স্বভাবতই এই সমস্ত চাল টিকল না। কারখানা-পরিদর্শকেরা আদালতে আবেদন করলেন। কিন্তু শীঘ্রই কারখানা-মালিকদের দরখাস্তগুলি এত ধূলো উড়ালো যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার জর্জ গ্রে বাধ্য হয়ে ১৮৪৮ সালের ৫ই আগষ্ট একটি সাকুলারে সুপারিশ করলেন যে পরিদর্শকরা আইনের শুধুমাত্র আক্ষরিক লঘনের ক্ষেত্রে অথবা যেক্ষেত্রে মনে করার কোন কারণ নেই যে নাবালকদের প্রকৃতপক্ষে আইন-নিদিষ্ট সীমার চেয়ে বাস্তবিকই বেশিক্ষণ খাটান হয়েছে, সেক্ষেত্রে পালা প্রথা অনুযায়ী নাবালকদের নিয়োগের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করতে পারবেন না। অতঃপর কারখানা পরিদর্শক জে. স্টুয়ার্ট গোটা স্কটল্যাণ্ডে ঠিক আগেকার দিনের মতই কারখানাগুলিতে পনের ঘণ্টা কার্যকালে তথাকথিত পালা-প্রথার পুনঃ প্রবর্তনে অনুমতি দিলেন। অপরপক্ষে ই ল্যাণ্ডের কারখানা-পরিদর্শকরা ঘোষনা করলেন যে আইনটিকে রদ করার ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোন স্বেচ্ছাচারী হুকুম দেবার অধিকার নেই এবং তারা গোলামি পুনঃ প্রতিষ্ঠার সপক্ষে এই বিদ্রোহের বিরুদ্ধে আইন সঙ্গত অভিযোগ চালিয়ে যেতে থাকলেন।
কিন্তু ধনীদের সমন জারি করিয়ে আদালতে হাজির করলে কি ফল হতে পারে যেখানে বিভিন্ন অঞ্চলের ম্যাজিষ্ট্রেটরা-কবে এর ভাষায় ‘অবৈতনিক মহৎ ব্যক্তিরা – তাদের বেকসুর ছেড়ে দিতেন? এইসব আদালতে মালিকরা নিজেরাই ছিল নিজেদের বিচারকর্তা। একটি দৃষ্টান্ত দেখুন। কাশ, লিজ অ্যান্ড কোম্পানি, এই নামের সুতো তৈরি কারবারের জনৈক এক্রিগি তার জেলার কারখানা-পরিদর্শকের কাছে নিজের কারখানার জন্য একটি পালা প্রথার প্রস্তাব উপস্থিত করে। সম্মতি না পেয়ে লোকটি প্রথমে চুপচাপ থাকে। কয়েকমাস পরে রবিস নামে আর এক ব্যক্তি, সেও সুতোকল মালিক এবং এক্রিগির অনুচর না হলেও তার সঙ্গে সম্ভবত সম্পর্কযুক্ত, তিনি স্টকৃপোর্টের আঞ্চলিক ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে এক্রিগির আবিষ্কৃত পালা-প্রথাকে হুবহু প্রবর্তনের দায়ে অভিযুক্ত হল। চারজন বিচারে বসলেন, তাদের মধ্যে তিনজন হচ্ছেন সুতোকল মালিক, যাদের মধ্যে অনিবার্য ভাবেই সর্বপ্রধান ছিলেন ঐ এক্রিগি। রবিকে মুক্তি দিলেন এবং এখন এই অভিমত দাড়িয়ে গেল
যে রবিনের পক্ষে যেটি ন্যায্য এক্ৰিগের পক্ষেও সেটি নায্য। আইনের ক্ষেত্রে নিজেরই সিদ্ধান্তের সমর্থনের জোরে তিনি আর দেরি না করে নিজের কারখানায় ঐ প্রথা প্রবর্তন করলেন।[২৫] অবশ্য আইনের খেলাফ করে এই আদালতের বিচারকদের নেওয়া হয়েছিল।[২৬] পরিদর্শক হাওয়েল মন্তব্য করলেন যে, এইসব বিচার-বিভ্রাটের জন্য “এক্ষণি প্রতিকার-ব্যবস্থা চাই-হয় আইনটিকে এমনভাবে পরিবর্তিত করা হোক যাতে সেটিতে এইসব সিদ্ধান্তের অনুণােদন থাকে অথবা আদালতগুলি যাতে ভুলপথে না চলে সেরূপ প্রশাসনিক ব্যবস্থা করা হোক, যাতে সিদ্ধান্তগুলি আইনানুগ হয় … . যখন এই ধরনের অভিযোগ আনা হল। আমি চাই যে বেতনভোগী ম্যাজিষ্ট্রেটরা বিচার করুন।”[২৭]
