কারখানা-মালিক সাধারণভাবে দশ-শতাংশ মজুরি কমিয়ে ঘটনাবলীর স্বাভাবিক ফলটিকে আরও বাড়িয়ে তুলল। বলা চলে যে স্বাধীন ব্যবসার নবযুগের উদ্বোধন উৎসব এইভাবে উৎযাপিত হল। শ্রম-দিবসকে কমিয়ে এগারো ঘণ্টা করার সঙ্গে সঙ্গেই আরও ৮ শতাংশ মজুরি কমানো হল, এবং দশ ঘণ্টা প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই দ্বিগুণ পরিমাণ মজুরি কমানো হল। অতএব যেখানেই পারা গিয়েছিল মজুরি অন্ততঃ পচিশ শতাংশ কমানো হয়েছিল।[১২] এইভাবে তৈরি করা অনুকূল ব্যবস্থায় কারখানা শ্রমিকদের মধ্যে ১৮৪৭ সালের আইন বাতিল করবার আন্দোলন শুরু হল। এই আন্দোলনের মিথ্যা প্রচার, ঘুষ দেওয়া, অথবা ভীতিপ্রদর্শন কিছুই বাদ দেওয়া হয়নি, কিন্তু সমস্ত অপচেষ্টাই ব্যর্থ হল শ্রমিকদের কাছ থেকে যে আধ ডজন গণ-দরখাস্তে তারা “আইনটির জুলুমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ছিল, পরীক্ষার সময় দরখাস্তকারীর। নিজেরাই ঘোষণা করল যে তাদের স্বাক্ষরগুলি জোর করে নেওয়া হয়েছে। তারা অনুভব করছে যে তারা অত্যাচারিত কিন্তু সেটি ঠিক কারখানা আইনের জন্য নয়।[১৩] কিন্তু যদিও কারখানা মালিকরা যেমনটি চেয়েছিল ঠিক সেইভাবেই শ্রমিকদের দিয়ে কথা বলতে পারেনি, তবু তার শ্রমিকদের নাম নিয়ে সংবাদপত্রে ও পালামেন্টে নিজেরাই আরও বেশি জোরে চীৎকার করতে থাকল। তারা কারখানা-পরিদর্শকদের বিরুদ্ধে এই বলে নিন্দাবাদ শুরু করল যে তারা নাকি ফরাসী জাতীয় কনভেশনের বিপ্লবী কমিশনারদের মত লোকহিতৈষিতার নামে দুঃখী কারখানা-শ্রমিকদের নির্মম ভাবে বলি দিচ্ছে কিন্তু এই চালও খাটল না। কারখানা-পরিদর্শক লিওনার্দ হনার নিজেও তার সাব-ইন্সপেক্টরদের মারফৎ ল্যাঙ্কাশায়ারের কারখানাগুলিতে সাক্ষীদের বহু পরীক্ষা করেন। পরীক্ষিত শ্রমিকদের শতকরা সত্তর জন দশ ঘণ্ট। আইন চান, অনেক কম শতাংশ এগারো ঘণ্টা আইন চান এবং এক নেহাৎ নগণ্য সংখ্যালঘু অংশ আগেকার বারো ঘণ্টা রাখতে চান।[১৪]
আর একটি “বন্ধুত্বপূর্ণ টোপ হল পূর্ণবয়স্ক পুরুষদের দিয়ে বারো থেকে পনের ঘণ্টা কাজ করানো এবং তারপরে এই ব্যাপারটিকে শ্রমিকদের আন্তরিক ইচ্ছার প্রমাণ বলে দেশে-বিদেশে প্রচার চালানো। কিন্তু “নির্মম” কারখানা-পরিদর্শক লিওনার্দ হনরি আবার এগিয়ে এলেন। “যারা বেশি কাজ করত তাদের অধিকাংশ ঘোষণা করল “তারা কম মজুরি নিয়ে দশ ঘণ্টা কাজ বেশি পছন্দ করে, কিন্তু তারা নিরুপায়; এত বেশি লোক কর্মহীন ছিল (এত বেশি সংখ্যক কাটুনি ‘পিসার হিসেবে কাজ করে। এবং অন্য কাজ না পেয়ে এত কম মজুরি পাচ্ছিল) যে, যদি তারা বেশি সময় কাজ করতে অস্বীকার করত, তাহলে তাদের স্থানে অন্যদের নিয়োগ করা হত, যার ফলে তাদের সামনে প্রশ্ন ছিল, হয় বেশি ঘণ্টা কাজ করতে রাজি হও, নতুবা একেবারে বেকার হয়ে থাক।”[১৫]
