কিন্তু মূলধনের এই আপাতদৃশ্য চুড়ান্ত জয়ের পবেই এলো একটি প্রতিক্রিয়া। এতকাল পর্যন্ত শ্রমিকরা অনমনীয় এবং অবিরাম প্রতিরোধ করলেও তারা সক্রিয় কর্মসূচী নেয়নি। এখন ল্যাংকাশায়ার ও ইয়র্কশায়ারে বিক্ষুব্ধ জনসভা থেকে তারা প্রতিবাদ জানাল। এইভাবে অবস্থা এমনি হল যেন দশ ঘণ্টার আইনটি একটি ভানমাত্র, এটি পালমেন্ট কর্তৃক একটি প্রতারণামাত্র, এর অস্তিত্ব কোনদিনই ছিল না। কারখানা পরিদর্শকেরা সরকারকে জরুরী হুশিয়ারি দিলেন যে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে শিরোধ এক অবিশ্বাস্য তীব্র স্তরে পৌঁছেছে। মালিকদের মধ্যেও কেউ কেউ গুঞ্জন শুরু করলেন : “বিচারকদের স্ববিরোধী সিদ্ধান্তের ফলে সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক এবং উচ্ছ,ঙ্খল একটি অবস্থা দেখা যাচ্ছে। ইয়র্কশায়ারে একটি আইন খাটে, ল্যাংকাশায়ারে আর একটি; ল্যাংকাশায়ারের একটি গ্রামে এক আইন, ঠিক পার্শ্ববর্তী গ্রামে আর একটি। বড় বড় শহরে কারখানা-মালিক আইন এড়িয়ে চলতে পারেন, মফস্বল জেলাগুলির মালিকেরা পালাপ্রথার জন্য প্রয়োজনীয় লোক সংগ্রহ করতে পারেন না এক কারখানা থেকে অপর কারখানায় শ্রমিকদের বদলি করা তো দূরের কথা,” ইত্যাদি। কিন্তু মূলধনের সর্বপ্রথম জন্মগত দাবি হচ্ছে যে সকল মূলধনই সমভাবে এম-শক্তি শোষণ করবে।
এরূপ অবস্থার মধ্যে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে একটা মিটমাট হল, যাকে ১৮৫০ সালের ৫ই আগষ্ট অতিরিক্ত কারখানা-আইনে পালমেন্টের ছাপ দেওয়া হল। “নাবালক এবং নারী শ্রমিকদের শ্রম-দিবসকে সপ্তাহে প্রথম পাঁচ দিনে দশ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে সাত ঘণ্টা করা হল। সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কাজ চলবে[৩৬] মাঝখানে ভোজনের জন্য কমপক্ষে দেড় ঘণ্টার বিরতি থাকবে, ভোজনের সময়গুলি সকলের ক্ষেত্রেই একই সময়ে নির্দিষ্ট হবে এবং ১৮৪৪ সালের আইনের নির্দেশ অনুযায়ী হবে। এতে চিরকালের মত পালাপ্রথা রহিত হল।[৩৭] শিশুদের পরিশ্রমের ক্ষেত্রে ১৮৪৭ সালের আইন বলবৎ থাকল।
পূর্বের ন্যায় এবারও একধরনের মালিকরা। শ্রমিক শ্রেণীর শিশু সন্তানদের ওপর বিশেষ মালিকানাস্বত্বের অধিকার পেলেন। এরা হচ্ছেন রেশম কারখানার মালিক। এরাই ১৮৩৩ সালে ভয় দেখিয়ে চীৎকার করেছিলেন, “যদি শ্রমজীবী শিশুদের দশ ঘণ্টা কাজের অধিকার কেড়ে নেওয়া নয়, তাহলে তাদের কারখানাগুলি বন্ধ হয়ে যাবে।”[৩৮] তাদের পক্ষে তেরো বছরের অধিক বয়সের যথেষ্ট সংখ্যক শিশু নিয়োগ করা অসম্ভব হয়ে উঠত। তাঁরা যে সুবিধা চেয়েছিলেন সেইটেই আদায় করলেন। পরবর্তী অনুসন্ধানে দেখা গেল যে তাদের অজুহাতটি ছিল একটি সুচিন্তিত মিথ্যা।[৩৯] কিন্তু যে শিশুদের টুলের ওপর দাঁড় করিয়ে কাজ করাতে হত, দশ বছর ধরে দিনে দশ ঘণ্টা তাদের রক্ত জল করে রেশম তৈরি করতে এদের বাধেনি।