নিশ্চয়ই বিশেষ পরিতাপের বিষয় যে সমাজের কোন শ্রেণীর মানুষেরা দিনে ১২ ঘন্টা করে কাজ করবে আহার ও কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় ধরে যা কার্যত দাড়ায় দিনে ১৪ ঘণ্টা। আমার বিশ্বাস, স্বাস্থ্যের প্রশ্নে না গিয়েও কেউ এটা স্বীকার করতে দ্বিধা করবেন না যে, নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সেই শৈশবের ১৩ বছর বয়স থেকে এবং, যেসব শিল্পে কোনো বিধি-নিষেধ নেই, সেগুলিতে আরো অল্প বয়স থেকে, শ্রমজীবী শ্রেণীগুলির সমগ্র সময় এমন ছেদহীন একটানা ভাবে আত্মসাৎ করে যে তার ব্যাপারটা এমন অনিষ্টকর যে তা দারুণ ভাবে নিন্দনীয়। ……. সুতরাং, সর্বজনিক নীতিবোধ জনগণের সুশৃংখল জীবন বিন্যাস এবং তাদের জন্য জীবন সম্ভোগের যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দানের স্বার্থে, এটা বিশেষ ভাবে বাঞ্ছনীয় যে সমস্ত শিল্পেই শ্রম-দিবসের একটা অংশকে বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য সংরক্ষিত রাখতে হবে। ( লিনাড’ হনরি কারখানা পরিদর্শকদের রিপোর্ট, ৩১শে ডিসেম্বর, ১৮৪১ )
২. ‘কাউন্টি অনিট্রিম, ১৮৬’তে মিঃ জে, এইচ ওটয়ে, বেলফাস্ট হিলারি সেসন কাউন্টি অ্যান্টিম বিচারের রায় দ্রষ্টব্য।
৩. বুর্জোয়া রাজা লুই ফিলিপ্পির রাজত্বের এটা একটা স্বভাব সুলভ বৈশিষ্ট্য যে তার রাজত্বকালে ১৮২৫ সালের ২২শে মার্চ তারিখে গৃহীত কারখানা-আইনটি কখনো কার্যকরী করা হয়নি। আর এই আইনটি ছিল শিশু শ্রম সংক্রান্ত। এই আইনে ধার্য হয়েছিল যে ৮ থেকে ১২ বছরের শিশুদের শ্রম-দিবস হবে ৮ ঘণ্টা ১২ থেকে ১৬ বছরের শিশুদের ১২ ঘণ্টা ইত্যাদি। এর মধ্যে ছিল আবার অনেক ব্যতিক্রম, যাতে ৮ বছরের শিশুদেরও রাতে কাজ করাবার ব্যবস্থা ছিল। যে দেশে প্রত্যেকটি ইদুরও পুলিশ প্রশাসনের অধীনে, সেখানে এই আইনের তদারকি ও প্রয়োগের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল ‘amis du combsrce’-এর সদিচ্ছার উপরে। কেবল এই ১৮৫৩ সাল থেকে একটি মাত্র বিভাগে—Department du Nord’-এ-একজন বৈজ্ঞানিক সরকারি পরিদর্শক নিযুক্ত করা হয়েছে। ফরাসী সমাজের বিকাশের এটাও একটা কম স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্য নয় যে, ১৮৪৮ সালের বিপ্লব অবধি সর্বব্যাপ্ত ফরাসী আইন কানুনের ভিড়ের মধ্যে লুই ফিলিপ্পির এই আইনটি ছিল নিঃসঙ্গ।
