বাস্তব পদার্থ হিসেবে, তথা ব্যবহার মূল্য হিসেবে, পণ্য সম্পর্কে আমরা যে সমস্ত ব্যবস্থা প্রয়োগ করে থাকি, তার একটি উদাহরণ থেকে এ বিষয়টি বোঝা যাবে। একটি চিনির তক্তি একটা ভারী জিনিস, সুতরাং তার ওজন আছে, কিন্তু এই ওজন আমরা দেখতেও পাই না, স্পর্শ করতেও পারি না। আমরা তখন এমন নানারকম লোহার টুকরো নিই, যাদের ওজন আগে থেকেই ঠিক করা আছে। তৎসত্ত্বেও লৌহ হিসেবে লোহার মধ্যে চিনির চেয়ে অতিরিক্ত এমন কিছু নেই যাতে তা ওজন প্রকাশের রূপ ধারণ করতে পারে। লৌহ-খণ্ড এই ভূমিকা অবলম্বন করতে পাৰ্ব্বলো শুধু এইজন্য যে, চিনি নামক আর একটা জিনিস অথবা অন্য যে-কোনো জিনিস, যার ওজন ঠিক করতে হবে, তার সঙ্গে লোহা একটা তুলনার মধ্যে এলো। যদি এই উভয়েই ভারসম্পন্ন না হতো, তাহলে এরা এরকম তুলনার মধ্যে আসতে পারতো না; উভয়কেই যখন আমরা দাড়িপাল্লায় রাখি, আমরা তখন প্ৰকৃত পক্ষে দেখি যে, ওজনের দিক থেকে উভয়েই এক, এবং সেইজন্যই, উপযুক্ত অনুপাতে নিলে, তাদের ওজনও এক। ঠিক যেমন লৌহখণ্ডটি ওজনে বাটখারা হিসেবে চিনির তক্তিটির শুধু ওজনেরই পরিচয় দেয়, সেই প্রকার আমাদের মূল্য রাশিমালার ক্ষেত্রে কোট নামক বাস্তব পদার্থটি ছিটের সম্পর্কে শুধু মূল্যেরই পরিচয় দেয়।
অবশ্য, এখানেই উপমার শেষ। চিনির তক্তিটির ওজনের পরিচয় দিতে গিয়ে লোহার টুকরোটি উভয়ের ভিতর সমভাবে বর্তমান—এমন একটি প্রাকৃতিক সত্তার পরিচয় প্রকাশ করে , কিন্তু ছিটের মূল্যেৰ্ব পরিচয় দিতে গিয়ে কোটি প্ৰকাশ করে উভয়ের একটি অপ্রাকৃতিক সত্তা, নিছক একটি সামাজিক জিনিস, অর্থাৎ তাদের মূল্য।
যেহেতু ছিটের মতো কোন একটি পণ্যের যে মূল্য অপেক্ষিক মূল্যরূপে প্রকাশিত হয়, সে রূপটি হলো কোটের মতো সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বস্তু বা সত্তা, কাজেই ওর পেছনে যে সামাজিক সম্বন্ধ রয়েছে তার ইঙ্গিত। ঐ রাশিমালার মধ্যেই দেখতে পাই। মূল্যের সমর্মরূপের ব্যাপারটি হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই রূপের সংক্ষিপ্ত সারমর্ম হলো এই যে বাস্তব পণ্যটিই- কোটটিই-অবিকল নিজ মূর্তিতে মূল্যের পরিচয় প্ৰদান করছে এবং প্রকৃতি নিজেই তাকে মূল্য-রূপটি দান করছে। অবশ্য, একথা শুধু ততক্ষণই খাটে, যতক্ষণ এমন একটি মূল্য সম্পর্ক থাকছে, যার ভিতর কোট ছিটের মূল্যের সমার্ঘরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।