একটি ইস্পাত ও লোহার কারখানা যেখানে পূর্ণবয়স্ক ও বালক মিলে তিন হাজার লোক খাটে এবং যেখানকার কাজকর্ম অংশতঃ যেমন, লোহ ও ইস্পাতের ভারি ভারি কাজ, দিনরাত পালা করে চলে সেই কারখানার মালিক জন ব্রাউন কোম্পানীর মিঃ জে, এলিস বলেছেন “ইস্পাতের ভারি কাজ এক কুড়ি বা দু কুড়ি পূর্ণবয়স্ক লোকের সঙ্গে একটি বা দুটি বালক কাজ করে। তাদের কারবারে ১৮ বছরের কম বয়সের পাচশর বেশি বালক কাজ করে, যাদের তিন ভাগের এক ভাগ অথবা ১৭০ জনের বয়স তেরো-র নীচে। আইনের প্রস্তাবিত পরিবর্তন সম্পর্কে মিঃ এলিস বলেন : “আঠারো বছরের বয়সের কোন ব্যক্তিকে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বারো ঘণ্টার বেশি কাজ করানো হবে না, এতে আপত্তি করবার বিশেষ কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু রাতের কাজে বালকদের বাদ দেওয়া সম্পর্কে আমরা মনে করি না যে বারো বছর বয়স পর্যন্ত কোন সীমা নির্দেশ করা যায়। কিন্তু রাতের কাজে একেবারে বালকদের নেওয়া যাবে না এই অবস্থার চেয়ে আমরা বরং চাই যে তেরো বছরের নীচে অথবা এমনকি চোদ্দ বছর পর্যন্ত বালকদের নিয়োগ বন্ধ করা চলতে পারে। যে-সব বালক দিনের পালায় কাজ করে তাদের সময়মত রাতের পালাতেও কাজ করতে হয়, কারণ শুধু বয়স্কদের দিয়ে রাতের কাজ চলে না, এতে তাদের স্বাস্থ্য নষ্ট হবে…… কিন্তু আমরা মনে করি যে এক সপ্তাহ ছাড় দিয়ে দিয়ে রাতের কাজ ক্ষতিকর নয়। (নের অ্যাও ভিকার্স’ অপরপক্ষে তাঁদের কারবারের স্বার্থেই মনে করেছেন যে অবিরাম রাতের কাজের চেয়ে পালা করে ছাড় দিয়ে রাতে কাজ করানো সম্ভবত বেশি ক্ষতিকর)। পুর্ণবয়স্ক যারা এই কাজ করে এবং অপর যারা শুধু দিনের বেলাতেই কাজ করে তাদের উভয়কেই আমরা দেখতে পাচ্ছি……..আঠারো বছরের কম বয়সের বালকদের রাতে কাজ করতে না দেওয়া সম্পর্কে আমাদের আপত্তির কারণ হচ্ছে যে এতে খরচ বাড়বে, এবং এইটাই একমাত্র কারণ। (কী নির্মম সরলতা !) আমরা মনে করি যে আমাদের কারবারকে সফলভাবে পরিচালনা করতে হলে খরচের এই বৃদ্ধি আমল ঠিক ঠিক বহন করতে পারিনা। (কেমন গালভরা কথা )! এখানে শ্রমিক দুর্লভ, এবং যদি এরকম নিয়ন্ত্রণ হয় তাহলে শ্রমিকের অভাব হতে পারে।” (অর্থাৎ এলসি ব্রাউন কোং এমন মারাত্মক দুর্বিপাকে পড়তে পারেন যে-অবস্থায় শ্রমশক্তির পূর্ণ-মূল্য দিতে তারা বাধ্য হবেন)।[৯]
