দৈনিক বার ঘটা শ্রম, এই হল ১৭৭০ সালের বন্যাস অগিব আদর্শ কর্মনিবাস ! তেষট্টি বছর পরে ১৮৩৩ সালে যখন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট শিল্পের চারটি শাখায় তেরো থেকে আঠারো বছরের তরুণদের শ্রম-দিস কমিয়ে বারে। ঘটা করলেন, তখনই ইংরেজদের ‘শলের বিচারের দিন শুরু হল। ১৮৫১ সালে যখন লুই বোনাপটি ধনিকদের সন্তুষ্ট করে নিজের প্রতিষ্টা শক্ত করার জন্য আইন-সঙ্গত শ্রম-দিবসে হস্তক্ষেপ করলেন, তখন রাসী জনগণ একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল : “ধারণতন্ত্রের আইনগুলির মধ্যে একটি মাত্র ভাল ইন-ই অবশিষ্ট আছে শ্রম-দিবসকে বারো ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ রাখার আইনটি।”[২৪] জুরিখে দশ বছরের উর্বে শিশুদের শ্রমের ঘট। বারোতে সীমাবদ্ধ করা হল, ১৮৬২ সালে অরিগাইতে তেরো থেকে যোল বছরের তৰুণদের শ্রম ১২ থেকে বার ঘন্টা করা হল, ১৮৬০ সালে অধীয়ায় চোদ্দ থেকে ষোল বছরের তরুণদের জন্য শ্রমের ঘণ্টা। একইভাবে কমান হল।[২৫] কী দারুন অগ্রগতি’ ১৭৭০ সাল থেকে। মেকলে এই বলে উল্লাসে চেঁচাবেন !!
১৭৭০ সালে ধনতন্ত্রের আত্মা ভিক্ষুকদের জন্য সন্ত্রাস আগার সৃষ্টির যে স্বপ্ন মাত্র দেখেছিল, সেইটাই কয়েক বছর পরে শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের নিয়েই একটি বিরাট “কর্মনিবাস’-এর রূপ পরিগ্রহ করল। এরই নাম হচ্ছে কারখানা এবং এক্ষেত্রে বাস্তবের কাছে কল্পনা হার মানলো।
————
১. ইংল্যাণ্ডের গ্রামীণ জেলাগুলিতে এখনো মাঝে মাঝে শ্রমিককে তার বাড়ির সামনের বাগানে রবিবার কাজ করে পবিত্র বিশ্রামের দিনটিকে অপবিত্র করার অপরাধে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ঐ একই শ্রমিককে আবার ধাতু, কাগজ অথবা কাচের কারখানায় রবিবারে কাজে হাজির না হলে চুক্তিভঙ্গের অপরাধে শাস্তি পেতে হয়। সনাতনপন্থী পার্লামেন্ট পর্যন্ত রবিবারের পবিত্রতা লম্বন করা সম্পর্কে কোন কথাই শুনতে চান না যদি মূলধনের প্রসারের প্রণালীর প্রয়োজনে ঐটি দরকার হয়ে পড়ে। লণ্ডনের মাছ এবং হাঁস-মুরগীর দোকানের দিন-মজুরের। ১৮৬৩ সালের আগষ্ট মাসে একটি স্মারকলিপিতে রবিবারে শ্রম নিষিদ্ধ করতে চেয়ে বলেন যে তাদের সপ্তাহের প্রথম ছ’দিনে গড়ে পনের ঘন্টা করে কাজ করতে হয় এবং রবিবারে আট থেকে দশ ঘণ্টা। ঐ একই লিপি থেকে আমরা জানতে পারি যে এক্সেটার হল’-এর ভণ্ড অভিজাত সম্প্রদায়ের ভোজন-বিলাসীরাই বিশেষ করে রবিবারের শ্রমের উৎসাহ দেন। এইসব পবিত্র ব্যক্তিরা ধর্মের জন্য যাদের উৎসাহের অন্ত নাই তারা তাদের খ্ৰীষ্টান মনোভাবের পরাকাষ্ঠা দেখান অপরের অতিরিক্ত খাটুনি, দুঃখকষ্ট ও ক্ষুধাকে চোখ বুজে বিনীত ভাবে মেনে নিয়ে। “Obsequium ventrisistis (the labourers) perniciosius est.”
