কমিশনের কেন্দ্রীয় পর্ষদ তার ১৮৭৩ সালের ২৮শে জুন প্রথম রিপোর্টটিতে বলেন বর্তমানে কাবখানা-ব্যবস্থা যেভাবে পরিচালিত হয় তার প্রধান অভিশাপ আমাদের কাছে এটাই মনে হয় যে এতে শিশুদের শ্রমকে বয়স্বকের শ্রমের উচ্চতম সীমা পর্যন্ত প্রসারিত করার প্রয়োজন হয়। বয়স্কদের শ্রম সময় হ্রাস করা এব একটা প্রতিকার হতে পারে। কিন্তু তা করলে আমাদের মনে হয় উক্ত অভিশাপটির চেয়েও আরও বড় একটি অভিশাপের প্রাদুর্ভাব ঘটবে; সুতরাং একমাত্র যেটা হতে পারে সেটা হচ্ছে দু প্ৰস্ত শিশুকে নিয়োগ করা।”…….অতএব পালাক্রমে কাজ করাবার নামে এই প্রথাটি চালু হল যাতে ( দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়) এক প্রস্থ শিশুকে কাজ করান হত সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত এবং আর এক প্রস্ত শিশুকে দেড়টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে আটটা পর্যন্ত। এই শিশুদের বয়স নয় থেকে তেরোর মধ্যে।
বিগত বাইশ বছরকাল অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে শিশুদের শ্রম-সম্পর্কিত সমস্ত আইন অবজ্ঞা করার পুরস্কার হিসেবে কারখানা-মালিকদের জন্য ব্যবস্থাটিকে আরও গ্রহণযোগ্য করা হল। পার্লামেন্ট আদেশ জারি করলেন যে ১৮৩৪ সালে পয়লা মার্চের পর এগারো বছরের কম বয়সের কোন শিশুকে, ১৮৩৫ সালে পয়লা মার্চের পর বারো বছরের কম বয়সের কোন শিশুকে এবং ১৮৩৬ সালের ১লা মার্চের পর তেরো বছরের কম বয়সের কোন শিশুকে কোন কারখানায় আট ঘণ্টার বেশি খাটান যাবে না। “মূলধনের পক্ষে সহৃদয়তাপূর্ণ এই “উদারত।” খুবই উল্লেখযোগ্য এইজন্য যে ডাঃ ফারে, স্যার এ কার্লাইল স্যার বি. ব্রোডি, স্যার সি. বেল, মি. গুথ রি প্রভৃতি, এক কথায় লণ্ডন নগরীর একেবারে অগ্রগণ্য চিকিৎসক সাজেনবা কমঙ্গা সভায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ঘোষণা করেছিলেন যে দেরী হলেই বিপদ হবে। ডা: ফারে খুব কটভাবেই বক্তব্য রেখেছিলেন। “যে-কোন প্রকারে অকলে ঘটান মৃত্যু বন্ধ করার জন্য আইন কর; দরকার একথা অনস্বীকার্য যে এই পদ্ধতিকে (অর্থাৎ কারখানা ব্যবস্থাকে মৃত্যু ঘটাবার একটি অত্যন্ত নষ্ঠর পদ্ধতি রূপেই দেখতে হবে।
এই একই “সংশোধিত” পার্লামেট এ দিকে যেখানে কারখানা মালিকদের প্রতি সুকোমল মমতাবোধ থেকে আগামী দীর্ঘকালের জন্য তেরো বছরের কম বয়সের শিশুদের কারখানা নামক নরকণ্ডে সপ্তাহে বাহাত্তর ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য করল, অন্যদিকে যেখানে মুক্তিদান আইন’-এর মাধমে-ঘাতে ব্যবস্থা রয়েছে ফোটা ফোটা করে স্বাধীনতাদানের মাধ্যমে—গোড়া থেকেই নিগ্রো দাসদের দিয়ে সপ্তাহে ৪৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো নিষিদ্ধ করে বাগিচা মালিকদের উপরে হুকুম জারি করল।
কিন্তু এই ব্যাপার আদৌ মেনে না নিয়ে ধনিকেরা শোরগোল তুলে যে আন্দোলন শুরু করল সেটি চলল অনেক বছর ধরে। এই আন্দোলনের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল সেই বয়ঃসীমা যার বলে শিশুদের কাজ আট ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ করা করা হয় এবং তাদের জন্য কিছুটা পরিমাণ শিক্ষার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থাও করা হয়। ধনিকদের নৃতত্ত্ববিদ্যা। অনুযায়ী শৈশব শেষ হয় দশ বছরেই, অথবা বড় জোর এগাবে বছরে। যতই নূতন। কারখানা আইনটির পূর্ণ প্রয়োগের সময় এগিয়ে আসতে লাগল, অর্থাৎ সাংঘাতিক ১৮৩৬ সালটি ঘনিয়ে এলো ততই, কারখানা-মালিকদের দল পাগলের মতো চীৎকার করতে লাগল। বস্তুত তারা সরকারকে এতদূর এন্ত করে তুলল যে ১৮৩৫ সালেই প্রস্তাব এলো যে শৈশবের বয়ঃসীমা তেরো থেকে কমিযে বারো করা হউক। ইতিমধ্যে বাইরের চাপ-ও খুব বেশি বেড়ে উঠল। তাই কমন্স সভার সাহসে আর কুলালো না এবং তেরো বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের মূলধনের রথচক্রের নীচে দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি পিষ্ট করতে তারা রাজী হলেন না এবং ১৮৩৩ সালের আইনটির পূর্ণ প্রয়োগ শুরু হল। ১৮৪৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত এই আইনটি অপরিবর্তিত ছিল।