সরকারি আইনজ্ঞরা ১৮৪০ সালের আইন সম্পর্কে মালিকদের ব্যাখ্যাকে অজগুবি বলে ঘোষণা করলেন ! কিন্তু সমাজের রক্ষাকর্তারা নিজেদের সংকল্প থেকে সরে যাবার পাত্র নন। লিওনার্ড হর্ণার রিপোর্ট করছেন, “আইনটি কার্যকরী করতে গিয়ে সাতটি আঞ্চলিক আদালতের সামনে দশটি অভিযোগের মধ্যে একটি ক্ষেত্রে মাত্র আদালতে সমর্থন পেয়ে …….. আমি স্থির করলাম যে আইন লঙ্ঘন করার জন্য আরো মামলা করা নিরর্থক। ১৮৮ সালের আইনের সেই অংশটুকু যাতে কাজের ঘণ্টা একইরকম করার ব্যবস্থা ছল ……….সেটি এখন আর আমার জেলায় (ল্যাংকাশায়ার) কার্যকরী নেই। আমি অথবা সাব-ইন্সপেক্টর যখন এমন একটি কারখানা পরিদর্শন করি যেখানে পালা প্রথা আছে, সেখানে দেখি তরুণ বয়স্করা ও নারী-শ্রমিকেরা দশ ঘণ্টার বেশি কাজ করছে কি না সেটি জানবার কোন উপায় নেই ………পালা-প্রথা আছে এখন কল-মালিকদের সম্পর্কে ৩০শে এপ্রিলের এক হিসেবে সংখ্যা ছিল ১১৪ এবং কিছুকাল হল এই সংখ্যা খুব তাড়াতাড়ি বাড়ছে। সাধারণতঃ কারখানার কার্যকাল বাড়িয়ে সকাল ছটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত সাড়ে তেরো ঘণ্টা করা হয়েছে: ….. . কোন কোন ক্ষেত্রে এটি দাড়ায় পনের ঘণ্টা, ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত।[২৮] ইতিপূর্কে ১৮:৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ৬৫ জন কারখানা মালিক ও ২৯ জন সুপারভাইজার এর একটি তালিশ ছিল যারা সমস্বরে ঘোষণা করেছিলেন যে, পালা প্রথা থাকলে কোন পরিদর্শন-ব্যবস্থাই প্রভৃত পরিমাণ অতিরিক্ত খাটুনি রদ করতে পারে না।[২৯] যা হয় তা যে একই শিশু ও নাবালকদের সুতোকাটার ঘর থেকে তঁত ঘরে বদল করা হয়, কখনও কখনও পনের ঘণ্টার মধ্যে এক কারখানা থেকে আর একটিতে পাঠান হয়।[৩০] কেমন করে এই ধরনের একটি বাবসাকে নিয়ন্ত্রনে আনা সম্ভব, যাতে পাল। প্রথার আড়ালে নানা ভাবে হাতের তাস ভঁজানোর মত কোন না কোন এক ধরনের পরিকল্পনা করে, সারা দিনের মধ্যে শ্রমের ও বিরতির সময় এমন করে পাল্টানো হত, যে একই সময়ে একই ঘরে কোন একটি সম্পূর্ণ দল শ্রমিককে আপনি পেতে পারবেন না।”[৩১]
কিন্তু কার্যতঃ উল্লিখিত খাটুনির প্রশ্নটি ছেড়ে দিয়েও এই তথাকথিত পাল। প্রথাটি ধনিকদের উদ্ভট কল্পনার ফল, যাকে ফুরিযে পর্যন্ত তার ব্যঙ্গাত্মক নক্সাগুলিতে কখনো অতিক্রম করতে পারেন নি,ব্যতিক্রম শুধু এইটুকুই যে তার শ্রমের আকর্ষণ’ বদলে এখানে হয়েছে মূলধনের আকর্ষণ। যেমন মালিকদের সেইসব পরিকল্পনা সেগুলিকে “অভিজাত সংবাদপত্রগুলি “যথেষ্ট যত্ন ও শৃঙ্খলা থাকলে কতদূর এগোনো যায় তার পরাকাষ্ঠা বলে প্রশংসা