২. ইতিপূর্বে কয়েকজন অভিজ্ঞ কারখানা-মালিকদের বক্তব্য নিয়ে এই মর্মে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে যে, “অতিরিক্ত ঘণ্টার কাজ সুনিশ্চিতভাবে মানুষের কাজ করার ক্ষমতাকে অকালে নিঃশেষ করে।” (1. c. ৬৪, পু xiii)।
২. কেয়ানেস, (“The Slave Power”) ‘দাস শক্তি’ পৃঃ ১১০, ১১১।
৩. জনওয়া : ‘দি বয়ে অব স্টোক আপন ট্রেন্ট লণ্ডন, ১৮৪৩, পৃঃ ৪২।
৪. কমন্স সভায় ১৮৬৩ সালের ২৭শে এপ্রিল ফেণ্ড-এর বক্তৃতা।
৫, ঠিক এই শব্দগুলিই সুতোকল-মালিকরা ব্যবহার করেন, 1.c.।
৬. l.c. রিপোর্ট। নিজের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মি. ভিলিয়ার্স কারখানা মালিকদের অনুরোধ অমান্য করতে ‘আইনত বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু এইসব ভদ্র লোকেরা স্থানীয় গরিব আইন পর্ষদের কর্তৃপক্ষকে বশ করে নিজেদের উদ্দেশ্যে সিদ্ধ করেন। কারখানা-ইন্সপেক্টর মিঃ রেড গ্রেভ জোরের সঙ্গে বলেন যে এইবার যে প্রথা অনুযায়ী ভিখারী ও অনাথ শিশুদের ‘আইনত: শিক্ষানবীশ ধরা হয়েছিল, তাতে কিন্তু সেই পুরানো অনাচারগুলি ছিল না। (এই অনাচারগুলি সম্পর্কে এঙ্গেলস্-এর “Lage” দেখুন), যদিও একটি ক্ষেত্রে সুনিশ্চিতভাবে এই প্রথার অপব্যবহার দেখা যাব সেখানে কিছুসংখ্যক বালিকা ও তরুণীকে স্কটল্যাণ্ডের কৃষি প্রধান অঞ্চল থেকে ল্যাংকাশায়ারে ও চশারে আনা হয়েছিল। এই প্রথায় কারখানা-মালিক একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এইসব প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি চুক্তি করতেন। তিনি শিশুদের খাওয়া, পর ও বাসস্থান দিতেন এবং তাদের হাত-খরচার জন্য অল্প কিছু। অর্থ দিতেন। মিঃ রেড গ্রেভ -এর একটি মন্তব্য যেটা নীচে সরাসরি উদ্ধৃত করা। হয়েছে সেটা অদ্ভুত মনে হয়। বিশেষত যখন আমরা বিচার করি ইংল্যাণ্ডে বস্তু শিল্পের সমৃদ্ধির বছরগুলির মধ্যেও ১৮৬০ সাল হচ্ছে একটা ব্যতিক্রম এবং অধিকন্তু ঐ সময় মজুরিও ছিল অস্বাভাবিক রকমের বেশি। কারণ কাজের এই ভীষণ চাহিদার অপরদিকে ছিল আয়াল্যাণ্ড ও স্কটল্যাণ্ডের কৃষি প্রধান অঞ্চলগুলি থেকে অস্ট্রেলিয়া ও নরমেনদের আমেরিকায় বিদেশ যাত্রার হিড়িক, এমনকি ইংল্যাণ্ডের কৃষিপ্রধান জেলা গুলিতে জনসংখ্যা সত্যসত্যই কমে গিয়েছিল। এর কারণ হচ্ছে অংশত এই যে মানুষ ব্যবসায়ে