ঐ একই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ‘হাউস’ সার্জন’ মিঃ চার্লস পার্সনস কমিশনার লঙকে এর কাছে এক চিঠিতে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে লেখেন, “আমি পরিসংখ্যান থেকে বলতে পারি না, বলতে পারি কেবল অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই; এ কথা ব্যক্তিগতভাবে আমি সজোরে বলতে পারি যে মাতা-পিতা বা নিয়োগকতাদের অর্থলালসা চরিতার্থ করার জন্য যাদের বলি দেওয়া হয়েছে, সেই হতভাগ্য শিশুদের দিকে তাকালেই আমি ক্রুদ্ধ হয়ে উঠি। পটারি কর্মীদের নানাবিধ রোগের কারণগুলির তালিকা দেবার পরে তিনি এক কথায় তা প্রকাশ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ। কমিশনের রিপোর্টে এই আস্থা প্রকাশ করা হয়েছে যে এমন একটি শিল্পোৎপাদন, যা সমগ্র বিশ্বে এত বিশিষ্ট একটি স্থান অধিকার করে আছে, তা দীর্ঘকাল ধরে এই মন্তব্যের লক্ষ্য হবে না যে, তার বিপুল সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সেই এম-জনসংখ্যার শারীরিক অধঃপতন, ব্যাপক দৈহিক ক্লেশভোগ এবং অকালমৃত্যু, যাদের শ্রম ও কুশলতার কল্যাণেই অর্জিত হয়েছে এই বিপুল সাফল্য[৭] এবং ইংল্যাণ্ডের পটারি-শিল্প সম্পর্কে যা কিছু বলা হয়েছে, তার সবটাই প্রযোজ্য স্কটল্যাণ্ডের পটারি-শিল্পের ক্ষেত্রেও।[৮]
কাঠিতে ফসফরাস লাগাবার পদ্ধতি আবিষ্কার হবার পরে, ১৮৩৩ সাল থেকেই দেশলাই শিল্পের সূচনা হয়; ১৮৪৫ সাল থেকে ইংল্যাণ্ডে এই শিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটে এবং এইটি বিশেষ করে প্রসারিত হয় যেমন লণ্ডনের জনবহুল অংশগুলিতে তেমনি ম্যাঞ্চেস্টার বামিহাম, লিভারপুল, ব্রিষ্টল, নরউইচ, নিউক্যাসেল ও গ্লাসগো-তে। এই শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে চোয়াল-লাগার ব্যাধিও ছড়িয়ে পড়েছে যেটিকে ১৮৪৫ সালে ভিয়েনার একজন চিকিৎসক দেশলাই শিল্পীদের বিশেষ ব্যাধি বলে আবিষ্কার করেন। শ্রমিকদের অর্ধেক হচ্ছে ১৩ বছরেরও কম বয়সের শিশু এবং ১৮ বছরের নীচে, তরুণ। অস্বাস্থ্যকর ও বিরক্তিকর বলে এই শিল্পটি এতই কুখ্যাত যে শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে সবচেয়ে দুঃস্থ অংশ যেমন অর্ধাশন-ক্লিষ্ট বিধবা প্রভৃতিরাই কেবল তাদের অর্ধনগ্ন, অর্ধভুক্ত, অশিক্ষিত শিশুদের এতে সঁপে দিতে বাধ্য হয়।[৯]
১৮৬৩ সালে কমিশনার হোয়াইট যেসব সাক্ষীদের পরীক্ষা করেছিলেন তাদের মধ্যে ২৭০ জন ছিল ১৮ বছরের কম বয়সের, ৫০ জন ১০ বছরের নীচে ১০ জন কেবল ৮ বছরের এবং ৫ জন মাত্র ৬ বছর বয়সের। শ্রম-দিবসের পরিমাণ ১২ থেকে ১৪ বা ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত, রাত্রিকালের শ্রম, অনিয়মিত খাবার এবং বেশির ভাগ সময়-ই খাবার খাওয়া হত ফসফরাসের দ্বারা বিষাক্ত কারখানা-ঘরের ভিতরেই। দান্তে থাকলে নিশ্চয়ই দেখতেন যে এই শিল্পের বিভীষিকা তার নরকের নিষ্ঠুরতম ভয়াবহতাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে।
কাগজের ঝালর তৈরির শিল্পের স্থূল নমুনাগুলি যন্ত্রে ছাপা হয়, সূক্ষ্ম নমুনাগুলি ছাপা হয় হাতে (ব্লক-ছাপাই)। সবচেয়ে কর্মচঞ্চল মাসগুলি হচ্ছে অক্টোবরের শুরু থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত। এই সময়ে সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অথবা আরও বেশি রাত পর্যন্ত কোনো বিরতি ছাড়াই ক্ষিপ্র ও ক্ষিপ্ত গতিতে কাজ চলে।
