দ্বিতীয় ধাপে তারা ভোজনের জন্য আইনসঙ্গত বিরতি নিতে লাগল। এ বিষয়ে কারখানা-মালিকদের বক্তব্য কি? “শ্রমের সময় দশ ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ হবার পর। কারখানা-মালিকরা কার্যত তখনো ততদূর পর্যন্ত না গিয়েও মনে করেন যে, শ্রমের সময়কে সকাল নয়টা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত ধরে সকাল নয়টার আগে এক ঘণ্টা এবং সন্ধ্যা সাতটার পরে আধঘণ্টা ভোজনের ছুটি দিলেই আইনের বিধান মানা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা এখন মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য একঘণ্টা অথবা আধঘণ্টা ছুটি দেন এবং জোরের সঙ্গে বলেন যে কারখানায় কাজের সময়ের মধ্যে ঐ দেড়ঘন্টা ছুটি দেবার কোন বাধ্যবাধকতা তাদের নেই।”[১৭] তাই কারখানা মালিকরা বলতেন যে, ১৮৪৪ সালের আইনের ভোজন সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট বিধানে শ্রমিকদের কেবল কাজে আসবার আগে এবং ছুটির পরে অর্থাৎ বাড়িতে গিয়ে ভোজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কেনইবা শ্রমিকরা সকাল নটার আগে মধ্যাহ্নভোজন সেরে নেবে না? সরকার পক্ষের উকিলরা কিন্তু স্থির করলেন যে নির্ধারিত ভোজনের সময়টি কাজের সময়ের মধ্যে বিরতি দিতেই হবে এবং সকাল নটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত বিনা বিরতিতে কাজ করানো আইনসঙ্গত নয়।”[১৮]
এইসব আলোচনার পর ধনিক এমন একটি কাজ দিয়ে বিদ্রোহের সূচনা করল, যেটি আক্ষরিকভাবে ১৮৭৪ সালের আইনের সঙ্গে খাপ খায় এবং সেদিকে দিয়ে আইন-নঙ্গত।
১৮৪৪ সালের আইনে আট থেকে তেরো বছর পর্যন্ত বয়সের শিশুদের যদি দুপুরের আগে নিয়োগ করা হয়ে থাকে, তাহলে বেলা একটার পরে তাদের খাটানো নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু যেসব শিশুদের শ্রম-সময় বেলা বারোটা অথবা তার পরে শুরু হয় তাদের সাড়ে ছ’ঘণ্টার এম কোনক্রমেই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পড়ে না। আট বছরের শিশুদের দুপুর থেকে কাজ শুরু হলে বারোটা থেকে একটা পর্যন্ত একঘণ্টা বেলা দু’টো থেকে চারটা পর্যন্ত দুঘণ্টা, বিকেল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে আটটা পর্যন্ত সাড়ে তিন ঘণ্টা, সর্বসাকুল্যে সাড়ে ছ’ঘণ্টা খাটানো চলত। অথবা এর চেয়েও ভাল ব্যবস্থা হতে পারত। রাত্রি সাড়ে আটটা পর্যন্ত পুর্ণবয়স্ক পুরুষ শ্রমিকদের সঙ্গে একযোগে কাজ করবার জন্য কারখান-মালিকরা শুধু বেলা দু টো পর্যন্ত তাদের কাজ না দিলেই হত, তারা অতঃপর রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত এদের একনাগাড়ে কারখানায় রাখতে পারতেন। এবং এখন এই জিনিসটি স্পষ্টতঃ স্বীকার করা হয় যে, ইংল্যাণ্ডে দিনে দশ ঘণ্টার বেশি সময় যন্ত্রপাতিগুলি সচল রাখবার জন্য কারখানা-মালিকদের ইচ্ছা অনুসারেই তাদের খুশি-মাফিক নাবালক শ্রমিক ও নারী শ্রমিকদের ছুটির পরেও রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত পূর্ণবয়স্ক পুরুষদের পাশে শিশুদের কর্মরত রাখার প্রথা প্রচলিত আছে।[১৯] শ্রমিকগণ এবং কারখানা পরিদর্শকেরা স্বাস্থ্য ও নীতির কারণ দেখিয়ে প্রতিবাদ জানালেন কিন্তু ধনিকেরা জবাব দিলেন :
কাজ তো আমার প্রকাশ্য, আইন মত সৎ,
না হয় আনো দণ্ডনামা খারিজ করে খৎ!
