তথাপি আঠারো শতকের বেশির ভাগ সময়ে আধুনিক শিল্প ও যযুগের সময় পর্যন্ত ইংল্যাণ্ডের ধনতন্ত্র সাপ্তাহিক মজুরি দিয়ে শ্রমশক্তি শ্রমিকের গোটা সপ্তাহের পরিশ্রমের ক্ষমতা হস্তগত করতে পারেনি, শুধুমাত্র কৃষি মজুরের ক্ষেত্রেই এর ব্যতিক্রম হয়েছিল। চার দিন খেটে পুরো সপ্তাহের জীবিকা হয়ে যেত কিন্তু শ্রমিক কেন যে আরও দুদিন ধনিকের হয়ে খাটবে না এইটাই তার যথেষ্ট কারণ বলে শ্রমিকের কাছে প্রতীয়মান হত না। একদল অর্থনীতিবিদ ধনতন্ত্রের স্বার্থে এই একগুয়েমির অত্যন্ত তীব্র নিন্দা করলেন, আর একটি দল শ্রমিকদের সমর্থন করলেন। এখন শোনা যাক এই দুই দলের বিতর্ক-পোষ্টলেথওয়েট যার “বাণিজ্যের অভিধানের” সে সময়ের খ্যাতি আজকের দিনে ঐ বিষয়ে ম্যাক-কুল্যক ও ম্যাকগ্রেগরের রচনার সমান ছিল, তার সঙ্গে ব্যবসা ও বাণিজ্যবিষয়ক নিবন্ধ’-এর রচয়িতার (ইতিপূর্বে এর উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে ) বিতর্ক।[১৭]
অন্যান্য অনেক কথার মধ্যে পোষ্টলেথওয়েট বলেন : “বহুলোকের মুখে উচ্চারিত এই আলোচনা শেষ করতে পারি না; মন্তব্যটি এই যদি মেহনতি গরীব মানুষ পাঁচদিন খেটে যথেষ্ট রোজগার করে, তাহলে তারা পুরো ছদিন কাজ করবে না। এর থেকে এরা এই সিদ্ধান্ত টানছেন যে জীবনধারণের আবশ্যিক দ্রব্যাদির ওপরে ও ব র চাপিয়ে তাদের দাম বাড়ানো দরকার, অথবা অন্য যে কোন উপায়ে কারিগর ও কারখানা শ্রমিকদের গোটা সপ্তাহে ছ’দিন এক নাগাড়ে কাজ করতে বাধ্য করাতে হবে। এই রাজ্যে শ্রমজীবী-জনগণের অবিরাম দাসত্বের জন্য যারা ওকালতি করেন সেইসব বড় বড় রাজনীতিবিদ থেকে আমি সবিনয়ে আমার মত পার্থক্য ‘ঘোষণা করতে চাই। ওঁরা অতি সাধারণ প্রবচনটিও ভুলে গিয়েছেন : “খেলা ছাড়া কেবল কাজে, জ্যাকের বুদ্ধি যায় মজে।” ইংরেজরা কি তাদের কারিগর ও কারখানা-শ্রমিকের নিপুণতা ও কর্মকুশলতা নিয়ে গর্ব করেন না যে এইজন্যই সাধারণভাবে ব্রিটিশ পণ্যের আদর ও সুনাম? এটা কেমন করে সম্ভব হল? শ্রমজীবী-মানুষ নিজেদের খুশি মতো বিশ্রাম যাপনের সুবিধা পেয়ে এসেছে বলে-ই খুব সম্ভব এটি হতে পেরেছে। যদি সপ্তাহে ছ’দিন করে সারা বছর বিরামহীনভাবে তাদের কাজ করতে হত, একই কাজের পুনঃপুনঃ অনুষ্ঠান, তাতে কি তাদের কর্মকুশলতা ভোতা হত না এবং তাতে সজাগ ও চৌকস না হয়ে তারা কি নির্বোধ হয়ে যেত না? এবং এতে কি অবিরাম দাসত্বের ফলে আমাদের শ্রমিকদের সুনাম নষ্ট হত না?