জে. লিচ, সাক্ষ্য দিচ্ছেন : “গত বছর শীতকালে অতিরিক্ত খাটুনির জন্য স্বাস্থ্যহানি হওয়ার ফলে ১৯ জন বালিকার মধ্যে ৬ জন অনুপস্থিত ছিল। আমাকে চেঁচামেচি করে তাদের জাগিয়ে রাখতে হয়।” ডব্লু, ডাফি বলেছেন : ‘আমি দেখেছি ছেলেমেয়েরা যখন আর কেউ কাজের জন্য তাদের চোখ খুলে রাখতে পারত না; অবশ্য তখন আমরা কেউই পারতাম না।’ জে. লাইটবোন বলেছেন : আমার বয়স ১৩ বছর …গত বছর শীতকালে আমরা রাত ৯টা পর্যন্ত কাজ করতাম, তার আগের বছর রাত ১০টা পর্যন্ত। গত শীতকালে প্রত্যেক রাত্রিতে আমি পায়ের যন্ত্রণায় কঁদতাম। জি. অবস্টেন : আমার ঐ ছেলেটির বয়স যখন ৭ বছর, তখন থেকেই ওকে আমি তুষারপাতের মধ্যে দিয়ে পিঠে করে নিয়ে যেতাম ও নিয়ে আসতাম এবং ও দৈনিক ১০ ঘণ্টা কাজ করত . ‘আমি প্রায়ই হাঁটু গেড়ে বসে তাকে খাওয়াতাম যখন সে যন্ত্রের ধারে দাড়িয়ে থাকত কারণ যন্ত্র ছেড়ে আসা বা যন্ত্র থামানো সম্ভব ছিল না। ম্যাঞ্চেস্টারের একটি কারখানার ম্যানেজার-অংশীদার স্মিথ -এর সাক্ষ্য : “আমরা (তার মানে তার। শ্রমিকরা যারা তার জন্য কাজ করে ) কাজ করে চলি, খাবার জন্য কোন বিরতি নেই, যাতে করে দিনের ১০ ঘণ্টা শ্রম বিকেল ৪-৩০ মিঃএ শেষ হয় এবং তারপরে যা কাজ হয় সেটা হচ্ছে ‘ওভার-টাইম’।[১০] (এই ভদ্রলোক মিঃ স্মিথ নিজে কি ঐ ১০ ঘণ্টার মধ্যে কোন খাবার খান না?) “আমরা (এই স্মিথের শ্রমিকরা কদাচিৎ সন্ধ্যা ৬টার আগে কাজ শেষ করি (অর্থাৎ মিঃ স্মিথের শ্রমশক্তির যন্ত্রগুলিকে ছাড়া হয় ), অতএব বাস্তবপক্ষে আমরা ( বিশেষ অর্থে) সারা বছর ধরেই ওভার টাইম কাজ করি। এরূপে শিশু ও বয়স্করা একইভাবে কাজ করে (১৫২ জন শিশু ও তরুণ এবং ১৪০ জন বয়স্ক ), গত ১৮ মাসে গড় কাজ হয়েছে কমপক্ষে ৭ দিন ৫ ঘণ্টা অথবা সপ্তাহে ৭৮ ঘণ্টা ১৮৬২ সালের ২রা মে যে ছ’ সপ্তাহ শেষ হল তাতে গড় কাজ আরও বেশি ৮ দিন অথবা সপ্তাহে ৮৪ ঘণ্টা।” তবু এই একই মিঃ স্মিথ, যিনি বহুবচন ব্যবহার করতে এত ভালবাসেন, একটু হেসে বলেছেন, “যন্ত্রের কাজ বেশি নয়।” অতএব ছাপাখানার মালিকরা বলেন : “হাতের শ্রম যন্ত্রের শ্রমের চেয়ে অনেক স্বাস্থ্যকর।” মোটর উপর মালিকরা সক্রোধে এই প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেন। প্রস্থাবটি হচ্ছে “অন্তত খাবার সময়ে যন্ত্র বন্ধ রাখা হোক।” মিঃ অটুলি, একটি বরো-তে বলেন, ওয়ালপেপার কারখানার ম্যানেজার যে এমন একটি ধারা চালু করেন যাতে সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কাজের অনুমতি আছে:: এটাই আমাদের (!) পক্ষে খুব সুবিধাজনক কিন্তু সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কারখানা চালান সুবিধাজনক নয়। আমাদের যন্ত্র মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য সর্বদাই থামান হয়। (কী উদারতা ! ) কাগজ ও রঙের এমন কিছু উল্লেখযোগ্য অপচয় হয় না। কিন্তু, এখানে তিনি খুব সহানুভূতির সঙ্গে বলেছেন, “আমি অবশ্য বুঝতে পারি যে সময়ের অপচয় সকলে পছন্দ করেন না।” কমিশনের রিপোর্টে খুব স্পষ্ট করেই মত প্রকাশ করা হয়েছে, কয়েকজন প্রধান প্রধান মালিক সময়ের অপচয়ের যে ভয় প্রকাশ করেন অর্থাৎ অপরের সময়কে দখল করতে না পারা এবং তার জন্য মুনাফার ক্ষতি,—সেটাই যথেষ্ট কারণ হতে পারে যার জন্য ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের এবং ১৮ বছরের কম বয়সী তরুণদের দৈনিক ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা খাটতে হবে, তারা মধ্যাহ্ন ভোজও খাবে না, এমন কি স্টিম-ইঞ্জিনে যে-ভাবে কয়লা ও জল দেওয়া হয়, পশমের জন্য সাবান, চাকার জন্য তেল উৎপাদন-প্রক্রিয়া চলাকালে শ্রমের যন্ত্রপাতিগুলির সহায়ক সামগ্রী হিসাবে যা দেওয়া হয়, তাদের ক্ষেত্রে তাও হয় না।[১১]