বস্তুতঃ ১৮৫০ সালের ২৬শে জুলাই কমন্স সভায় উপস্থাপিত তথ্যাবলী থেকে জানা যায় যে, সমস্ত প্রতিবাদ সত্ত্বেও ১৮৫০ সালের ১৫ই জুলাই তারিখে ৩,৭৪২টি শিশুকে ২৫৭টি কারখানায় এই প্রথায় খাটানো হয়েছিল।[২০] এইটাই যথেষ্ট নয়। ধনিকদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ধরা পড়ল যে ১৮৪৪ সালের আইনে মধ্যাহ্নের আগের পাঁচ ঘণ্টার কাজের মধ্যে অন্তত তিরিশ মিনিট বিরতি দিতেই হবে, কিন্তু মধ্যাহ্নের পরে কাজের জন্য বিরতির কোন বিধান নেই। অতএব, তারা এটাই কাজে লাগালো এবং আট বছর বয়সের শিশুদের বেলা দু’টো থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত বিনা বিরতিতে শুধু যে খাটাবারই সুযোগ পেল তাই নয়, পরন্তু এই সময়টুকু তাদের অনাহারেও রাখল।
“হ্যা, তার বুকের কাছ থেকেই,
এই কথাই শর্তে লেখা আছে।”[২১]
শাইলকের পদ্ধতিতে শিশুদের শ্রম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে ১৮৪৪ সালের আইনের আক্ষরিক অনুসরণ থেকে শেষ পর্যন্ত “নাবালক এবং নারী শ্রমিকদের শ্রম নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে ঐ একই আইনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ এসে গেল। স্মরণ রাখা উচিত যে “প্রতারণাপূর্ণ পালা-প্রথার অবসানই ছিল ঐ আইনটির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। মালিকরা শুধুমাত্র এই সরল ঘোষণা দিয়ে বিদ্রোহ শুরু করলেন যে ১৮৪৪ সালের আইনের যে ধারাগুলি মালিকদের পছন্দমত পনের ঘণ্টা এম-দিবসের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভগ্নাংশে নাবালক ও নারী শ্রমিকদের কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ করেছিল, সেগুলি শ্রম-দিবসকে বারো ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ রাখা পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত নির্দোষ বলা চলত। কিন্তু দশঘণ্টা আইনে ব্যাপারটি হয়ে উঠল “ভয়ানক কষ্টকর”।[২২] তারা পরিদর্শকদের খুব ধীরস্থির ভাবে জানালো যে তার আইনের আক্ষরিক অর্থ না মেনে নিজেদের দায়িত্বে পুরানো প্ৰথার পুনঃ প্রবর্তন করবে।[২৩] কুপরামর্শে বিভ্রান্ত শ্রমিকের স্বার্থেই তারা এই কাজ করলেন “যাতে তাদের উচ্চতর মজুরি দেওয়া যায়” “এটাই ছিল এক সম্ভাব্য পথ যার সাহায্যে দশঘণ্টা আইনের আমলেও শিল্পে গ্রেট ব্রিটেনের আধিপত্য রক্ষা করা। যায়।” “সম্ভবতঃ পালা করে শ্রম করার প্রথার নিয়ম ভাঙ্গলে ধরা একটু শক্ত, কিন্তু তাতে কি হয়েছে? এই দেশের বৃহৎ শিল্প-সার্থকে কি কারখানা ইন্সপেক্টর ও সাব-ইন্সপেক্টবদের কিছুটা কষ্ট লাঘব করবার জন্য একটা গৌণ ব্যাপারে পরিণত কর। চলে?”[২৪]
