এইভাবে ১৮ ৪৪ সালের সাত-ই জুনের অতিরিক্ত কারখানা আইনটির জন্ম হয়। ১৮৪৪ সালের দশ-ই সেপ্টেম্বর-এ এর প্রয়োগ শুরু হয়। এই আইনে আর একটি নূতন শ্রেণীর শ্রমিকদের অর্থাৎ আঠারো বছরের বেশি বয়সের নারী-শ্রমিকদের রক্ষণ ব্যবস্থা থাকে। প্রতিটি ব্যাপারে তাদের তরুণ বাস্কদের সমতুল্য বলে মনে করা হয়, তাদের শ্রম-সময় বারো ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ করা হয়, ইত্যাদি এই সর্বপ্রথম আইন করে প্রত্যক্ষ ও সরকারীভাবে পূর্ণবয়স্কের শ্রম-নিয়ন্ত্রণ করতে হল। ১৮৪৪-৪৫-এর কারখানা রিপোর্টে বিদ্রুপের সঙ্গে বলা হয়েছে : “প্রাপ্ত বয়স্ক কোন নারী তার অধিকার পভিঘত হয়েছে বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এমন কোন ঘটনা বা দৃষ্টান্ত আমার গোচরীভূত হয়নি।”[৮] তেরো বছরের কম বয়সের শিশুদের শ্রম-সময় কমিয়ে দৈনিক সাড়ে ছ’ঘণ্টা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সাত ঘণ্টা করা হল।[৯]
“প্রতারণাপূর্ণ পালা প্রথার কদাচারগুলি থেকে অব্যাহতি পাবার জন্য আইনে অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাগুলি রাখা হল :—শিশু ও তরুণদের শ্রম-সময় তখনই আরম্ভ হয়েছে ধরতে হবে, সকালে যখন একটি শিশু বা তরুণ কাজ আরম্ভ করবে।” অর্থাৎ যদি ‘ক’ সকাল আটটায় কাজ আরম্ভ করে এবং ‘খ’ আরম্ভ করে ১০টায়, তাহলে ‘খ’-র শ্রম-দিবস ‘ক’-এর সঙ্গে একই সময়ে শেষ হবে। কোন প্রকাশ্য সাধারণ প্রতিষ্ঠানের ঘড়ি অনুযায়ী সময় নিয়ন্ত্রিত হবে”, যেমন দৃষ্টান্তস্বরূপ, সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী রেলের ঘড়ির সঙ্গে কারখানার ঘড়িকে মেলাতে হবে। মালিককে একটি পঠনযোগ্য ছাপানো নোটিশ টাঙিয়ে জানাতে হবে কখন কাজ শুরু ও শেষ হবে এবং বিভিন্ন ভোজের কতটা করে সময় দেওয়া হবে। যেসব শিশু দুপুর বারোটার আগে কাজ শুরু করেছে, তাদের আবার বেলা একটার পরে আবার নূতন করে নিয়োগ করা চলবে না। অতএব সকালের পালায় যারা কাজ করেছে, তাদের বাদ দিয়ে অন্যদের বিকালের পালায় নিযুক্ত করতে হবে। অতএব বিকালের পালায় শিশুরা সকালের শিশুদের থেকে ভিন্ন হবে। খাবার সময়ের দেড় ঘণ্টার মধ্যে ‘অন্ততঃ একঘণ্টা সময় বেলা তিনটার আগেই দিতে হবে …..এবং সকালেও অনুরূপ সময় দিতে হবে। কোন শিশু বা তরুণ-তরুণীকে বেলা একটার আগে কমপক্ষে তিরিশ মিনিট ভোজনের সময় না দিয়ে পাঁচ ঘণ্টার বেশি খাটানো চলবে না। কোন শিশু ব তরুণ বা তরুণীকে (খাবার সময়ে ) কোন ঘরে যেখানে শিল্পোৎপাদন চলছে কাজ করতে বা থাকতে দেওয়াও হবে না”, ইত্যাদি, ইত্যাদি।
