১৮৬০ সালের ১৪ই জানুয়ারি নটিংহাম-এর ‘অ্যাসেমরি-রুস’-এ অনুষ্ঠিত এক সভায় সভাপতি হিসাবে কাউন্টি ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ ব্রাউটন চার্লটন বলেন, “জনসংখ্যার যে-অংশ লেস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তার মধ্যে বঞ্চনা ও দুঃখ-দুর্দশা এত বেশি যা এই রাজ্যের অন্য কোনো অংশে বাস্তবিক পক্ষে, সভ্য জগতে অপরিজ্ঞাত। শেষ রাতে দুটো, তিনটে চারটের সময়ে নয়-দশ বছরের শিশুদের টেনে ভোলা হয় তাদের ছেডা নোংরা বিছানা থেকে এবং নিছক পেটের খোরাকির জন্য কাজ করতে বাধ্য করা হয় রাত দশ, এগারো, এমনকি রাত বারোটা পর্যন্ত। তাদের হাত পা শুকিয়ে যায়, তাদের বাড় কমে যায়, তাদের মুখ সাদা হয়ে যায় এবং তাদের মনুষ্য-সত্তা এমন এক পাথুরে অসাড়তায় নিঃশেষে লয় হয়ে যায় যে ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। আমরা মোটেই আশ্চর্য হইনা যখন দেখি মিঃ ম্যালেট বা অন্য কোনো কারখানা-মালিক উঠে পঁডিয়ে এই আলোচনায় বাধা দেন। যে কথা রেভারেণ্ড মন্টেগু ভ্যাপি বলেছেন, এই ব্যবস্থাটা সামাজিক, শারীরিক, নৈতিক ও আত্মিক—সবদিক থেকেই চরম দাসত্বের ব্যবস্থা। এমন একটা শহর সম্পর্কে কী ভাবা যায় বলুন তো, যেখানে মানুষের শ্রম দিবসকে আঠারো ঘণ্টায় নামিয়ে আনার জন্য একটি জনসভা থেকে আবেদন করতে হয়? . আমরা ভার্জিনিয়া ও ক্যারোলিনার তুলো উৎপাদকদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করি। তাদের কালোবাজার, তাদের চাবুক, তাদের নর-মাংসের লেন-দেন কি মানবতার এই ধীরে ধীরে বলি দেওয়া থেকে বেশি জঘন্য, যে-বলি দেওয়া হয়ে থাকে কেবল ধনিকদের জন্য ওড়না ও কলার তৈরি করানোর কাজে?[২]
গত ২২ বছরে স্ট্যাফোর্ডশায়ার-এর পটারি-কারখানাগুলিতে তিনটি পার্লামেন্টিয় অনুসন্ধান পরিচালনা করা হয়েছে। সেই সব অনুসন্ধানের ফলাফল বিধৃত হয়েছে “শিশু-নিয়োগ কমিশন”-এর কাছে মিঃ স্কাইভেন-এর ১৮১ সালের রিপোর্টে, প্রিভি কাউন্সিলের আদেশানুসারে প্রকাশিত ডাঃ গ্রীনহাউ-এর বিপোর্টে (পাবলিক হেল্ক, থাড’ রিপোর্ট, ১১২-১১৩) এবং সবশেষে, ১৮৬৩ সালে ১৩ই জুন তারিখের শিশু নিয়োগ কমিশনের প্রথম রিপোর্ট-এর অন্তর্ভুক্ত মিঃ লোগ-এর ১৮৬২ সালের রিপোের্ট। ১৮৬০ ও ১৮৬৩ সালের রিপোর্ট দুটি থেকে স্বয়ং শোষিত শিশুদের নিজেদের কয়েকটি সাক্ষ্যই আমার বক্তব্যের পক্ষে যথেষ্ট। শিশুদের সাক্ষ্য থেকে বয়স্কদের বিশেষ করে বালিকা ও নারীদের অবস্থা সম্পর্কেও আমরা একটা ধারণা করে নিতে পারি, এবং সেটা শিল্পের এমন একটা শাখায়, যার পাশে সুতোকলকে মনে হবে মনোমত ও স্বাস্থ্যকর শিল্প বলে।[৩]