….. এই ধরনের কঠোরভাবে তাড়িত প্রাণীদের কাছে আমরা কী ধরনের দক্ষতা প্রত্যাশা করি? ….. … এদের মধ্যে অনেকেই চার দিনেই যে পরিমাণ কাজ করবে, একজন ফরাসী শ্রমিকের সেই কাজ করতে পাঁচ কিংবা ছ’দিন লাগে। কিন্তু যদি ইংরেজ শ্রমিককে একটানা ক্লান্তিকর পরিশ্রমের বলি হতে হয় তাহলে ফরাসীর চেয়ে তার আরো অধোগতির আশঙ্কা আছে। যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্বের জন্য আমাদের দেশের মানুষের খ্যাতি আছে সেই প্রসঙ্গে কি আমরা বলি না যে এর পিছনে যতটা স্বাধীনতার জন্য তাদের সহজাত নিষ্ঠা ঠিক ততটাই আছে ইংরেজের ভোজ্য উত্তম বীফ ও পুডিং? আমাদের কারিগর ও শ্রমিকদের উচ্চতর পর্যায়ের উদ্ভাবনী শক্তি ও কর্মকুশলতা কি নিজেদের ইচ্ছামত পরিচালনা করবার স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের উপরই নির্ভর করে না? এবং আমি আশা করি যে আমরা কখনই তাদের এইসব সুযোগ সুবিধা ও স্বচ্ছন্দ জীবনযাত্রা থেকে বঞ্চিত হতে দেব না কারণ এইগুলি থেকেই যেমন আসে তাদের কর্মকুশলতা, তেমনি আসে তাদের সাহস।[১৮] এর উত্তরে “ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ক নিবন্ধ” এর রচয়িতা বলছেন : “প্রত্যেকটি সপ্তম দিন যদি ছুটির দিন বলে বিশ্ববিধাতার বিধান হয়, তাহলে তার মানে হয় যে বাকি ছ’টি দিন হচ্ছে শ্রমের জন্য (আমরা শীঘ্র দেখতে পাব যে তিনি বলতে চাইছেন মূলধনের জন্য ), সে ক্ষেত্রে এটিকে কার্যকরী করার মধ্যে কোন নিষ্ঠুরতা আছে সে কথা কেউই নিশ্চয় মনে করবেন না……. সাধারণভাবে মানবজাতি যে স্বভাবগত ভাবেই আরাম ও আলস্যপ্রবণ সেটা যে সত্য তা আমাদের সর্বনাশা অভিজ্ঞতাই প্রমাণ করে যখন আমরা কারখানায় নিযুক্ত শ্রমিকদের দেখি যে তারা সপ্তাহে গড়ে চার দিনের বেশি পরিশ্রম করে না যদি-না খাদ্য সামগ্রীর দাম চড়ে যায় : গরিবের প্রাণ ধারণের দ্রব্য সামগ্রীকে একটি দ্রব্য হিসেবে গণ্য করুন; ধরুন সেটি গম অথবা মনে করুন………….. এক বুশেল গমের দাম পাঁচ শিলিং এবং সে ( অর্থাৎ শ্রমিক) দিনে পরিশ্রম করে এক শিলিং রোজগার করে, তাকে এখন সপ্তাহে পাঁচদিন কাজ করতেই হবে। যদি এক বুশেল গমের দাম চার শিলিং হয়, তাহলে মাত্র চারদিন কাজ করতে বাধ্য হয়, কিন্তু যেহেতু আমাদের দেশে জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর দামের তুলনায় মজুরি অনেক বেশি, …….. কারখানার শ্রমিক চার দিন খেটে যে বাড়তি পয়সা পায় তা দিয়ে সে সপ্তাহের বাকি কটা দিন আলস্যে কাটাতে পারে …………..