নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব রকমের পেশা ও বয়সের শ্রমিকদের এই পাঁচ-মিশালি ভিড়, যা ইউলিসের উপরে নিহতদের আত্মাদের চেয়েও ঢের বেশি ব্যস্ত ভাবে আমাদের উপরে চাপ দিচ্ছে, যাদের বগলের তলায় ব্লু বুক ছাড়াও একমাত্র চেহারা থেকেই এক নজরে চোখে পড়ে অতিরিক্ত খাটুনির চিহ্ন, তাদের মধ্য থেকেই নেওয়া যাক আরো দুটি দৃষ্টান্ত, যাদের মধ্যেকার জাজ্বল্যমান প্রতিতুলনা প্রমাণ করে দেয় যে, মূলধনের কাছে সব মানুষই সমান : যেমন একজন দর্জি ও একজন কামার।
১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দের জুন মাসের শেষ সপ্তাহে লণ্ডনের সমস্ত দৈনিক পত্রিকায় ‘চাঞ্চল্যকর শিরোনাম ‘শুধু অতিরিক্ত খাটুনি থেকে মৃত্যু’-এর নীচে একটি খবর প্রকাশিত হয়। এতে সূচী-শিল্পী কুড়ি বৎসর বয়স্কা মেরি এ্যান ওয়ালি-র মৃত্যু সংবাদ ছিল, এই মেয়েটি একটি নামকরা পোশাক-তৈরি প্রতিষ্ঠানে কাজ করত এবং সেখানে এলিস এই ঐতিসুখকর নামধারিনী এক মহিলা দ্বারা শোষিত হত। সেই পুরাতন, অনেক বার বলা কাহিনীর আরও একবার পুনরাবৃত্তি ঘটল।[২৬] এই মেয়েটি গড়ে ১৬ ঘণ্টা কাজ করত, মরশুমের সময় তাকে বিরামহীনভাবে প্রায়ই তিরিশ ঘণ্টা খাটতে হত। এবং তখন তার মুহ্যমান শ্রমশক্তিকে মাঝে মাঝে শেরি, পোর্ট অথবা কফি দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করা হত। ঠিক এই সময়টিই ছিল ওয়েলসের মরশুমের সবচেয়ে বেশি কাজের হিডিক। নূতন আমদানি করা রাজপুত্রবধূর সম্মানে আহূত অভিজাত মহিলাদের জন্য চক্ষের নিমেষে জমকালো পোশাক তৈরি করা দরকার হয়ে পড়ল। মেরি এ্যান ওয়াক্লি বিনা বিশ্রামে আরও ষাট জন বালিকার সঙ্গে সাডে ছাব্বিশ ঘণ্টা কাজ করেছিল, তিরিশ জন মিলে এমন একটি ঘরে যেখানে প্রয়োজনীয় ঘনফুট হাওয়ার মাত্র এক তৃতীয়াংশ ছিল। শোবার ঘরটি বোর্ড দিয়ে ভাগ করে যে শ্বাসরোধকারী গর্তগুলি তৈরি হয়েছিল, তারই একটিতে রাত্রি বেলা তারা জোড়ায় জোড়ায় ঘুমোত।[২৭] এবং এইটিই ছিল লণ্ডনে পোশাক তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান। মেরি এ্যান ওয়ালি শুক্রবার অসুস্থ হল এবং তার হাতের কাজ শেষ না করার দরুন মাদাম এলিসকে বিস্মিত করে রবিবারে মারা গেল। মি. কীজ, যাকে ডাক্তার হিসেবে মৃত্যুশয্যার পাশে বড় দেরি করেই ডাকা হয়েছিল, তিনি কাবোনারের আদালতে জুরির সামনে যথারীতি সাক্ষ্য দিলেন যে, ‘মেরি এ্যান ওয়ালি একটি ঠাসাঠাসি কাজের ঘরে দীর্ঘ সময় কাজ করে এবং একটি অত্যন্ত ছোট ও স্বল্প হাওয়াযুক্ত শোবার ঘরে থাকার ফলে মারা গেছে। এরও পরে কারোনারের জুরি ডাক্তারকে ভদ্র রীতি-নীতিতে শিক্ষা দেবার জন্যে রায় দিলেন যে মৃত ব্যক্তি সন্ন্যাস রোগে মারা গিয়েছে কিন্তু এমন মনে করবার কারণ আছে যে একটি ঠাসাঠাসি কাজের ঘরে অতিরিক্ত খাটুনি তার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে থাকতে পারে, ইত্যাদি। স্বাধীন বাণিজ্যের প্রবক্তা করনে ও ব্রাইটের পত্রিকা ‘মর্নিংস্টার’ তীব্র ভাষায় লিখল, ‘আমাদের সাদা চামড়ার গোলামরা যারা খাটতে খাটতে মরে, এই সাদা গোলাম বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নীরবে শুকিয়ে মরে।[২৮]