করেছেন, সেগুলির দিকে একটু তাকান। শ্রমজীবী লোকগুলিকে কখনো কখনো বারো থেকে চোদ্দ ভাগে ভাগ করা হত। এই ভাগের অন্তর্ভুক্তদের কেবলই একটি থেকে আর একটিতে বদলানো হত। কারখানার শ্রম-দিবসের পনের ঘণ্টার মধ্যে ধনিক শ্রমিককে কখনো তিরিশ মিনিট, কখনো বা একঘণ্টা খাটাত এবং তারপর তাকে আবার বাইরে ঠেলে দিত, আবার তাকে কারখানায় টেনে এনে কাজ করিয়ে নূতন করে বাইরে ঠেলে দিত, খণ্ড থও সময় তাকে এইভাবে তাড়িয়ে বেড়ালেও পুরো দশ ঘণ্টা কাজ না করিয়ে তাকে কখনো ছাড়ত না। রঙ্গমঞ্চের মতই একই লোকগুলিকে বিভিন্ন অঙ্কের বিভিন্ন দৃশ্যে পালা করে আত্মপ্রকাশ করতে হত। কিন্তু অভিনেতা যেমন অভিনয়ের সমগ্র সময়টা থিয়েটারের দখলে থাকে, তেমনি শ্রমিকেরা পনের ঘণ্টাই কারখানার দখলে থাকত, তাদের যাওয়া আসার সময়ের হিসাব ছাড়াই। এইভাবে বিশ্রামের ঘণ্টাগুলিকে পরিবর্তিত করে বাধ্যতামূলক কর্মহীনতার ঘণ্টায় পরিণত করা হত, যা নাবালকদের টেনে নিয়ে যেত মদের দোকানে এবং বালিকাদের ঠেলে দিত পতিতালয়ে। দিনের পর দিন ধনিক শ্রমিকসংখ্যা না বাড়িয়ে বারো অথবা পনের ঘণ্টা পর্যন্ত তার যন্ত্রপাতি চালু রাখবার যেসব কৌশল নিত্য-নুতন আবিষ্কার করত, তাতে শ্রমিককে এইসব টুকরো টুকরো সময়ের মধ্যে কোন মতে তার খাবার গিলে নিতে হত। দশ ঘণ্টা আন্দোলনের সময় মালিকরা বলতেন যে উচ্ছঙ্খল শ্রমজীবীরা দশ ঘণ্টা থেকে বারো ঘণ্টা মজুরি পাবার আশা নিয়ে দরখাস্ত করেছে। এখন তারা চাকা ঘুরিয়ে দিলেন। তারা শ্রমশক্তির উপর বারো ঘণ্টা অথবা পনের ঘণ্টা মালিকানা করে দশ ঘণ্টার মজুরি দিতে থাকলেন।[৩২] এই হচ্ছে দশ ঘণ্টা আইন সম্পর্কে মালিকদের ব্যাখ্যার সারমর্ম। এরাই হচ্ছেন সেই একই মিষ্টভাষী স্বাধীন ব্যবসায়ী যারা মানবতার প্রেমে গলদঘর্ম হয়ে শস্য আইন বিরোধী আন্দোলনের যুগে পুরো দশ বছর কাল পাউণ্ড শিলিং ও পেন্সের হিসাব দেখিয়ে শ্রমিকদের কাছে প্রচার করেছিলেন যে স্বাধীন ভাবে শস্য আমদানি হলে ব্রিটিশ শিল্পে যতটুকু শক্তি আছে, তার জোরেই দশ ঘণ্টার শ্ৰম ধনিকদের সম্পদ-সৃষ্টির পক্ষে যথেষ্ট।[৩৩] অবশেষে দুবছর পরে ধনিকদের এই বিদ্রোহে একটি সাফল্য লাভ হল, সেটি হচ্ছে ইংল্যাণ্ডে চারটি উচ্চতম বিচারালয়ের মধ্যে অন্যতম কোর্ট অফ এক্সচেকার’-এর একটি সিদ্ধান্ত। ১৮৫০ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি একটি মামলার রায় দিতে গিয়ে এর সিদ্ধান্ত করেন যে কারখানা-মালিকরা নিশ্চয়ই ১৮৪৪ সালের আইনের মর্মের বিরুদ্ধে চলেছে কিন্তু এই আইনটিতেই এমন কতকগুলি কথা আছে যাতে সেটা অর্থহীন হয়ে পড়েছে। এই সিদ্ধান্তের দ্বারা দশ ঘন্টা আইন বাতিল হয়ে গেল।”[৩৪] মালিকের দল যারা এতদিন তরুণ-বয়স্ক ও নারী শ্রমিকদের জন্য পালা-প্রথা প্রয়োগ করতে ভয় পেত, তারা এখন এই নিয়ে উঠে পডে লাগল।[৩৫]