মেসার্স ক্যামেল এণ্ড কোম্পানির সাইক্লপস ইস্পাত ও লৌহ কারখানা হচ্ছে পূর্বোক্ত জন ব্রাউন কোম্পানি পরিচালিত কারবারের মতই বৃহৎ আয়তনের। কোম্পানির ম্যানেজিং ডাইরেক্টর লিখিতভাবে সরকারি কমিশনার মিঃ হোয়াইট-এর কাছে তার সাক্ষ্য দাখিল করেন। পরে অবশ্য পাণ্ডুলিপিটি দেখে দেবার জন্য তাকে ফেরৎ দেওয়া হলে তিনি ঐটি লুকিয়ে ফেলাই সুবিধাজনক মনে করেন। কিন্তু মিঃ হোয়াইটের স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো। তিনি স্পষ্ট মনে রাখেন যে সাইক্লাপ কোম্পানিটির মতে শিশুদের ও তরুণদের রাতের শ্রম নিষিদ্ধ করা অসম্ভব ব্যাপার হবে, তাতে কার্যতঃ কারখানাই বন্ধ করে দেওয়া হবে।” তবু তাদের কারবারের নিযুক্ত লোকের মধ্যে আঠারো বছরের নীচে বয়ঃক্রম শতকরা ছজনের কিছু বেশি এবং তেরো বছরের নীচে বয়ঃক্রম শতকরা একজনেরও কম।[১০]
ঐ একই বিষয়ে এটারক্লিফের ইস্পাতের বোলিং মিল ও ফোর্জের কারবারী ‘স্যাণ্ডারস ব্রাদার্স কোম্পানির মিঃ ই. এফ স্যাণ্ডারসন বলেন : আঠারো বছরের কম বয়সের তরুণদের রাতের কাজ নিষিদ্ধ হলে মহামুশকিল হবে। সবচেয়ে বেশি মুশকিল হবে এই যে বালকের বদলে পূর্ণবয়স্কদের নিয়োগ করলে খরচ বাড়বে। এই বৃদ্ধি কতটা হবে তা আমি বলতে পারি না কিন্তু সম্ভবত এমন হবে যার দরুণ কারবারীরা। ইস্পাতের দাম বাড়াতে পারবে না এবং সেজন্য এটি কারবারীদের ঘাড়েই চাপবে, অবশ্য এই ক্ষতির জন্য কোন লোকই (কী অদ্ভুত প্রকৃতির লোক!) দাম দিতে চাইবে না।” মিঃ স্যাণ্ডারসন্ শিশুদের কত মজুরি দেওয়া হয় তা জানেন না, কিন্তু সম্ভবতঃ কম বয়সের বালকেরা সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ শিলিং পায়-বালকদের কাজের প্রকৃতি হচ্ছে এই রকম যার জন্য সাধারণত (সাধারণত মানে অবশ্য সর্বদা নয় ) বালকদের শক্তিই বেশ যথেষ্ট এবং সেইজন্য পূর্ণবয়স্কদের বেশি থেকে এমন কিছু লাভ হবে না যা দিয়ে ক্ষতিপূরণ করা যাবে অথবা এমন কয়েকটি ক্ষেত্রেই তা করা যাবে। যেখানে ধাতু খুব ভাবি। পূর্ণবয়স্করা তাদের অধীনে বালকদের না থাকা পছন্দ করে না কারণ ঐ জায়গার পূর্ণবয়স্করা ততখানি বংশবদ হবে না। তা ছাড়াও বালকদের খুব কম বয়স থেকেই শিল্পের শিক্ষা আরম্ভ হওয়া দরকার। বালকদের জন্য শুধু দিনের কাজ নির্দিষ্ট থাকলে এই উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।” কেন হয় না? কেন দিনের বেলা তাদের কাজ থেকে বালকরা শিখতে পারে না? আপনারা কারণ বলুন? “পূর্ণবয়স্করা পালা করে এক সপ্তাহে দিনে এবং পরের সপ্তাহে রাতে কাজ করার জন্য অর্ধেক সময় তাদের বালকদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে এবং তাদের দরুন প্রাপ্য অর্ধেক লাভ হারাবে। শিক্ষানবীশকে যে শিক্ষা তারা দেয়, বালকদের শ্রমের মজুরির অংশ সেদিক দিয়ে তাদের প্রাপ্য। বলে বিবেচিত হয় এবং এইভাবে পূর্ণবয়স্করা সস্তাদরে বালকদের খাটাতে পারে। প্রত্যেক বয়স্ক ব্যক্তিই এই লাভের অর্ধেক চায়।” অর্থাৎ এই প্রথা রহিত হলে পূর্ণবয়স্কদের মজুরির একাংশ বালকদের রাতের কাজ থেকে না এসে স্যাণ্ডারসনদের-ই দিতে হবে। অতএব স্যাণ্ডারসদের লাভ কিছুটা কম হবে এবং এইটাই হচ্ছে সদাশয় স্যাণ্ডারসনদের যুক্তি, যাতে তারা বলেছেন বালকেরা দিনের বেলায় শিল্প শিক্ষা করতে পারে না।