এটা দেখা গিয়েছে যে এইসব খুটিনাটি ব্যবস্থা যাতে সামরিক শৃঙ্খলানুযায়ী ধড়িব ফাটায় কাটায় কর্মবিরতির সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, এগুলি পার্লামেন্টের কল্পনাপ্রসূত নয়। এগুলি অাধুনিক উৎপাদন প্রণালী থেকে উদ্ভুত প্রাকৃতিক নিয়মের মতই ঘটনাবলী থেকে ক্রমশঃ উদ্ভূত হয়েছে। এইগুলিকে সূত্রাকারে ব্যক্ত করা, এগুলি সরকারী স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র কর্তৃক ঘোষণা হচ্ছে সুদীর্ঘ শ্রেণী-সংগ্রামের ফল। এদের প্রথম ফল এই হল যে কার্যক্ষেত্রে কারখানাগুলিতে পূর্ণবয়স্ক পুরুষদের শ্রম-দিবস ও এইরকম নিয়মের নিয়ন্ত্রণ এল কারণ উৎপাদনের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিশু, তরুণ ও মহিলাদের সহযোগিতা অপরিহার্য। অতএব মোটের উপর ১৮৪৪ থেকে ১৮৪৭ সালের মধ্যে বারো ঘণ্টার এম-দিবস কারখানা আইনের মাধ্যমে শিল্পের সকল শাখায় সাধারণ ও সমভাবে প্রযোজ্য হল।
কিন্তু কারখানা মালিকেরা ক্ষতিপূরণ হিসেবে কিছুটা “প্রতিক্রিয়া না ঘটিয়ে এই “প্রগতি” হতে দেয়নি। তাদের প্ররোচনায় কমন্স সভা শোযণযোগ্য শিশুদের নিমতম বয়স নয় থেকে কমিয়ে আট করেন যাতে ধনিকরা ঐশ্বরিক ও মানবিক বিধান অনুসারে কারখানায় অধিক সংখ্যক শিশুর যোগান পেতে পারেন।[১০]
ইংল্যাণ্ডের অর্থ নৈতিক ইতিহাসে ১৮৪৬-১৮৪ ৭ বৎসরগুলি যুগান্তকারী। শস্য আইন এবং তুলল। ও অন্যান্য কাচামালগুলির উপর শুল্কের অবসান; আইন-প্রণয়নের ধ্রুব লক্ষ্য হিসেবে স্বাধীন ব্যবসা সম্পর্কিত ঘোষণা; এক কথায় নবযুগের আবির্ভাব হল। অপরপক্ষে ঐ একই বছরগুলিতে চার্চিস্ট আন্দোলন এবং দশ ঘণ্টা আইনের পক্ষে বিক্ষোভ ক্রান্তি-বিন্দুতে পৌছাল। এইগুলি প্রতিশোধকামী টোরীদের সমর্থন পেল। ব্রাইট ও কব ডেনের নেতৃত্বে স্বাধীন ব্যবসার ধ্বজাধারীদের উন্মত্ত বিরোধিতা সত্ত্বেও এতকাল যে জন্য সংগ্রাম চলেছে সেই দশ ঘণ্টা আইনের প্রস্তাব পার্লামেন্টে গৃহীত হল।
১৮৪৭ সালের আট-ই জুনের নূতন কারখানা আইনে স্থির হল যে ১৮৪৭-এর পয়লা জুলাই থেকে প্রাথমিকভাবে (তেবে থেকে আঠারো বছর বয়সের তরুণদের এবং সকল নারীশ্রমিকের শ্রম-দিবস এগারো ঘণ্টা করতে হবে, কিন্তু ১৮৭০-এর পয়লা মে থেকে বাধ্যতামূলকভাবে শ্রম-দিবসকে দশ ঘণ্টা করতে হবে। অন্যান্য বিষয়ে এই আইনটি ১৮৩-১৮৪৪ সালের আইনগুলিকে সংশোধিত ও পূর্ণাঙ্গ আকার দান করে।
এইবার ধনিকরা ১৮৪৮ সালের পাল। মে যাতে আইনটির পূর্ণ প্রয়োগ না করা হয় তার জন্য অন্তরায় সৃষ্টির প্রাথমিক অভিযান শুরু করল। এবং শ্রমিকরা নিজেরাও অভিজ্ঞতা লব্ধ শিক্ষার অজুহাত তুলে নিজেদের আন্দোলন লব্ধ ফল নষ্ট করতে প্রবৃত্ত হল। খুবই চাতুরীর সঙ্গে সময়টি বাছাই করা হয়েছিল। “এটাও স্মরণ রাখা দরকার যে (১৮৪৬-৪৭ এর ভয়ানক সংকটের দরুণ ) কারখানা শ্রমিকরা অনেক কমে কম সময়ে কাজ করার ফলে অনেক কল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দু’বছরের অধিককাল ভীষণ কষ্ট পায়। অতএব একটি বৃহৎ সংখ্যক শ্রমিক তখন খুব কষ্টের মধ্যে ছিল; বোঝা যায় যে অনেকে দেনাদার হয়েছিল; অতএব এটি বেশ আন্দাজ করা যায় যে তখনকার মত তারা বেশি সময় কাজ করতে চাইবে যাতে অতীতের ক্ষতিপূরণ হয়, হয়ত দেনা শোধ করা যায় অথবা মহাজনদের বন্ধক আসবাবপত্র ছাড়িয়ে আনা যায় অথবা বিক্রি করা জিনিসগুলির স্থানপূরণ করা যায় অথবা নিজেদের ও পরিবার পরিজনদের জন্য নূতন পোষাক আশাক কেনা যায়।”[১১]
