এর থেকে ( আইন লংঘন করে বাড়তি খাটুনির দ্বারা) যে লাভ হয় তাতে বোঝ। যায় যে অনেকের পক্ষেই এই লোভ সংবরণ করা সম্ভব নয়, তারা হিসেব করে যে তার ধরা পড়বে না, এবং এখন তারা দেখে যে ধরা পড়ে শাস্তি হলে যে সামান্য জরিমানার খরচখরচা দিতে হয় তাতে তারা ধরা পড়লেও প্রচুর লাভ থাকে।[১৭] যেসব ক্ষেত্রে বাড়তি সময়টি সারাদিন ছোট ছোট চুরি যোগ করে পাওয়া যায়, সেইসব ক্ষেত্রে পরিদর্শকদের পক্ষে মামলা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।”[১৮]
শ্রমিকদের আহার ও বিশ্রামের সময় থেকে ধনিকদের এই ‘ছোট চুরিগুলিকে কারখানা-পরিদর্শকেরা আখ্যা দিয়েছেন, “ছোটখাটো মিনিট চুরি,[১৯] কয়েকটি মিনিট ছিনিয়ে নেওয়া’,[২০] অথবা শ্রমিকেরা নিজস্ব ভাষায় বলে খাবার সময় থেকে ঠোকর মারা।[২১]
শ্রমের প্রত্যেকটি বিরতির বিরোধিতা করে, নিচের চমকপ্রদ ঘটনাটি-এর প্রমাণ দেয়। ১৮৩৬ খ্রীষ্টাব্দের জুন মাসের শুরুতে ইয়র্কশায়ারের ডিউসবেরির ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে খবর পৌছয় যে ব্যাটলি সন্নিহিত ৮টি বড় বড় কারখানার মালিকরা কারখানা আইন লংঘন করেছে। এইসব ভদ্রলোকদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল এই যে তার। বারো থেকে পনের বছর বয়সের পাঁচজন বালককে শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে থেকে পরদিন শনিবার বিকেল চারটা পর্যন্ত কাজ করিয়েছে, খাবার জন্য এবং মধ্যরাত্রে ঘুম ছাড়া তাদের আর কোন বিরাম দেওয়া হয়নি। এবং এইসব শিশুদের ত্রিশ ঘণ্টা একটা নোংরা অন্ধ কুপে ( ঔ বদ্ধ জায়গাটির এই নাম ছিল ) অবিরাম পরিশ্রম করতে হত সেখানে পশমের ছেড়া কম্বল টুকরো টুকরো করতে হয় এবং সেখানে ধূলো, ফেসো। প্রভৃতিতে ঘরের হাওয়া এমন ঠাসা থাকে যে প্রাপ্ত বয়স্ক শ্রমিকদের পর্যন্ত ফুসফুস বাঁচাবার জন্য রুমাল দিয়ে কেবলই মুখ চাকতে হয়। অভিযুক্ত ভদ্রলোকের শপথের বদলে শুধু সত্যকথা বলবার প্রতিশ্রুতি দেন কারণ ধর্মভীরু হিসেবে শপথ নেওয়া তাদের ধর্মে বাধে, এবং বলেন যে তারা এইসব অসুখী শিশুদের জন্য অত্যন্ত দয়াপরবশ হয়ে তাদের ৪ ঘণ্টা ঘুমাবার সময় দিয়েছিলেন কিন্তু অবাধ্য শিশুরা কিছুতেই ঘুমাতে চায় না। এই ধর্মভীরু ভদ্রলোকেদের ২০ পাউণ্ড করে জরিমানা হয়। কবি ড্রাইডেন অনেক আগেই হয়ত এদের জন্যই কবিতা লিখেছিলেন : “বাইরে দেখা পবিত্র, মিথ্যা বলায় দড়। : ঠাকুর পুজো করে, পাপ করতে দড়।”
এটি স্পষ্ট যে এইরূপ অবস্থার মধ্যে উৰও শ্রম থেকে উদ্ধ,ত্ত মূল্যের উৎপাদন গোপন ব্যাপার নয়। একজন অত্যন্ত সম্মানিত মালিক আমাদের বলেছিলেন যদি আমাকে দিনে মাত্র ১০ মিনিট উপরি সময় খাটাবার অনুমতি দেওয়া হয় তাহলে সম্বৎসরে আমার পকেটে হাজারখানেক (পাউণ্ড) আসবে।'[২২] মুহূর্ত-ই হচ্ছে মুনাফার মৌল উপাদান।[২৩]
এই দৃষ্টিভঙ্গী অনুয়ায়ী যারা পুরো সময় কাজ করে তাদের পুরো সময়ের মঞ্জুর এবং ১৩ বছরের কম বয়সের শিশু যাদের ৬ ঘণ্টামাত্র কাজ করতে দেওয়া হয় তাদের ‘অর্ধ সময়ের মজুর, শ্রমিকদের এই আখ্যার চেয়ে বৈশিষ্ট্যসূচক আর কিছু হতে পারে না। শ্রমিক এখানে শ্রম-সময়ের ঘনীভূত রূপ ছাড়া আর কিছুই নয়। ‘পুরো সময়ের মজুর এবং ‘অর্ধ সময়ের মজুর এই দুয়ের মধ্যে সমস্ত ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য বিলীন হয়েছে।[২৪]
————-
১. “যারা শ্রম করে তারা আসলে উভয়েরই ভরণপোষণ করে—অবসর ভোগীদের { যাদের ধনী বলা হয়, তাদের ] এবং নিজেদের।” (Edmund Burke : *Thoughts and Details on Scarcity,” p. 2!