৯ বছর বয়সের উইলিয়াম উড প্রথম যখন কাজে ঢােকে তখন তার বয়স ছিল ৭ বছর ৩ মাম। শুরু থেকেই তার কাজ ছিল “ছাঁচ চালাচালি” (মালসুদ্ধ ছাচ শুকোবার ঘরে নিয়ে যাওয়া, পরে খালি ছাচ ফিরিয়ে নিয়ে আসা)। সপ্তাহে প্রতিদিনই সে কাজে আসত ভোর ৬টায়, ছাড় পেত রাত ৯টায়। “সপ্তাহে ছয় দিন আমি কাজ করি রাত ৯টা পর্যন্ত। এইভাবে আমি কাজ করছি সাত-আট সপ্তাহ।” সাত বছরের একটি শিশুকে, কাজ করতে হয় দিনে পনেরো ঘণ্টা। ১২ বছর বয়সের জে মারে বলে, “আমি জিগ’ ঘোরই এবং ছাঁচ চালাচালি করি। আমি আসি ৬টায়। কখনো কখনো ৪টায়। গত রাতে আমি কাজ করেছি সারা রাত-সকাল ৬টা পর্যন্ত। গত পরশু রাত থেকে আমি যাইনি। গত রাতে কাজ করেছে আরো ৮-৯ জন ছেলে। একজন বাদে সকলেই আবার আজ সকালে এসেছে। আমি পাই ৩ শিলিং ৬ পেন্স। রাতে কাজের জন্য বাড়তি কিছু পাইনা। গত সপাহে আমি কাজ করেছি দু রাত।” দশ বছরের বালক ফের্নিহাফ বলে, “আমি (খাবারের জন্য) রোজ এক ঘণ্টা করে পাই না; কোন কোন দিন পাই কেবল আধ ঘণ্টা-বিষ্যৎবার, শুক্রবার আর শনিবার।”[৪]
ডাঃ গ্রীনহাউ বলেছেন, স্টোক-অন-ট্রেন্ট এবং উলস্টানটনের পটারি-অঞ্চলগুলিতে গড় আয়ু অস্বাভাবিক রকমে কম। যদিও স্টোক জেলায় ২০ বছরের বেশি বয়স্ক পুরুষ জনসংখ্যার কেবল ৩৬৬ শতাংশ এবং উলস্টানটনের কেবল ৩০৪ শতাংশ পটারিতে কাজ করে তবু প্রথম জেলাটিতে ঐ বয়সে পুরুষদের মোট মৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি এবং দ্বিতীয়টিতে ৪ ভাগেরও বেশি মৃত্যু ঘটে পটারি-কর্মীদের মধ্যে ফুসফুস সংক্রান্ত রোগে। হানলির একজন চিকিৎসক, নাম ডাঃ বুথবয়ড, বলেন, “পটারি কর্মীদের পর পর প্রত্যেকটি প্রজন্ম লম্বায় খাটো এবং হীনবল হয়ে যাচ্ছে। একই ভাবে মিঃ এম-বিন নামে আর একজন চিকিৎসকের বিবৃতি, “২৫ বছর আগে যখন তিনি পটারি-কর্মীদের মধ্যে চিকিৎসা করতে শুরু করেন, তখন থেকে আজ পর্যন্ত তার নজরে পড়েছে তাদের দৈর্ঘ্য ও প্রস্তের লক্ষণীয় অবনতি।” এই বিবৃতিগুলি গৃহীত হয়েছে : গ্রীনহাউ-এর ১৮৬০ সালের রিপোর্ট থেকে।[৫]
১৮৬৩ সালে কমিশনারদের বিপোর্ট থেকে উদ্ধৃত করা হচ্ছে : নর্থ স্ট্যাফোর্ড শায়ার ইন ফার্মারি’র প্রবীণ চিকিৎসক ডাঃ আর্লেজ। পটারি-কমীরা পুরুষ ও নারী উভয়েই, শ্রেণী হিসাবে একটি অধঃপাতিত জনসংখ্যা-দৈহিক ও নৈতিক উভয় দিক থেকেই। সাধারণ ভাবেই তাদের আয়তন বাড়েনা, আকার স্বাভাবিক হয়না এবং বুকের গঠন সুগঠিত হয় না; তারা অসময়েই বার্ধক্যে আক্রান্ত এবং অবধারিত ভাবেই স্বল্পায়ু হয় : তারা হয় নির্জীব, রক্তহীন এবং তাদের শারীরবৃত্তগত দৌর্বল্য প্রকাশ পায় অজীর্ণ রোগের দুরোগ আক্রমণে, লিভার ও কিডনীর বিশৃংখলায় এবং বাতগ্রস্ততায়। কিন্তু সব রকম ব্যাধির মধ্যে তার সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় বুকের ব্যাধিতে নিউমোনিয়া যক্ষ্মা, ব্রংকাইটিস ও হাঁপানিতে। একটা বিশেষ ধরনের রোগ তাদের মধ্যে বিশেষভাবে দেখা যায়; তার নাম পটারি হাঁপানি’ বা ‘পটারি যক্ষ্মা। স্কুফুলা রোগ যাতে আক্রান্ত হয় গ্রন্থি, অস্থি বা শরীরের অন্য কোন অংশ, তার শিকার হয় শতকরা ৬৬ বা তারও বেশি পটারি-কর্মী। জেলার জনসংখ্যার ‘অবক্ষয় যে আরো বেশি হয়নি, তার কারণ পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে নিরন্তর কর্মী সংগ্রহ এবং অপেক্ষাকৃত। স্বাস্থ্যবান নৃ-শাখাগুলির সঙ্গে এদের বৈবাহিক সম্পর্ক।[৬]
