শিল্পের কতকগুলি শাখায় তরুণী ও বয়স্কা নারীরা সারারাত ধরে কাজ করে পুরুষদের সঙ্গে।[২]
নৈশ শ্রমের সাধারণ ক্ষতিকর প্রভাবের কথা এক পাশে সরিয়ে রাখলেও,[৩] উৎপাদন-প্রক্রিয়ার স্থায়িত্বকাল-বিরতিহীন ২৪ ঘণ্টা-স্বাভাবিক শ্রম-দিবসের মাত্রাকে ছাড়িয়ে যাবার খুবই প্রীতিকর সুযোগ সৃষ্টি করে, যেমন উল্লিখিত শিল্পগুলিতে, যেগুলি অত্যধিক ক্লান্তিকর প্রকৃতির; প্রত্যেকটি শ্রমিকের পক্ষে একটি সরকারি এমদিবস মানে দিনে বা রাতে ১২ ঘণ্টা। কিন্তু এই পরিমাণেরও অতিরিক্ত উপরি-খাটুনি অনেক ক্ষেত্রেই, ইংল্যাণ্ডের সরকারি রিপোর্ট অনুসারেই, “সত্যিই ভয়ংকর”।[৪]
রিপোর্টে আরও আছে যে “এটা অসম্ভব যে, নীচে যে-কাজের পরিমাণের কথা বলা হয়েছে, ৯ থেকে ১২ বছরের বালকেরা তা সম্পাদন করে, এটা জানার পরে কোনো মানুষই এই সিদ্ধান্তে না এসে পারে না যে, মাতা-পিতা ও নিয়োগ-কর্তাদের হাতে এমন ভাবে ক্ষমতা অপব্যবহারের অধিকার আর থাকতে দেওয়া যায় না।”[৫]
“দিনে ও রাতে বালকদের নিয়োগের ব্যাপারটি হয় সাধারণ কাজের ধারাতেই অথবা অতিরিক্ত চাপের সময়ে প্রায়ই অবশ্যম্ভাবী তাদের দীর্ঘ সময় খাটাবার পথ খুলে দেয়। বস্তুতঃ শ্রমের এই দীর্ঘ সময় শিশুদের পক্ষে নির্মম ও অবিশ্বাস্যভাবে দীর্ঘ। প্রায়ই দেখা যায় যে কোন না বোন কারণে এক বা একাধিক বালক কাজে অনুপস্থিত থাকে। এরকম ঘটনা ঘটলে, তাদের স্থানে পরের শিফটে যারা কাজ করে তাদের মধ্যে থেকে এক বা একাধিক বালককে দিয়ে কাজ চালানো হয়। এটি স্পষ্ট যে এই পদ্ধতি সম্পর্কে সকলেই ভাল করে জানেন: …… যেমন আমার প্রশ্নের জবাবে সে অনুপস্থিত বালকদের কাজ কে করে, একটি বড় রোলিং-মিলের মালিক বললেন ‘মশায়, সেকথাতো আপনি ও আমি দুজনেই ভালমত জানি’ এবং বাস্তব ঘটনাটি তিনি স্বীকার করলেন।”[৬]
“একটি রোলিং মিলে যেখানে শ্রমের নিয়মিত সময় হচ্ছে সকাল ছ’টা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত, যেখানে একটি বালককে প্রতি সপ্তাহে প্রায় চার রাত্রি অন্ততঃ সাড়ে আটটা পর্যন্ত কাজ করতে হত এবং এটি ছ’মাস চলে। আর একজন নবছর বয়সের বালক কখনো কখনো একসঙ্গে পর পর তিনটি বানো ঘণ্টার শিফটে কাজ করত এবং দশ বছর বয়সে সে দুদিন ও দুরাত একাদিক্রমে কাজ করে।” তৃতীয় আর একজন, “এখন বয়স দশ বছর……সে সকাল ছটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত তিন রাত কাজ করে এবং বাকি রাতগুলিতে রাত নয়টা পর্যন্ত কাজ করে।” “আর একজন তেরো বছরের বালক…….