গোড়ার দিকে আংশিকভাবে এবং পূর্ণমাত্রায় দশ বৎসর কাল কারখানার কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে কারখানা-পরিদর্শকের সরকারী রিপোর্টগুলি এই অভিযোগে মুখর হয়ে উঠল যে, আইনটি প্রয়োগ করা অসম্ভব। ১৮৩৩ সালের আইবটি সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে রাত্রি সাড়ে আটটা পর্যন্ত পনের ঘণ্টা সময়ের মধ্যে প্রত্যেকটি তরুণ, বয়স্ক এবং প্রত্যেকটি শিশুকে দিয়ে মূলধনের মালিকদের খুশিমতো কাজ আরম্ভ করার বিরতি দেবার, আবার কাজ আরম্ভ করার অথবা তার বাবা কিংবা আট ঘণ্টা কাজের মধ্যে যে-কোন সময় বিরতি দেবার অধিকার দিয়েছিল এবং মালিকদের এই অধিকারও দেওয়া হয়েছিন যাতে বিভিন্ন ব্যক্তির জন্য আহারের বিভিন্ন সময় স্থির করা চলে; মালিক ভদ্রলোকেরা শীঘ্রই এমন একটি নূতন “পালাক্রমে কাজের প্রথা আবিষ্কার করলেন যাতে তাদের মেহনতি ঘোডাগুলিকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে বদল না করে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে নোতুন করে লাগাম পরানো হত। এই পদ্ধতির গুণাগুণ নিয়ে এখন চিন্তা না করে পরে সে বিষয়ে আসা যাবে। কিন্তু একজনেরই এই জিনিষটি পরিষ্কার : এই পদ্ধতি গোটা কারখানা আইনটিকে কেবল আনুষ্ঠানিক ভাবেই নয়, একেবারে আক্ষরিকভাবেই বাতিল করে দিল। কারখানা পরিদর্শকেরা প্রত্যেকটি শিশু বা তরুণ সম্পর্কে জটিল হিসেবের মধ্যে কিভাবে আইন নির্দিষ্ট ভোজনের এবং নির্দিষ্ট শ্ৰম সময় বাধ্যতামূলক করবে? বহুসংখ্যক কারখানায় পুরাতন পাশবিকতাগুলি আবার শীঘ্রই প্রকট হয়ে উঠল এবং তার জন্য কারো কোন শাস্তিও হলনা। স্বরাষ্ট্র বিভাগের সেক্রেটারীর সঙ্গে ( ১৮৪৪ ) সালে একটি আলোচনায় কারখানা পরিদর্শকের প্রমাণ করে দিলেন যে নব-আবিষ্কৃত পালাক্রমক শ্রমের প্রথায় নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব।[৫] কিন্তু ইতিমধ্যে অবস্থার গুরুতর পরিবর্তন ঘটল। কারখানা-শ্রমিকেরা, বিশেষতঃ ১৮৩৮ সালের পর থেকে দশ ঘণ্টার শ্রমের প্রস্তাবটি অর্থনৈতিক নির্বাচন-ধ্বনি করেতুলল যেমন চার্টারকে তারা পরিণত করল রাজনৈতিক ধ্বনিতে এমনকি কোন কোন কারখানা মালিক যারা ১৮৩৩ সালে আইন অনুযায়ী কারখানা চালাচ্ছিল তারাও তাদের অসাধু সমব্যবসায়ীদের দুর্নীতিমূলক প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে একটির পর একটি স্মারকলিপি পাঠাতে লাগল,-এইসব অসাধু মালিকরা কোথাও দুঃসাহস এবং কোথাও স্থানীয় অবস্থার সুযোগে আইনটি ভেঙ্গে চলছিল। উপরন্তু কারখানা মালিক ব্যক্তিগত লাভের জন্য সীমাহীন ভাবে যতই লোলুপ হোক না কেন, তারা তাদের মুখপাত্র ও রাজনৈতিক নেতাদের শ্রমিকদের কাছে বক্তৃতার ভোল পাল্টে ফেলবার আদেশ দিলেন। তারা তখন শস্য আইনগুলির (corn laws) অবসানের জন্য সংগ্রামে নেমেছিল এবং তাতে বিজয়লাভের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল শ্রমিকদের সমর্থন। তাই তারা শুধু দ্বিগুণ রুটির প্রতিশ্রুতি দিল না, পরন্তু স্বাধীন ব্যবসার সত্যযুগে দশ ঘণ্টার শ্রমের প্রস্তাবটিকে কার্যকরী করার প্রতিশ্রুতিও দিল।[৬] এইভাবে তারা ১৮৩৩ সালের আইনটিকে কার্যকরী করার প্রস্তাবে বাধা দান থেকে বিরত রইল। তাদের পবিত্রতম স্বার্থের জমির খাজনার উপর আঘাত আসায় ‘টোরি’ ভূস্বামীরা তাদের শত্রু কারখানা মালিকদের ‘শয়তানী আচরণের’[৭] বিপক্ষে লোকহিতায় ক্রোধ প্রকাশ করে তর্জন গর্জন শুরু করল।
