এমনকি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীও এইসব কম-দামের কটিওয়ালাদের অবস্থা বোঝেন। “শ্রমিকদের মজুরি-বঞ্চিত শ্রমকেই এখানে পরিণত করা হয়েছে এই প্রতিযোগিত চালাবার বৎসর।[১৮] এবং পুরো-দাম’ এর রুটিওয়ালার তদন্ত কমিশনের কাছে তাদের কম দামের প্রতিযোগীদের এই বলে নিন্দা করেন যে ওরা বিদেশীদের শ্রম চুরি করে এবং ভেজাল দেয়। তারা বেঁচে আছে শুধু প্রথমতঃ জনসাধাণকে ঠকিয়ে এবং দ্বিতীয়ত তাদের শ্রমিকদের বারো ঘণ্টার মজুরি দিয়ে আঠারো ঘণ্টা খাটিয়ে।”[১৯]
রুটিতে ভেজাল দেওয়া শুরু হয় এবং পুরোদামের চেয়ে কমে রুটি বিক্রি করে এই ধরনের এক শ্রেণীর মালিকের উদ্ভব ঘটে আঠার শতকের গোড়ার দিক থেকে, সেই সময় থেকে যখন এই ব্যবসার যৌথ চরিত্র নষ্ট হয়ে যায় এবং নামেমাত্র মালিক রুটিওয়ালার পিছনে ময়দা-কলের মালিকের আকারে ধনিকের আবির্ভাব ঘটে।[২০] এই ভাবেই এই শিল্পে ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের ভিত্তি রচিত হয় শ্রম-দিবসের অপরিমিত প্রসার ও রাত্রিকালীন শ্রম চলতে থাকে, যদিও এই শেষের ব্যাপারটি শুধুমাত্র ১৮২৪ সালের পর থেকেই পাকাপাকি ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, এমন কি লণ্ডনেও।[২১]
এ পর্যন্ত যা বলা হয়েছে, তা থেকে বোঝা যায় যে, কমিশনের রিপোর্টে রুটি ওলাদের ঠিকা-মজুরদের স্বল্পায়ু শ্রমজীবীদের শ্রেণীতে ধরা হয়েছে, যারা শ্রমিক। শ্রেণীর শিশুদের স্বাভাবিক মৃত্যুতে সৌভাগ্যক্রমে এড়াতে পারলেও ৪২ বছরের বেশি বড় একটা বাঁচে না। তবু রুটি সেঁকার শিল্পে সর্বদাই কর্মপ্রার্থীদের ভিড় থাকে। লণ্ডন শহরে এই শ্রমশক্তির যোগান আসে স্কটল্যাণ্ড এবং ইংল্যাণ্ডের পশ্চিমাংশের কৃষিজীবী জেলা এবং জার্মানি থেকে।
১৮৫৮ থেকে ৮৬০ পর্যন্ত বছরগুলিতে আয়াল্যাণ্ডের রুটিওয়ালাদের ঠিকা-মজুররা নিজেজের খরচে রাত্রিকালীন ও রবিবারের কাজের বিরুদ্ধে বড় বড় সভার অনুষ্ঠান করে। যেমন ১৮৬০ সালের মে মাসের ডাবলিন সভায় সাধারণ মানুষ আইরিশ সুলভ উদ্দীপনার সঙ্গে অংশ গ্রহণ করেন। এই আন্দোলনের ফলে ওয়েক্সফোর্ড, কিলকেনি, ক্লনমেল, ওয়াটার ফোর্ড প্রভৃতি স্থানে শুধু দিনের বেলায় কাজ করার নিয়ম সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। লিমেরিকে যেখানে ঠিকা-মজুরের অভিযোগ প্রকাশ করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করেছিল সেখানে রুটিকারখানা মালিকদের প্রতি বন্ধকতায় আন্দোলনে হেরে যায়, ময়দা-কলওয়ালা মালিকরাই ছিল সবচেয়ে বেশি বিরোধী। লিমেরিকের দৃষ্টান্তে এনিস ও টিপেরারি-তে আন্দোলনে ভাটা আসে। কর্ক-এ যেখানে আবেগপূর্ণ প্রতিবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ হয়, মালিকরা তাদের ক্ষমতাকে কাজে লাগায়, লোকদের কর্মচ্যুত করতে আন্দোলনকে পরাভূত করে। ডাবলিনে বেকারী মালিকরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞভাবে আন্দোলনের বিরোধিতা করে এবং আন্দোলনে অগ্রণী ঠিকা-মজুরদের যতদূর সম্ভব অপদস্থ করে শ্রমিকদের রবিবার ও রাত্রির কাজে রাজি করাতে সক্ষম হয় যদিও এটি এদের মতের বিরুদ্ধে।[২২]