[১১] এ ছাড়াও রাতের কাজ বালকরা না করলে, সেটা যারা দিনে কাজ করে তাদেরই ঘাড়ে চাপবে এবং তারা এটি সহ্য করতে পারবে না। বস্তুতঃ অসুবিধা এত বাড়বে যে তাদের হয়ত রাতের কাজ একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে এবং ই. এফ. স্যাণ্ডারসন বলেছেন, “আমাদের শিল্পের সঙ্গে যতটা সম্পর্ক আছে, তাতে ব্যাপারটা মানিয়ে নেওয়া যেত কিন্তু।” কিন্তু স্যাণ্ডারসনদের ইস্পাত তৈরি ছাড়াও আরো কিছু করতে হয়। ইস্পাত তৈরি হচ্ছে উদ্ধও কেবল মূল্য সৃষ্টির একটি অজুহাত। লোহা গলাবার ফার্নেস, বোলিং মিল প্রভৃতিকে কারখানার বাড়ি, যন্ত্রপাতি, লোহা, কয়লা ইত্যাদিকে কেবল ইম্পাতে পরিণত করা ছাড়া নিজেদেরকে আরও কিছু করতে হয়। তার বাড়তি শ্ৰম শোষণ করার কাজে লাগে এবং স্বভাবতই চব্বিশ ঘণ্টায় বারো ঘণ্টার চেয়ে বেশি শোষণ করে বস্তুতঃ তারা ঈশ্বর ও আইনের অনুগ্রহে কিছু লোককে দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই খাটানোর দরুন স্যাণ্ডারসনদের একটি টাকার অংক উপহার দেয় এবং যে মুহূর্ত তাদের শ্রম-শোষণের কাজটি ব্যাহত হয়, তখনই তারা মূলধনের চরিত্র হারায় এবং সেইজন্য স্যাণ্ডারসনদের নিছক ক্ষতি হয়। কিন্তু তাহলে অত সব দামী দামী যন্ত্রপাতি অর্ধেক সময় বন্ধ থাকার জন্য ক্ষতি হবে এবং বর্তমান ব্যবস্থায় আমরা যে পরিমাণ কাজ করতে পারছি সেই পরিমাণ কাজ করতে কারখানা ও যন্ত্রপাতি দ্বিগুণ করতে হবে, যার ফলে নিয়োজিত মূলধনকেও দ্বিগুণ করতে হবে। স্যাণ্ডারসনের এমন একটি সুবিধা চাইছেন যেটি অন্যান্য ধনিক যারা শুধু দিনে কাজ চালায় এবং তার ফলে যাদের বাডি, যন্ত্রপাতি, কঁচামাল রাত্রে অলস ভাবে পড়ে থাকে, তারা পান না? ই এফ, স্যাণ্ডারসন সমস্ত স্যাণ্ডারসনদের হয়ে এই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন : “একথা সত্য যে-সব কারখানা শুধু দিনে চলে তাদের যন্ত্রপাতি রাতে বন্ধ থাকার জন্য ক্ষতি হয়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে ফার্নেস এর ব্যবহারে একটি ক্ষতি হয়। যদি ফার্নেসকে চালু রাখতে হয় জ্বালানির অপচয় হবে ( এখন তার জায়গায় শ্রমিকের প্রাণশক্তির অপচয় হচ্ছে মাত্র), এবং যদি চালু বাধা না হয় তাহলে নূতন করে আগুন দিযে উত্তপ্ত কবতে অনেক সময়ের অপচয় হবে (যে-ক্ষেত্রে এমনকি আট বছরের শিশুব পর্যন্ত ঘুমের সময়ের ক্ষতি হচ্ছে। স্যাণ্ডারসনদের পক্ষে শ্রম-সমযের দিক দিয়ে লাভ ) এবং ফার্নেসগুলিও তাপমাত্রার কম বেশি হওয়ার ফলে জখম হবে।’ {যেন ঐ ফার্নেসগুলি দিনরাত শ্রমের পরিবর্তনের ফলে কিছুই পরিবর্তন হয় না)।[১২]