২, নাইবুবর তার “রোমান হিস্টরি”-তে খুব সরল মনে বলেছেন : এটা স্পষ্ট যে ইট্রাস্কানদের স্থাপত্যসমূহের ধ্বংসস্তৃপগুলি, যা আজও আমাদের যুক্তিত করে তার পাশ্চাতে রয়েছে সামন্ত-প্রভু এবং সামন্ত-প্রজার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র (!) রাষ্ট্রে। সিসমদি বলেন আরো বেশি এবং বোঝাতে চান, “সেলস লেস”-এর পশ্চাতে রয়েছে মজুরি-প্রভু এবং মজুরি-দাস।।
৩. এদের শোচনীয় অবস্থার জন্য করুণা বোধ না করে কেউ মিশর, ইথিওপিয়া ও আরবের মধ্যেকার সোনার খনিগুলির এই দুর্ভাগাদের দিকে তাকাতে পরে; যারা তাদের শরীরগুলিকে পর্যন্ত পরিস্কার রাখতে বা তাদের নগ্নতাকে ঢেকে রাখতে পারে না। রুগ্ন অশক্ত বা বৃদ্ধদের জন্য, নারীদের দুর্বলতার জন্য নেই কোনো বিবেচনা বা সহিষ্ণুতা। মার খেয়ে কাজ করতে করতে যে পর্যন্ত না তারা মারা যায়, সেই পর্যন্ত তাদের কাজ করতেই হবে।” (“Diod. sic. Bibt. Hist. lib. 2, c. 13)
৪. এর পরে যা কিছু বলা হয়েছে, তা ক্রিমিয়ার যুদ্ধের পর থেকে রুমানিয়ার প্রদেশগুলিতে যে পরিস্থিতি দেখা দেয়, সেই সম্পর্কে।
৫. জার্মানির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে এলব, নদীর পূর্ব দিককার প্রুশিয়ার ক্ষেত্রে এই কথা সমান ভাবে প্রযোজ্য। পঞ্চদশ শতকে প্রায় সর্বত্রই জার্মান চাষী ছিল এমন একজন লোক, যে খাজনা হিসাবে কিছু ফসল ও শ্রম দিতে বাধ্য থাকলেও অন্যথা ছিল স্বাধীন। ব্ৰাণ্ডেনবার্গ, পোমেরানিয়া, সাইলেসিয়া ও পূব প্ৰশিয়ার ঔপনিবেশিকদের এমনকি আইনত ও স্বাধীন বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। কৃষক যুদ্ধে অভিজাততন্ত্রের জয়লাভের ফলে তার অবসান ঘটল। বিজিত দক্ষিণ-জার্মান চাষীরাই কেবল আবার ক্রীতদাসে পরিণত হল না, ষোড়শ শতকের মধ্যকাল থেকে পূর্ব প্রশিয়া ব্ৰাণ্ডেবর্গ, পোমেরানিয়া ও সাইলেসিয়ার, এবং তার অব্যবহিত পর থেকে শ্লেমউই-হলস্টেইন-এর স্বাধীন চাষীদেরও ভূমিদাসের অবস্থায় অধঃপতিত হয়। (Maurer, Fronhofe IVvol-Meitzen “Der Boden des Preussischen Staats.” -Hanssen, “Leibeigenschaft in Schleswig Holstein.” (F. Engels)