[৪০] ১৮৪৪ সালের আইন নিশ্চয়ই এগারো বছরের কম বয়সের শিশুদের দিনে সাড়ে ছঘণ্টার বেশি খাটাবার পক্ষে তাদের অধিকার হরণ করেছিল। আইনে তারা এগারো থেকে তেরো বছর বয়সের শ্রমজীবী শিশুদের দিনে দশ ঘন্টা খাটাবার সুযোগ পেলেন এবং কারখানায় নিয়োজিত অপর সব শিশুদের পক্ষে বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা বর। এদের ক্ষেত্রে রহিত হল। এইবার অজুহাত হল এই যে “তারা যে কাজে নিযুক্ত ছিল সেখানে বস্ত্রের সূক্ষ্ম প্রকৃতি অনুযায়ী খুব লঘু স্পর্শের দরকার হত, কেবলমাত্র অল্প বয়সের শিশুদের কারখানায় নিয়োগের ফলেই এই স্পর্শ আয়ত্ত করা যেত।”[৪১] শিশুদের আঙুলের কোমল স্পর্শের জন্য সরাসরিভাবে তাদের হত্যা করা হত যেমন দক্ষিণ রাশিয়ার শিংওয়ালা গোরুকে চামড়া ও চবির জন্যে হত্যা করা হত। অবশেষে ১০৫০ সালে, ১৮৪৪ সালে প্রদত্ত সুবিধাটি শুধুমাত্র রেশমের সুতো তৈরি ও সুতো জড়ানোর ডিপার্টমেন্টে সীমাবদ্ধ করা হল। কিন্তু এখানেও ধনিকদের “স্বাধীনতা” হণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এগারে থেকে তেরো বছর বয়সের শিশুদের শ্রম-সময় দশ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে দশ ঘণ্টা করা হল। অজুহাত : “বস্ত্রশিল্পের অন্যান্য কারখানার চেয়ে রেশমের কারখানায় শ্রম অপেক্ষাকৃত হাল্কা এবং অন্যান্য বিষয়েও স্বাস্থ্যের পক্ষে কম ক্ষতিকর।”[৪২] সরকারি স্বাস্থ্য অনুসন্ধানের বিপোর্টে কিন্তু অপরপক্ষে এই তথ্য পরবর্তীকালে বিপরীত ব্যাপারটি প্রমাণিত করল, “মৃত্যুর গড় হার রেশম শিল্পের এলাকাগুলিতে অত্যধিক উচ্চ এবং মোট জনসংখ্যার স্ত্রীলোকদের মধ্যে এইটি ল্যাংকাশায়ারে তুলো-শিল্পের অঞ্চলগুলির চেয়ে উচ্চতর।[৪৩] কারখানা-পরিদর্শকদের ছয় মাস অন্তর বহু প্রতিবাদ সত্ত্বেও এই অনিষ্টকর প্রথা আজও পর্যন্ত রয়ে গিয়েছে।[৪৪]
১৮৫০ সালের আইনটি শুধুমাত্র নাবালিকা শ্রমিকদের জন্য সকাল ছটা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত পনের ঘণ্টা কার্যকাল কমিয়ে সকাল ছটা থেকে সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত বারো ঘণ্টায় পরিণত করে। অতএব এইটি সেইসব শিশুদের নিয়োগ বন্ধ করেনি যাদের এই সময়ের আধ ঘণ্টা আগে এবং আড়াই ঘণ্টা পরে পর্যন্ত খাটানো যেত, অবশ্য যদি সমগ্র শ্রম-সময় সাড়ে ছয় ঘণ্টার বেশি না হয়। আইনের খসড়াটি আলোচনার সময় কারখানা-পরিদর্শকেরা পালমেন্টের সামনে এই গরমিলের জন্য অনিষ্টকর প্রয়োগের তথ্যগুলি উপস্থিত করেন। তাতে কোন ফল হয় না। কারণ ব্যবস্থাটির পিছনে নিহিত উদ্দেশ্য ছিল এই যে সম্পদের বছরগুলিতে শিশুদের নিয়োগের সুযোগ নিয়ে বয়স্ক পুরুষদের শ্রম-দিবসকে পনেরো ঘণ্টায় টেনে তোলা। পরবর্তী তিন বছরের অভিজ্ঞতায় প্রমাণ হল যে বয়স্ক পুরুষ শ্রমিকদের প্রতিরোধে এই চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। তাই ১৮৫০ সালের আইনটি ১৮৫৩ সালে চূড়ান্ত রূপ নেবার সময় “নাবালক ও নারী শ্রমিকদের সকালবেলা কাজের আগে এবং সন্ধ্যাবেলা কাজের শেষে শিশুদের নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হল। এখন থেকে অল্প কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া ১৮৫০ সালের কারখানা আইনটি তার অধীনস্থ শিল্পের শাখাগুলিতে সমস্ত শ্রমিকদের শ্রম-দিবস নিয়ন্ত্রণ করতে থাকল।[৪৫] প্রথম কারখানা আইন প্রবর্তনের পর অর্ধশতাব্দী তখন অতীত হয়েছে।[৪৬]