আমি আশা করি যে আমি যা বলেছি তাতেই প্রমাণিত হয়েছে যে সপ্তাহের ছ’দিনের পরিমিত শ্রম মানে দাসত্ব নয়। আমাদের শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ এটাই করেন এবং আপাতদৃষ্টিতে তারা আমাদের শ্রমজীবী গরীবদের মধ্যে সবচেয়ে সুখী কিন্তু ওলন্দাজরা কারখানা-শিল্পেও এটা করে থাকে এবং দেখে মনে হয় যে তারা খুবই সুখী।[১৯] ফরাসীরাও কোন ছুটির দিন মাঝখানে এসে না গেলে এই ভাবেই কাজ করে।[২০] কিন্তু আমাদের জনগণের মনে একটি ধারণা জন্মেছে যে ইংরেজ হিসেবে তাদের জন্মগত অধিকার রয়েছে যে তারা ইউরোপের অন্যান্য যে কোন দেশের লোকের চেয়ে বেশি মুক্ত ও স্বাধীন। আমাদের সৈন্য বাহিনীর বীরত্বের সঙ্গে এই ধারনার যেটুকু সম্বন্ধ আছে, সেইটুকুর কিছু কার্যকারিতা আছে; কিন্তু কারখানায় নি মুক্ত গরীবদের মনে এই ধারণা যতই কম থাকে, তাদের নিজেদের পক্ষে এবং দেশের পক্ষে ততই মঙ্গল। শ্রমজীবী মানুষের কখনও নিজেদের উর্ধ্বতম ব্যক্তিদের থেকে স্বাতন্ত্রের কথা ভাবা উচিত নয়।…….. আমাদের মত ব্যবসা-বাণিজ্য প্রধান দেশে মানুষ ক্ষেপান খুবই বিপজ্জনক কারণ এখানে বোধ হয় জনগণের আট ভাগের মধ্যে সাত ভাগেরই কোন সম্পত্তি নেই। কোন ঔষধই পুরোপুরি খাটবেনা য ওক্ষণ-না পর্যন্ত কারখানায় নিযুক্ত আমাদের শ্রমিকরা। এখন চারদিনে যে রোজগার হয়, সেইটাই ছয় দিন খেটে রোজগার করতে বাধ্য হচ্ছে।[২১] এই উদ্দেশ্যেই এবং “আলস্য লাম্পট্য ও বাড়াবাড়ি নিমূল করার জন্য, পরিশ্রমের জন্য মনোভাব সৃষ্টির জন্য, কারখানায় “শ্রমের খরচ কমাবার জন্য এবং আমাদের দেশকে গরীব করের বোঝা থেকে মুক্ত করবার জন্য মূলধনের এই “ভক্ত সেবাইত” নিম্নোক্ত অনুমোদিত ব্যবস্থাটি প্রস্তাব করছেন, যেসব শ্রমিক সাধারণের সাহায্যের উপর নির্ভরশীল, অর্থাৎ যারা ভিখারী হয়ে গিয়েছে তাদের একটি আদশ কর্মনিবাস-এ আবদ্ধ করা হোক। এই আদর্শ কর্মনিবাসকে পরিণত করতে হবে একটি সন্ত্রাস আগারে” এবং এগুলিকে গরীবের আশ্রয়স্থল “যেখানে তারা যথেষ্ট খেতে পাবে, গরম ও ভদ্র পোষাক পাবে এবং যেখানে তাদের খুব কমই কাজ করতে হবে এমনটি করলে হবে না।[২২] এই সন্ত্রাস আগার”-এ, এই “আদর্শ স্থানে গরীবরা দিনে চোদ ঘণ্টা কাজ করবে যাতে খাওয়ার জন্যে যথাযোগ্য বিরতি দিয়েও বাবে ঘণ্টার ছকা শ্ৰম থাকে।[২৩]