এইভাবে ধনিকদের প্রাথমিক অভিযান ব্যর্থ হল এবং ১৮৪৮ সালের পয়লা মে দশ ঘন্টা আইন বলবৎ হল। কিন্তু ইতিমধ্যে চাচিস্ট পাটির বিপর্যয় এবং তার নেতাদের কারাদণ্ডের ফলে ইংল্যাণ্ডের শ্রমিকশ্রেণীর আত্মশক্তিতে বিশ্বাস খুবই আঘাত পেল। এর অব্যবহিত পরে জুন মাসে প্যারিসের সশস্ত্র অভ্যুত্থান ও তার বক্তাক্ত দমনকার্য ইংল্যাণ্ডে ও মহাদেশের মূল ভূখণ্ডে শাসকশ্রেণীর সকল ভগ্নাংশকে একত্রিত করল, ভূস্বামী ও ধনিক, ফাটকা বাজারের নেকড়ে ও দোকানদার, সংরক্ষণবাদী ও অবাধ ব্যবসায়ী, সরকার পক্ষ ও বিরোধীপক্ষ, ধর্মধ্বজী ও স্বাধীন চিন্তাবাদী, তরুণী স্বৈরিণী ও বৃদ্ধা সন্ন্যাসিনী—সকলেই সম্পত্তি-ধর্ম-পরিবার ও সমাজকে বাঁচাবার একটি সাধারণ ধ্বনি তুলে একত্রিত হল। সর্বত্রই শ্রমিকশ্রেণীর বিরুদ্ধে ঘোষণা জারি করা হল, তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা হল, কার্যতঃ তারা সন্দেহভাজন ব্যক্তি বলে চিহ্নিত হয়ে তৎসংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় পড়ল। এখন আর কারখানা-মালিকদের সংযমের কোন দরকার রইল না। শুধুমাত্র দশ ঘণ্টা আইনের বিরুদ্ধে নয়, পরন্তু ১৮৩৩ সাল থেকে শুরু করে যে সব ব্যবস্থা কিছু-না-কিছু পরিমাণে শ্রমশক্তির “স্বাধীন” শোষণকে ক্ষুন্ন করেছে, তারা সেই সবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করল। দাসত্ব বজায় রাখবার জন্য এটি ছোট আকারে বিদ্রোহ,-দু’বছর ধরে নির্দয় ও বেপরোয়াভাবে সন্ত্রাস চলল এবং এই সন্ত্রাস খুবই সস্তা ছিল কারণ আইনবিদ্রোহী মালিকদের শুধু “হাতের চামড়া ক্ষয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন ক্ষতির ভয় ছিল না।
যে-সব ব্যাপার ঘটল সেগুলিকে বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে যে ১৮৩৩, ১৮৪৪ এবং ১৮৪৭ সালের কারখানা আইনগুলির যে সব অংশে একে অপরকে সংশোধিত করেনি, তাদের তখন সবটাই বলবৎ ছিল। তাদের একটিও আঠারো বছরের বেশি বয়সের পুরুষ শ্রমিকের শ্রম সীমাবদ্ধ করেনি এবং ১৮৩৩ সাল থেকেই সকাল সাড়ে পাচটা থেকে রাত্রি সাড়ে আটটা পর্যন্ত পনের ঘণ্টা ছিল আইনসঙ্গত “দিবস, যে সীমানার মধ্যে যথানির্দিষ্ট অবস্থায় নাবালক-বয়স্ক ও নারী শ্রমিকদের প্রথমে দিনে বারো ঘণ্টা এবং পরে দশ ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হত।
কারখানা-মালিকরা এখানে ওখানে তাদের নিযুক্ত নাবালক ও নারী শ্রমিকদের একটি অংশকে, অনেক ক্ষেত্রে অর্ধেক সংখ্যক-কে, ছাটাই দিয়ে শুরু করত এবং তারপর বয়স্ক পুরুষদের জন্য রাত্রে কাজের লুপ্ত প্রায় প্রথার পুনঃ প্রবর্তন করত। তারা চেঁচিয়ে বলত, দশ ঘন্টা আইন এছাড়া অন্য কোন পথ রাখেনি।[১৬]
