ধনিকের কাছে সাধারণভাবে যে অভিজ্ঞতা প্রকট হয় তা হচ্ছে সদাসর্বদা জনসংখ্যার একটি বাড়তি অংশ, অর্থাৎ এমন একটি অংশ যা মূলধনের শ্রম-বিশোষণের সাময়িক প্রয়োজনের তুলনায় বাড়তি,-যদিও সেই বাড়তি জনসংখ্যার মধ্যে রয়েছে কয়েক পুরুষের মানুষ। যাদের দেহ খবিত, আ, লুণ্ঠিত, যারা দ্রুতগতিতে একে অন্যকে স্থান করে দেয়। বলা যায় যে বিকশিত হবার আগেই যারা মুকুলে ঝরে যায়।[৭] বস্তুতঃ বুদ্ধিমান দর্শককে বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয় যে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন প্রণালী যার সূচনা ইতিহাসগত ভাবে এই সেদিন মাত্র হয়েছে, এই প্রণালীটি কেমন ক্ষিপ্রতার সঙ্গে শক্ত মুঠোয় জনগণের জীবনীশক্তির মূল পর্যন্ত ধরে ফেলেছে—দেখিয়ে দেয় কেমন করে শিল্পে নিযুক্ত জনসংখ্যার অধোগতিকে ঠেকিয়ে রাখছে গ্রামাঞ্চল থেকে আগত জনস্রোত যারা শারীরিক দিক থেকে তখনও কলুষিত হয়নি—দেখিয়ে দেয়, কেমন করে এই গ্রামাঞ্চলের শ্রমিকরা টাটকা হাওয়া পেলেও এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের নিয়ম, যা শুধু সবচেয়ে শক্তিশালীকেই বাঁচিয়ে রাখে তার অনুকূল প্রভাব সত্ত্বেও, তারা ইতিমধ্যে লোপ পেতে বসেছে।[৮] ধনতান্ত্রিক অবস্থায় ধনিকদের স্বার্থে চারদিকের অগণিত শ্রমিকের কষ্টভোগ সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব নেওয়া হয়, এর ধ্বজাধারীরা কার্যক্ষেত্রে মনুষ্যজাতির আসন্ন অধধাগতি ও শেষ পর্যন্ত অবলুপ্তিতে ঠিক ততখানি অথবা ততটুকুই বিচলিত হন, যতটা হন এই পৃথিবীটা সুর্যের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবার সম্ভাবনায়। ফাটকাবাজির প্রত্যেকটি জুয়োখেলায় প্রত্যেকেই জানে যে একদিন সর্বনাশ আসবেই, কিন্তু প্রত্যেকেই আশা করে যে সে ধনদৌলত আয়ত্ত করে নিরাপদ জায়গায় সরাবার পর তার প্রতিবেশীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে। আমি যদি বাচি, তবে বিশ্ব ধ্বংস হয় হোক। Apres_moi le deluge ! এইটি হচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকটি ধনিকের এবং সাধারণভাবে প্রত্যেকটি ধনিকজাতির মূলমন্ত্র। সেইজন্যই সমাজ বাধ্য না করলে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা শ্রমিকের স্বাস্থ্য অথবা পরমায়ু সম্পর্কে কিছুমাত্র তোয়াক্কা করে না।[৯] শারীরিক ও মানসিক অপোগতি, অকালমৃত্যু, অতিরিক্ত খাটুনির যন্ত্রণা ইত্যাদি নিয়ে চীৎকারের বিরুদ্ধে এরা জবাব দেয়। ওদের থেকে আমরা মুনাফা করি বলেই কি এইসব ব্যাপারে আমাদের ঝামেলা পোয়ানো উচিত? কিন্তু সমগ্রভাবে দেখলে এইসব-ই ব্যক্তিগতভাবে ধনকের সদিচ্ছা আছে কি নেই তার উপর নির্ভর করে না। অবাধ প্রতিযোগিতা ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের অন্তর্নিহিত নিয়মগুলিকে প্রকট করে,-এই নিয়মগুলি বাইরের বাধ্যতামূলক-বিধান হিসাবে প্রত্যেকটি ব্যক্তিগত ধনিকের উপর আধিপত্য বিস্তার করে।[১০]