সন্ধ্যা ছটা থেকে পরদিন বেলা বারোটা পর্যন্ত কাজ করত, এইভাবে এক সপ্তাহ কাজ করতে হত এবং কখনো কখনো একাদিক্রমে তিন শিফটে কাজ করতে হত, যথা সোমবার বিকেল থেকে মঙ্গলবার রাত্রি পর্যন্ত।” “আর একজন যার বয়স এখন বারো বছর, সে স্টেভলির একটি কাউন্টিতে একাদিক্রমে একপক্ষকাল সকাল ছটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত কাজ করে, তারপর আর তার কাজ করার ক্ষমতা ছিল না।” জর্জ অ্যালিনসওয়ার্থ, বয়স নয় বছর গত শুক্রবার এখানে সেলার বয় (celler boy) হিসাবে কাজ করতে আসে; পরদিন ভোরে রাত তিনটায় আমাদের আবার শুরু করতে হয়, সেইজন্য আমি সারা রাত ঐখানেই থাকি। আমার বাড়ি পাঁচ মাইল দূরে। উপরে চুল্লী, সেই ঘরের মেঝেতে ঘুমাই, নীচে অ্যাপ্রনটি পাতি, গায়ে শুধু জ্যাকেটটা ঢাকা থাকে। আর দুদিন আমি সকাল ছটায় এখানে এসেছি। হ্যা ! এখানে গরম। এখানে আসবার আগে আমি প্রায় এক বছর গ্রামাঞ্চলে অন্যান্য কারখানায় এই একই কাজ করেছি। সেখানেও শনিবার ভোর রাতে তিনটার সময় কাজ শুরু করতাম—সর্বদাই তাই করতে হয়। কিন্তু সেখানে বাড়ি ছিল কাছেই এবং বাড়িতে ঘুমোতে পারতাম। বাকি দিন গুলিতে সকাল ছটায় কাজ আরম্ভ করে সন্ধ্যা ছটা কিংবা সাতটায় কাজ ছাড়তে হতো।” ইত্যাদি[৭]
এখন এই চব্বিশ ঘণ্টা কাজের প্রথা সম্পর্কে ধনিকদের বক্তব্য শুনুন। এই প্রথার বাড়াবাড়ি পদ্ধতিগুলি, নির্মম ও অবিশ্বাস্য ভাবে শ্রম-দিবসকে বাড়িয়ে এর অপব্যবহার সম্পর্কে স্বভাবতই এরা একেবারেই নীরব থাকেন। ধনিকরা এই প্রথার ‘স্বাভাবিক রূপ সম্পর্কে-ই শুধু বলেন।
ইস্পাত নির্মাতা নেলর অ্যাণ্ড ভিকার্স ছশ থেকে সাতশ লোক খাটান যাদের মধ্যে শতকরা দশজনের বয়স আঠারো বছরের নীচে এবং তাদের মধ্যে আবার মাত্র কুড়ি জন আঠারো বছরের কম বয়সের ছেলে রাত্রের দলে কাজ করত, এই মালিকেরা বলছেন : “ছেলেদের উত্তাপের জন্য কোন কষ্ট পেতে হয় না। তাপমাত্রা সম্ভবতঃ ৮৬° থেকে ৯০°……ফোর্জ ও বোলিং মিলগুলিতে শ্রমিকেরা পালা করে দিনরাত কাজ করে কিন্তু বাকি সব কাজ কেবল দিনে-ই হয়, অর্থাৎ সকাল ছটা থেকে সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত। ফোর্জে কাজ চলে বারোটা থেকে বারোটা পর্যন্ত। কিছু শ্রমিক সব সময়ই রাতে কাজ করে, তাদের দিন ও রাতে পালা করে খাটানো হয় না এবং যারা নিয়মিতভাবে রাতে এবং নিয়মিতভাবে দিনে কাজ করে তাদের স্বাস্থ্যে আমরা কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করিনা সম্ভবতঃ পালাক্রমে বিশ্রামের সময় বদল না হলেই ঘুম ভালো হয় প্রায় কুড়ি ‘জন আঠারো বছরের কম বয়সের বালক রাতের পালায় কাজ করে।
. ‘আঠারো বছরের কম বয়সের ছেলে ছাড়া আমরা রাতের কাজ ভালভাবে চালাতে পারি না। আপত্তির কারণ এই যে তা না হলে পড়তা বেড়ে যায়……. প্রত্যেকটি বিভাগে কুশলী শ্রমিক এবং যথেষ্ট সংখ্যক লোক পাওয়া শক্ত কিন্তু বালকদের প্রচুর সংখ্যায় পাওয়া যায়। কিন্তু যে রকম অল্প হারে আমরা বালকদের নিয়োগ করি তাতে এই বিষয়টি। অর্থাৎ রাতের কাজে নিষেধ ) আমাদের পক্ষে বিশেষ গুরুত্ব বা চিন্তার ব্যাপার নয়।”[৮]
