ইংল্যাণ্ডে শিল্পের অপর কোন শাখাতে (খুব সম্প্রতি প্রবর্তিত যন্ত্রে রুটি তৈরির কথা বাদ দিয়ে আজ পর্যন্ত এত প্রাচীন ও অচল পদ্ধতি বেঁচে নেই -বোমক সাম্রাজ্যে কবিদের লেখাতেও যে জিনিসটি দেখি—এই খ্ৰীষ্টপূর্ব যুগের রুটি সেঁকার ব্যাপার। কিন্তু মূলধন, ইতিপূর্বেই যা উল্লেখ করা হয়েছে, শ্রম-প্রণালীর কৃৎ-কৌশলগত চৰিত্ৰ সম্পর্কে শুরুতে নিস্পৃহ থাকে; হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তাই নিয়েই তার কাজ শুরু হয়।
রুটিতে অবিশ্বাস্য রকম ভেজাল দেওয়ার ব্যাপার, বিশেষতঃ লণ্ডন শহরে, কমন্স সভায় খাদ্য সামগ্রীতে ভেজাল সম্পর্কে নিযুক্ত কমিটি (১৮৫৫-৫৬) এবং ডাঃ সালের “ধরা-পড়া ভেজাল” নামক বইখানি সর্বপ্রথম প্রকাশ করে দেয়।[১২] এইসব প্রকাশের ফল হল ১৮৬০ সালের ৬ই আগষ্টের আইনটি—যার উদ্দেশ্য ছিল খাদ্য ও পানীয় সামগ্রীতে ভেজাল নিষিদ্ধ করা—সেই আইনটি কার্যকরী হল না কারণ এতে স্বাভাবিক ভাবে প্রত্যেকটি স্বাধীন ব্যবসায়ীর জন্য অপরিসীম মমতা দেখানো হয়েছিল, যে ব্যবসায়ীরা ভেজাল দেওয়া পণ্যে কেনা-বেচা করে ‘সৎপথে দুটো পয়সা করতে বদ্ধপরিকর ছিল।[১৩] কমিটি নিজে মোটের উপর সরল ভাবে তাদের বিশ্বাসকে সূত্রাকারে প্রকাশ করে বললেন যে স্বাধীন ব্যবসা মানে স্বাভাবিকভাবেই ভেজাল, অথবা ইংরেজরা সুকৌশলে যে-ভাবে বলে থাকেন, পরিমার্জিত জিনিস নিয়ে ব্যবসা। বস্তুতঃ এই ‘পরিমার্জনকারীরা প্রেটোপোরাস-এর চেয়ে অনেক ভালভাবে জানে যে কেমন করে সাদাকে কাল এবং কালকে সাদা করা যায় এবং ইলিয়াটিকদের চেয়ে ভালো করে জানে কিভাবে প্রমাণ করতে হয় যে চোখে যা দেখা যায়, তা কেবল বাহ্ন ব্যাপার।[১৪]
সে যাই হোক কমিটি সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন নিজেদের “দৈনিক রুটি’-র দিকে এবং স্বভাবতই রুটি সেঁকার শিল্পের দিকে। ঠিক একই সময়ে জনসভা ও পার্লামেন্টে আর্জি মারফত লণ্ডনে রুটি শিল্পের ঠিকা-শ্রমিকরা তাদের অতিরিক্ত খাটুনি ও অন্যান্য দাবি নিয়ে আওয়াজ তোলে। এদের দাবি এত জরুরি ছিল যে মিঃ এইচ. এস, ট্রেমহিয়ার যিনি ইতিপূর্বে উল্লিখিত ১৮৬৩ সালে কমিশনেরও সদস্য ছিলেন ত’কেই রাজকীয় তদন্ত কমিশনার নিয়োগ করা হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ সমম্বিত তার এই রিপোর্ট[১৫] সাধারণের বিবেক উদ্বদ্ধ না করলেও তাদের পাকস্থলীতে আঘাত করে। ইংরেজরা বরাবরই বাইবেল সম্পর্কে বেশ জ্ঞান রাখে, তাই তারা ভাল করেই জানেন যে ঈশ্বরের কৃপাধন্য ধনিক অথবা ভূস্বামী অথবা বিনা-পরিশ্রমের উচ্চ পদাধিকারী। ব্যক্তি ছাড়া সকল মানুষের প্রতি আদেশ আছে যে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তাকে দৈনিক রুটি খেতে হবে, কিন্তু তারা জানতেন না যে মানুষকে তার দৈনিক রুটির সঙ্গে খেতে হবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ গায়ের ঘামের সঙ্গে মেশানো ফোড়ার পুজ, মাকড়সার জাল, মরা পোকামাকড ও জার্মানির পচা মদের গাদ, ফিটকারি, বালি ও অন্যান্য সুস্বাদু খনিজ উপাদানের তো কথাই নেই। তাই স্বাধীন ব্যবসার পবিত্রতার প্রতি মর্যাদা না দিয়ে স্বাধীন রুটি শিল্পকে রাষ্ট্রীয় পরিদর্শকদের তত্ত্বাবধানে আনা হল ( ১৮৬৩ সালে পার্লামেন্টের অধিবেশনের শেষ দিকে, এবং ঐ পার্লামেন্টের ঐ একই আইনে ১৮ বছরের কম বয়সের শ্রমিকদের জন্য রাত ৯টা থেকে সকাল ৫টা পর্যন্ত কাজ করা নিষিদ্ধ হল। এই শেষোক্ত ধারাটিতেই প্রকাশ পাচ্ছে এই সেকেলে ঘরোয়া ধরনের শিল্পটিতে অতিরিক্ত খাটুনির বিপুল বোঝা।