শুধু পোশাক-নির্মাতাদের ঘরেই খাটতে খাটতে মরে যাওয়াটা একটা রেওয়াজ নয়, পরন্তু আরও হাজার জায়গায় একই ব্যাপার ঘটে; আমি প্রায় বলে ফেলেছিলাম যে সব ক্ষেত্রে ফলাও কারবার করতে হয় তাদের প্রত্যেকটিতেই : দৃষ্টান্ত হিসাবে আমরা একজন কামারের কথা বলব। কবিদের উক্তি যদি সত্যি হয়, তাহলে কামারের মতো এমন হাসি-খুশি ও সদানন্দ লোক আর নেই; সে ভোরে উঠে সূর্যোদয়ের আগেই আগুনের ফুলকি ওডায়; তার মতো করে আর কোন মানুষ-ই ভোজন ও পান করে বা নিদ্রা যায় না। বস্তুতঃ শারীরিক দিক দিয়ে কাজটা সীমাবদ্ধ থাকলে কামার অন্যান্য মানুষদের তুলনায় ভালই থাকে। কিন্তু যদি আমরা তাকে অনুসরণ করে নগরে বা শহরে যাই এবং এই শক্ত-সমর্থ লোকটির উপর খাটুনির প্রভাব লক্ষ্য করি। তাহলে দেশের মৃত্যুর হারের মধ্যে তার অবস্থান কোথায় দেখা যায়? মেরিলিবোনে কামারের প্রতি বছর মারা যায় প্রতি হাজারে একত্রিশ জন অর্থাৎ গোটা দেশে পূর্ণবয়স্ক পুরুষদের গড় হারের চেয়ে এগারো বেশি। এই পেশাটি, মানবিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে যা প্রায় প্রবৃত্তিগত এবং মানুষের উদ্যোগসমূহের মধ্যে যে শিল্পে আপত্তিকর কিছু নেই, সেটি কেবল অতিরিক্ত খাটুনির কারণেই মানুষের হত্যাকারী হয়ে উঠেছে। কামার দিনে নিদিষ্টসংখ্যক আঘাত করতে পারে, নির্দিষ্ট-সংখ্যক পদক্ষেপ করতে পারে, তার শ্বাস প্রশ্বাসের সংখ্যাও নির্দিষ্ট, সে এতটা কাজ করতে পারে এবং ধরা যাক গড়ে ৫৬ বছর বাঁচতে পারে, কিন্তু তাকে দিয়ে আরও বেশিবার হাতুডির আঘাত করানো হয়, আরও অনেক বেশি পদক্ষেপ করানো হয়, প্রতিদিন অনেক বেশিবার শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে এবং তার জীবনকে মোট এক-চতুর্থাংশ বৃদ্ধি করতে বাধ্য করা হয়। সে এই চাহিদাপূরণ করে; ফল হয় এই যে কিছুকাল পর্যন্ত এক-চতুর্থাংশ বেশি কাজ উৎপাদন করে সে ৪০ বছরের বদলে ৩৭ বছরে মারা যায়।[২৯]
————
১. কল মালিকদের অর্থ-লালসা, লাভের সন্ধানে যাদের নিষ্ঠুরতাগুলিকে সোনার সন্ধানে আমেরিকা-জয়ের পরে স্পেনিয়াতদের দ্বারা অনুষ্ঠিত নিষ্ঠতাগুলিও ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।” John Wade, History of the middle and working classes, 3rd. Ed. London, 1835, p 114. এটা রাষ্ট্রিয় অর্থনীতির একখানা বই; সেই সময়ের বিচারে, বইখানার তাত অংশ কতগুলি বিষয়ে, যেমন বাণিজ্যিক সংকটের বিষয়ে, মৌল চিন্তার পরিচায়ক। ইতিহাস সংক্রান্ত অংশটি অবশ্য স্যার এফ এম ইডেন-এর “The State of the poor”, লণ্ডন, ১৭৯৭, থেকে নির্লজ্জভাবে চুরি করা।