স্বাভাবিক শ্রম-দিবসের প্রতিষ্ঠা হচ্ছে বহু শতাব্দী ব্যাপী মালিক ও শ্রমিকদের সংঘর্ষের ফল। এই সংগ্রামের ইতিহাসে দুটি পরস্পর-বিরোধী ধারা দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের যুগের ব্রিটিশ কারখানা-আইনগুলিকে চোদ্দ শতক থেকে আঠারো শতকের একেবারে মাঝামাঝি পর্যন্ত ব্রিটিশ শ্রম-সম্পর্কিত বিধানগুলির সঙ্গে তুলনা করুন।[১১] আধুনিক কারখানা-অইন যেখানে বাধ্যতামূলকভাবে শ্রম দিবসের পরিমাণ কমিয়েছে, পুর্ববর্তী আইনগুলি বাধ্যতামূলকভাবে ঐ সময় বাড়িয়েছে। সদ্যোজাত ধনতন্ত্র আত্মপ্রসারের সূচনায় যথেষ্ট পরিমাণ উত্ত শ্রম শোষণ করবার অধিকার পেয়েছিল কেবলমাত্র তখনকার অর্থনৈতিক সম্পর্কের জোরেই নয়, পরন্তু রাষ্ট্রের সাহায্যে, কিন্তু একথা সত্য যে সেদিনকার তাদের সেই সুবিধাকে নিতান্ত তুচ্ছ মনে হয় যখন দেখি যে উদীয়মান ও সংগ্রামশীল ধনতকে সাবালক অবস্থায় কিরকম সুবিধা ছাড়তে হয। বহু শতাব্দী কেটে যাবার পরে ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের প্রসারের ফলে স্বাধীন’ শ্রমিক তার গোট। কর্মজীবন তার নিজস্ব শ্ৰম ক্ষমতা বিক্রি করে দিতে রাজি হয়, অর্থাৎ সামাজিক অবস্থার চাপে প্রাণ ধারণের দ্রব্য-সামগ্ৰী মূল্য হিসাবে, কেবল পেটের খোরাকের জন্য নিজের জন্মগত অধিকার বিকিয়ে ঠিতে বাধ্য হয়। অতএব এটা স্বাভাবিক যে চোদ্দ শতকের মধ্যভাগ থেকে সতের শতকের শেষ পর্যন্ত ধনিকেরা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাবলীর মাধ্যমে পূর্ণবয়স্ক শ্রমিকদের শ্রম-দিবস দীর্ঘতর করবার যে চেষ্টা করত উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এখানে-ওখানে শ্রম-দিবসের হ্রস্বতা সাধিত হল। প্রায় একইভাবে রাষ্ট্রের দ্বারা, শিশুদের রক্ত থেকে ধনীর মুনাফা করা বন্ধ করবার জন্য। বর্তমান সময়ে দৃষ্টান্তস্বরূপ ম্যাসাচুসেট রাজ্যে, যেটি খুব সম্প্রতিকালেও উত্তর আমেরিকার সাধারণতন্ত্রের অঙ্গ রাজ্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বাধীন ছিল, সেখানেও বারো বছরের কম বয়সের শিশুদের জন্য শ্রমের যে আইনগত সীমা ঘোষণা করা হয়েছে, সতেরো শতকের মধ্যভাগে ইংল্যাণ্ডে সেইটাই ছিল সবলদেহ কারিগর, সুস্থদেহ শ্রমিক, শক্তসমর্থ কর্মকারদের স্বাভাবিক শ্রম-দিবস।[১২]
প্রথম “শ্রমিক বিষয়ক আইন” (তৃতীয় এডওয়ার্ড, ১৩, ১৩৪৯,)-এর তৎকালীন অজুহাত ছিল (এটা কারণ ছিল না, কারণ এই অজুহাত চলে যাবার পরও এই ধরনের আইন বহু শতাব্দী চলতে থাকে। এই যে প্লেগ মহামারীতে এত লোক-ক্ষয় হয় যে একজন রক্ষণশীল লেখক বলেন, “যুক্তিসঙ্গত শর্তে কাজ করবার জন্য লোক পাওয়া এত শক্ত (অর্থাৎ এমন মজুরি নিয়ে তারা কাজ করবে যাতে নিয়োগ-কর্তাদের জন্য যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ উদ্বৃত্ত শ্রম থাকে) হয়ে উঠেছে যে তা সহ্য করা যায় না।