“লণ্ডনের একজন ঠিক রুটি-মজুরের কাজ শুরু হয় সাধারণত রাত এগারটার সময়। ঐ সময় মজুর ময়দাকে তাল পাকায়’-এই শ্রম-সাধ্য প্রক্রিয়াটি ময়দার পরিমাণ অথবা শ্রমের পরিমাণ অনুযাযী আধঘণ্টা থেকে পৌনে এক ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হয়। তারপর ময়দা মাখার পাত্রটির উপরে ঢাকা দেবার জন্য ব্যবহৃত ময়দা মাখার তক্তার উপর সে শুয়ে পড়ে; একটি চট পাকিয়ে সে মাথার বালিশ করে এবং আরেকটি চট পেতে শুয়ে সে প্রায় ঘণ্টা দুই ঘুমায়। তারপর তাকে প্রায় ৫ ঘণ্টা ব্যাপী দ্রুত এবং অবিরাম পরিশ্রম করতে হয়—ময়দার তাল তৈরি করা, ঘোট ঘোট টুকরা করা, ঐগুলিকে বিশেষ ছাঁচে উনুনে দেওয়া, সাধারণ ও সৌখিন ধরনের রুটি গড়ে সেঁকা, উনুন থেকে সরাসরি রুটি বের করা এবং ঐগুলি দোকানে পৌছে দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। রুটি সেঁকার ঘরের তাপমাত্রা ৭৫ থেকে ৯০° পর্যন্ত এবং ছোট খাট কারখানাগুলিতে প্রায়ই তাপমা। নিচের দিকে না থেকে উচ্চতর সীমার দিকেই থাকে। যখন রুটি, রোল প্রভৃতি তৈরির কাজ শেষ হয়, তখন শুরু হয় বণ্টনের কাজ এবং রুটি কারিগরদের একটি বৃহৎ সংখ্যা রাত্রির উল্লিখিত কঠিন পরিশ্রমের পরে আবার দিনের বেলায় বার বণ্টা রুটির ঝুড়ি বয়ে অথবা ঠেলাগাড়ি ঠেলে হাঁটার উপরে থাকতে হয়, কখনো কখনো আবার রুটি সেঁকার ঘরে ফিরে আসে এবং দুপুর একটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত মরশুমের প্রয়োজন অনুযায়ী তারা কাজ শেষ করে; সেই সময়ে অন্যান্য শ্রমিকরা রুটি সেঁকার ঘরে কাজ করে এবং বিকালবেলার শেষ পর্যন্ত সারি সারি রুটি বের করে আনে।[১৬] যাকে বলা হয় লণ্ডন মরশুম সেই সময়ে শহরের ওয়েস্ট-এতে পুরোদামী রুটি-কারখানার মালিকদের শ্রমিকরা সাধারণতঃ রাত এগারোটায় কাজ আরম্ভ করে এবং পরের দিন সকাল আটটা পর্যন্ত মাঝখানে একবার অথবা দুবার ( প্রায়ই খুব অল্প সময় বিশ্রাম নিয়ে রুটি তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকে। তারপর তারা বিকেল চারটা, পাচটা, ছয়টা এবং এমনকি সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত রুটি বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করে, অথবা কখন কখন বিকেল বেলা আবার সেকবার ঘরে আসে এবং বিস্কুট তৈরির কাজে সাহায্য করে। তারা কাজ শেষ করার পরে কখন পাঁচ বা ছয়, কখন মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুমায়, তারপর তারা আবার কাজ শুরু করে। শুক্রবারগুলিতে তারা সর্বদাই আগে কাজ ধরে, কেউ কেউ রাত দশটার সময় শুরু করে, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে রুটি তৈরি ও বণ্টনের কাজ শনিবার রাত্রি ৮টা পর্যন্ত চলে কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রবিবার ভোর চারটা বা পাঁচটায় শেষ হয়। রবিবারগুলিতে শ্রমিকদের দিনে ২/৩ বার এক থেকে দুই ঘণ্টা হাজিরা দিতেই হয়, ঐ সময়ে তারা পরের দিনের রুটি তৈরির আয়োজন করে যে সব শ্রমিক কম দামের রুটি মালিকদের দ্বারা নিযুক্ত হয় (এই মালিকরা পুরো দামের চেয়ে কমে তাদের রুটি বিক্রী করে এবং আগেই বলা হয়েছে যে এদের সংখ্যা লণ্ডনে রুটি ওয়ালাদের চারভাগের তিনভাগ ), তাদের যে শুধু গড়ে বেশি সময় কাজ করতে হয় তাই নয়, পরন্তু তাদের কাজটা হচ্ছে প্রায় সম্পূর্ণরূপে রুটি সেঁকার ঘরের মধ্যেই। কমদামের রুটিওয়ালারা সাধারণত নিজেদের দোকানেই রুটি বিক্রি করে। যদি তাদের রুটি বাইরে পাঠাতে হয়, যেটি ব্যাপারীদের দোকানে সরবরাহ করা ছাড়া সচরাচর ঘটে না, তখন তারা সাধারণত ঐ কাজের জন্য অন্য লোক নিয়োগ কৰে। এরা বাড়ি বাড়ি রুটি পৌছে দেয় না। সপ্তাহের শেষদিকে . যে লোকগুলি বৃহস্পতিবার রাত দশটায় কাজ শুরু করেছিল এবং নামমাত্র বিরতি ছাড়া এরা শনিবার সন্ধ্যার পরেও বেশ কিছু সময় কাজ করে।[১৭]