লিপ্ত এজেন্টদের মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রাণশক্তি ইতিপূর্বেই ব্যবহার যোগ্য শক্তিতে রূপান্তরিত। এইসব সত্ত্বেও মিঃ রেড গ্রেভ বলেন : কিন্তু এই ধরনের শ্রম কেবল তখনই খোঁজা হয় যখন আর সবই দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে, কারণ এই শ্রমের মূল্য বেশি। তেরো বছরের একটি বালকের মজুরি হচ্ছে সাধারণতঃ সপ্তাহে চার শিলিং কিন্তু পঞ্চাশ অথবা একশটি বালকের জন্য বাসস্থান, খাওয়া-পরা, চিকিৎসার সুযোেগ এবং উপযুক্ত পরিদর্শক রাখতে হয় এবং তাদের জন্য কিছু পারিশ্রমিক প্রয়োজন, যাতে মাথাপিছু সাপ্তাহিক খরচ চার শিলিং এর মধ্যে করা সম্ভব হয় না।” ( ১৮৬০ সালের ৩০শে এপ্রিল কারখানা পরিদর্শকের রিপোর্ট, পৃঃ ২৭।) মিঃ রেড় গ্রেভ, অবশ্য ভুলে গিয়েছেন যে কি করে সপ্তাহে চার শিলিং মজুরি পেয়ে শ্রমিক তার শিশু সন্তানদের জন্য এইসব করতে পারে, যখন কারখানা-মালিক পঞ্চাশ বা একশটি শিশুকে একত্রে রেখে, খাইয়ে ও তদারক করিয়ে পেরে ওঠেন না। রিপোর্ট থেকে যাতে এসব ভ্রান্ত ধারণা না হয় তার জন্য আমার এখানে বলা উচিত যে ১৮৫০ সালের কারখানা আইন মারফং শ্রম সময় নিয়ন্ত্রিত হবার পর ইংল্যাণ্ডের বস্ত্র-শিল্পকে দেশের একটি আদর্শ শিল্প বলেই ধরতে হবে। ইংল্যাণ্ডের বস্ত্রশিল্পের শ্রমিক সবদিক দিয়ে ইউরোপের সমদুঃখী শ্রমিকদের চেয়ে ভাল অবস্থায় আছে।” “প্রুশিয়ার কারখানার শ্রমিক ইংল্যাণ্ডের শ্রমিকদের চেয়ে সপ্তাহে কমপক্ষে দশ ঘণ্টা বেশি কাজ করে এবং যখন সে নিজের বাড়িতে নিজের তাঁত চালায় তখন তার শ্রমের পরিমাণ এই বাড়তি ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। (কারখানা পরিদর্শকের রিপোর্ট, ৩১ অক্টোবর, ১৮৫৫, পৃঃ ১০৩।) উল্লিখিত কারখানা পরিদর্শক রেড গ্রেভ ১৮৫১ সালের শিল্প প্রদর্শনীর পর ইউরোপের ভূখণ্ডে ভ্রমণ করেন, বিশেষতঃ ফ্রান্স ও জার্মানিতে; উদ্দেশ্য ছিল, কারখানাগুলির অবস্থার অনুসন্ধান করা। প্রুশিয়ার শ্রমিক সম্পর্কে তিনি বলেন : “সে তার অত্যন্ত সাদাসিধা খাবার সংগ্রহের উপযোগী এবং তার অভ্যস্ত যৎসামান্য স্বাচ্ছন্দ্যের উপযোগী মজুরি পায়। সে মোটা খায় এবং কঠোর পরিশ্রম করে, যে বিষয়ে তার অবস্থা ইংরেজ শ্রমিকের চেয়ে খারাপ। ( কারখানা। পরিদর্শকের রিপোর্ট, ৩১শে অক্টোবর, ১৮৫৫, পৃঃ ৮৫।)