[১৩] অতএব আইন করে সঙ্গত মজুরি ও সেইসঙ্গে শ্রম-দিবসের পরিমাণ নিদিষ্ট হল। এই শেষোক্ত বিষয়, যেটি নিয়ে এখানে আলোচনা হচ্ছে, এটি পুনরুল্লিখিত হয়েছে ১৪৯৬ সালের আইনে (সপ্তম হেনরি )। সমস্ত কারিগর ও ক্ষেত-মজুরের জন্য মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই আইন অনুযায়ী শ্রম-দিবস ( কিন্তু এটিকে বলবৎ করা সম্ভব হয়নি। সকাল পাঁচটা থেকে আরম্ভ করে সন্ধ্যা সাতটা আটটা পর্যন্ত চলবে। কিন্তু খাবারের জন্য প্রাতঃরাশের একঘণ্টা, ডিনারের দেড়ঘণ্টা ও মধ্যাহ্নকালীন আধঘণ্ট। ছুটি থাকবে, অর্থাৎ বর্তমান সময়ে কারখানা-আইনে নির্দিষ্ট ছুটির ঠিক দ্বিগুণ।[১৪] শীতকালে সকাল পাচটা থেকে অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত কাজ চলবে স্থির হয় এবং শ্রম-বিরতি একই রকম থাকে। এলিজাবেথের ১৫ ৭২ সালের একটি আইন “দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরিতে নিযুক্ত” সমস্ত শ্রমিকের দৈনিক শ্রমের সময় স্পর্শ না করে গ্রীষ্মে শ্রম-বিরতিকে আড়াই ঘণ্টা করতে চেয়েছেন অথবা শীতকালে দুই ঘণ্টা মাত্র। মধ্যাহ্নভোজন এক ঘণ্টার করতে চেখেছেন অথবা শীতকালে দুই ঘণ্ট! মাত্র। মধ্যাহ্নভোজন এক ঘণ্টার মধ্যে শেষ করতে হত এবং “আধঘণ্টার বৈকালীন নিদ্রা কেবলমাত্র মে মাসের মাঝামাবি থেকে আগষ্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত অনুমোদিত ছিল। প্রত্যেক ঘণ্টা অনুপস্থিতির জন্য মজুরি থেকে এক পেনি কাটা যেত। কার্যক্ষেত্রে আইনের শর্তের চেয়ে শ্রমিকদের অবস্থা অনেক ভাল ছিল। উইলিয়ম পেটি যাকে অর্থবিজ্ঞানের জনক এবং কতকাংশে সংখ্যাতত্ত্বেরও প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়, তিনি সপ্তদশ শতকের শেষ তৃতীয়াংশে প্রকাশিত এক রচনায় বলেন : “মেহনতি মানুষ (তখনকার দিনে অর্থ ছিল কৃবিশ্রমিক। দৈনিক দশ ঘণ্টা কাজ করে এবং সপ্তাহে কুডিবার খায়, যথা কাজের দিনে তিনবার ৩০ রবিবার দুবার; এর থেকে বোঝা যায় যে যদি তারা শুক্রবার রাত্রে উপবাস করে এবং বেলা এগারোটা থেকে একটা পর্যন্ত দুঘণ্টা ভোজনের সময় না নিয়ে যদি ১২ ঘণ্ট। মাত্র নেয়, অর্থাৎ ২ ভাগ বেশি কাজ করে ও ২ ভাগ কম খরচ করে, তাহলে উল্লিখিত ট্যাক্স তোলা সম্ভব।[১৫] ডাঃ এণ্ড, উরে যখন ১৩৩৩ সালের বারে। ঘণ্ট। আইনের প্রস্তাবকে নিন্দা করে বলেছিলেন যে অন্ধকারাচ্ছন্ন মধ্যযুগের দিকে পিছিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন কি তিনি ঠিকই বলেন নি? একথা সত্য যে পেটির বর্ণিত আইনের শর্তগুলি শিক্ষা-নবীশদের সম্পর্কেও প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু সপ্তদশ শতকের শেষ দিকেও শিশুদের শ্রমের অবস্থা সম্পর্কে নিম্নলিখিত অভিযোগ থেকে পাওয়া যায়। তাদের দেশে (জার্মানিতে) আমাদের এই দেশের মত শিক্ষা নবীশকে সাত বছর শত-বদ্ধ করে রাখার প্রথা নেই; ওদের দেশে তিন বা চার বছর-ই হচ্ছে চতি প্রথা এবং এর কারণ হচ্ছে এই যে এরা জন্মাবার পর থেকেই কাজ করতে শেখে যাতে তাদের নিপুণ ও আজ্ঞাবহ করে তোলে এবং ফলতঃ তারা বেশি তাড়াতাড়ি পূর্ণ কুশলতা লাভ করে ও কাজকর্মে পটু হয়ে ওঠে। আর আমাদের তরুণ বয়স্করা এই ইংল্যাণ্ডে শিক্ষা-নবীশ হবার আগে কোন শিক্ষাই না পেয়ে শেখে খুব আস্তে আস্তে এবং সেই জন্য কুশলী শিল্পীর সর্বাঙ্গীন উৎকর্য অর্জন করতে তাদের অনেক বেশি সময় লাগে।[১৬]