ব্রিটিশ সরকারের কমিটি, যে সরকার আয়াণ্ডে সর্বদা আপাদমস্তক অস্ত্রসজ্জিত থাকে এবং সাধারণত ক্ষমতা কিভাবে দেখাতে হয় তা-ও জানে, সেই সরকার-ই অত্যন্ত মৃদু, প্রায় শবযাত্রার সুরে, ডাবলিন, লিমেরিক, কর্ক প্রভৃতি স্থানের একগুয়ে রুটিকারখানা-মালিকদের কাছে প্রতিবাদ জানান। কমিটি বিশ্বাস করে যে শ্রমের ঘণ্টা প্রাকৃতিক বিধান অনুযায়ী সীমাবদ্ধ এবং তাকে লঙ্ঘন করলে শাস্তি পেতে হয়। মালিক রুটিওয়ালাদের পক্ষে শ্রমিকদের কর্মচ্যুতির ভয় দেখিয়ে রাজি করান, তাদের ধর্মীয় ও উচ্চতর অনুভূতিগুলির বিরোধিতা করা, দেশের আইন না মানা এবং জনমতকে উপেক্ষা করা (রবিবারের শ্রম সম্পর্কে ), এর ফলে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে অসম্ভাব এসে যায় …………এবং এতে ধর্ম, নীতি ও সামাজিক শৃংখলার পক্ষে বিপজ্জনক একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয় …… কমিটি বিশ্বাস করে যে দৈনিক বার ঘণ্টার বেশি স্থায়ী পরিশ্রম শ্রমিকের গার্হস্থ্য ও ব্যক্তিগত জীবনকে ব্যাহত করে এবং প্রতিটি মানুষের ঘর-বাড়ি ও পরিবার-পরিজন সম্পর্কে পুত্র, ভ্রাতা অথবা স্বামী হিসেবে কর্তব্যপালনে বাধা দেয় এবং সেইজন্য সাংঘাতিক নৈতিক কুফল নিয়ে আসে। বার ঘণ্টার বেশি দৈনিক এম শমিকের স্বাস্থ্যহানির প্রবণতা আনে এবং অকাল বার্ধক্য ও মৃত্যু ঘটিয়ে শ্রমিকের পরিবারবর্গকে নিদারুণ ক্ষতিগ্রস্ত করে এইভাবে তারা সর্বাধিক প্রয়োজনের সময় পরিবারে অভিভাবকের যত্ন ও সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়।[২৩]
এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আয়ার্ল্যাণ্ড সম্পর্কে বলছিলাম। ইংলিশ চ্যানেল এর অপর পারে স্কটল্যাণ্ডের কৃষি-শ্রমিক, লাঙ্গল চাষী, অত্যন্ত প্রতিকূল জলবায়ুতে তের চোদ্দ ঘণ্টা শ্রম এবং রবিবারে অতিরিক্ত চার ঘণ্টা শ্রমের এই দেশে আবার রবিবারকে পবিত্র ছুটির দিন মনে করা হয় ! )[২৪] বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়; ঠিক ঐ একই সময়ে ৩ জন রেলওয়ে শ্রমিক,-একজন গার্ড, একজন ইঞ্জিন-ড্রাইভার একজন সিগন্যাল ম্যান-লণ্ডনে করনারে { মৃত্যু সম্বন্ধে তদন্তকারী ) কোর্টে জুরীর সামনে আসামীর কাঠগড়ায় দাড়িয়েছিল। একটি ভয়াবহ রেল-দুর্ঘটনায় শতশত যাত্রী মারা পড়ে। কর্মচারীদের অবহেলাই এই দুর্ঘটনার কারণ। এরা জুবীর। সামনে সমস্বরে ঘোষণা করল যে দশ অথবা বারো বছর আগে এদের দৈনিক মাত্র আট ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হত। গত পাঁচ, ছয় বছর এদের পরিশ্রমকে বাড়িয়ে দৈনিক চৌদ্দ, আঠারে? ও কুড়ি ঘণ্টা করা হয়েছে এবং যখন দীর্ঘ ছুটির সময় যাত্রীদের ভিড় খুব বেশি হয়, যখন বিশেষ বিশেষ ভ্রমণের ট্রেনগুলি চলে, তখন কোন বিরাম বিরতি ছাড়াই চল্লিশ অথবা পঞ্চাশ ঘণ্টা পর্যন্ত পরিশ্রম করতে হয়। এরা অতিকায় মানুষ নয়, সাধারণ মানুষ মাত্র। একটা মাত্রার পরে এদের দেহ আর চলবে না। ক্লান্তিতে তারা মুহ্যমান হয়ে পড়ে। তাদের মস্তিষ্ক আর চিন্তা করে না, তাদের চোখ দেখে-ও দেখে না। অত্যন্ত মান্যগণ্য’ ব্রিটিশ জুরীরা রায় দিয়ে তাদের নবৃহত্যার অপরাধে উধ্ব তম বিচারালয়ে সোপর্দ করলেন এবং রায়ে একটি মৃদু সংযোজনী মারফৎ শুধু শুভেচ্ছা প্রকাশ করলেন যে রেল কোম্পানির ধনতান্ত্রিক মালিকরা ভবিষ্যতে যেন একটি বেশি খরচ করে যথেষ্ট পরিমাণ শ্রমশক্তির ক্রয় করেন এবং মজুরি-প্রদত্ত শ্রমশক্তিকে শোষণ করার ব্যাপারে আর একটু বেশি ‘সংযমী’ আর একটু বেশি স্বার্থত্যাগী, আর একটু বেশি মিতব্যয়ী হন।[২৫]