(৬) অবশ্য যেহেতু কোন একটি জিনিসের অন্তর্নিহিত সত্তা, তার সঙ্গে অন্য জিনিসের যে-সম্পর্ক আছে তার ফলে গজায় না, সেই সম্পর্কের মধ্যে কেবলমাত্র তার প্রকাশ ঘটে, সেহেতু মনে হয়। প্রকৃতি যো-হিসেবে তাকে তার ওজনের ধর্ম এবং আমাদের শরীর গরম করবার ক্ষমতা দিয়েছে, সেই হিসেবেই তাকে দিয়েছে মূল্যের সমার্ঘরূপ হবার গুণ, সরাসরি বিনিময়ের যোগ্যতা। এই জন্যেই মূল্যের সমাৰ্ধক্কাপের মধ্যেকার কুহেলিময় চরিত্রটি বুর্জেীয়া অর্থনীতিবিদের নজরে পড়ে না, যতক্ষণ না তা পরিপূর্ণ বিকশিত অবস্থায় অর্থীপে তার সামনে হাজির হয়। তিনি তখন সোনা এবং রূপের কুহেলিময় চরিত্রটি ব্যাখ্যা করে উডিয়ে দিতে চান তার স্থানে কম চাকচিক্যময় পণ্য বসিয়ে এবং কোন না কোন সময়ে যে-সমস্ত সম্ভাব্য পণ্যমূল্যের সমাৰ্থরূপের কাজ করেছে, তার তালিকা আবৃত্তি করে নিত্য নতুন পরিতৃপ্তি সহকারে। এ সন্দেহ তার একটুও হয় না যে আমাদের সমাধান কল্পে সমার্ঘরূপের কুহেলিকা ২০ গজ ছিট= ১ কোট এই সরলতম মূল্য পরিচয়ের মধ্যে প্রকাশিত হয়ে রয়েছে।
যে পণ্যের মূর্ত রূপটি মূল্যের সমার্ঘরূপের কাজ করে, তা অমূর্তায়িত মনুষ্য শ্রমের বস্বরূপ এবং সেই সঙ্গে কোন একটি ব্যবহারযোগ্য বিশিষ্ট শ্রমের ফল। কাজেই এই বিশিষ্ট শ্রমের মাধ্যমেই অমূর্তায়িত মনুষ্য-শ্রম প্ৰকাশিত হয়। এক দিকে, কোটি যদি অমূর্ত্যায়িত মত্যু শ্রমের মূর্তরূপ ছাড়া। আর কিছু না হয়, তাহলে অন্যদিকে যে দবাজীর কাজ প্রকৃতপক্ষে এর মধ্যে মূর্ত হয়ে আছে তা সেই মূর্তিায়িত শ্রম রূপায়ণের আধার ছাড়া আর কিছু নয়। ছিটের মূল্য প্ৰকাশ করতে গিয়ে দরজীর কাজের যে উপযোগিতার পরিচয় পাওয়া যায়, তা পোশাক পরিচ্ছদ তৈরীর নয়, তা এমন একটা জিনিসের তৈরী যাকে আমরা সঙ্গে সঙ্গেই চিনতে পারি মূল্য বলে, অর্থাৎ ঘনীভূত শ্রম বলে, কিন্তু এই শ্রম এবং ছিটের মূল্যের ভিতর রূপায়িত হয়েছে যে শ্রম এই দুইয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য বোঝা যায় না। এই রকমভাবে মূল্যের দৰ্পণ হিসেবে কাজ করতে হলে দরজীর শ্রমের মধ্যে সাধারণ মনুষ্য শ্রম হবার অমৃর্ত্যায়িত পণ্যটি ছাড়া অন্য কিছু প্ৰতিফলিত হলে চলবে না।
যেমন দরজীর কাজে, তেমনি তস্কবায়ের কাজে মানুষের শ্রম-শক্তি ব্যয়িত হয়। কাজেই উভয়ের ভিতরই সাধারণ গুণ হিসেবে রয়েছে মনুষ্য শ্ৰম সেইজন্য কোন কোন ক্ষেত্রে যেমন মূল্য উৎপাদনের মধ্যে, তাকে শুধু এইদিক দিয়েই বিচার করতে হয়। কিন্তু মূল্য প্ৰকাশের ক্ষেত্রে ব্যাপার সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণ স্বরূপ যেমন এ ব্যাপারটি কেমন করে প্রকাশ করা যেতে পারে যে, বয়ন-শ্রম ছিটের মূল্য সৃষ্টি করে থাকে। বয়নের গুণে নয়, সাধারণ মনুষ্য শ্ৰম হবার গুণে। তা করা যায়, কেবলমাত্র বয়নের পাণ্টাদিকে শ্ৰমেয় এমন অ্যর একটা বিশিষ্টরূপ (এ ক্ষেত্রে দরজীর শ্রম) খাড়া করে যা বয়ন থেকে উৎপন্ন দ্রব্যের মূল্যের সমার্ঘরূপ হতে পারে। ঠিক যেমন কোটের অবয়বটা সরাসরি মূল্যের পরিচয় ধারণ করে, সেইরকম শ্রমের একটা বিশিষ্টরূপ, দরজীর শ্রম, সাধারণভাবে মনুষ্য শ্রমের প্রত্যক্ষ এবং সুস্পষ্ট মূর্তরূপ নিয়েছে।
