দানিয়ুবিয়ান প্রদেশসমূহের রেগ, লিমেন্ট অর্গানিক, যার প্রত্যেকটি অনুচ্ছেদকে আইনে পরিণত করা হয়েছে, সেটি যদি হয় উদ্ব,ত্ত শ্রমের লালসার ইতিবাচক প্রকাশ, তাহলে ইংলণ্ডের কারখানা-আইনগুলি হচ্ছে ঐ একই লালসার নেতিবাচক প্রকাশ। ধনিক ও জমিদার শাসিত একটি রাষ্ট্রের দ্বারা প্রণীত এই আইনগুলি বলপূর্বক শ্রম দিবসকে সীমাবদ্ধ করে মূলধন কর্তৃক শ্রম শক্তিকে যথেচ্ছভাবে শোষণের লালসাকে খর্ব করে। শ্রমিক-আন্দোলন, যা প্রত্যহ অধিকতর শংকাজনক হয়ে উঠ ছিল, সেই আন্দোলন ছাড়াও কারখানায় শ্রমের ঘণ্টা সীমাবদ্ধ করায় প্রয়োজন হয়েছিল সেই তাগিদ থেকে, যার ফলে ইংল্যাণ্ডের ক্ষেতগুলি আগাছায় ভরে গিয়েছিল। লুণ্ঠনের একই অন্ধ প্রবৃত্তি প্রথম ক্ষেত্রে মাটিকে শুষে অনুর্বর করেছিল এবং অপরক্ষেত্রে জাতির প্রাণশক্তির মূল পর্যন্ত উপড়ে ফেলেছিল। একদিকে যেমন মাঝে মাঝে মহামারীর প্রাদুর্ভাব অন্যদিকে তেমন জার্মানি ও ফ্রান্স সামরিক মানের অধোগতি এই এই সত্যকে প্রকট করে তোলে।[৭]
১৮৫৩ সালে কারখানা-আইন যেটি এখনো (১৮৬৭) বলবৎ আছে, তদনুযায়ী গড় শ্রম-দিবস হচ্ছে ১০ ঘণ্টা, অর্থাৎ প্রথম পাঁচ দিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যো ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টা যার কাছে প্রাতঃরাশের জন্য আধঘণ্টা এবং ডিনারের জন্য আধঘণ্টা ছুটি এবং সেইজন্য শ্রম-দিবস হচ্ছে ১০ ঘণ্টা এবং শনিবারের জন্য ৮ঘন্টা বাকি থাকছে, আধঘণ্টা প্রাতঃরাশের সময় বাদ দিয়ে সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত। অতএব থাকছে ৬০টি শ্রম-ঘণ্টা, প্রথম পাচদিনের প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা এবং শেষ দিনে ৭ ১/২ ঘণ্টা।[৮] এই আইনগুলির কয়েকজন অভিভাবক নিযুক্ত হলেন, এরা প্রত্যক্ষ ভাবে স্বরাষ্ট্র সচিবের অধীন কারখানা-পরিদর্শক এবং পার্লামেন্টের হুকুমে এদের যান্যাসিক রিপোর্ট প্রকাশ করতে হয়। এরা উদ্বৃত্ত শ্রমের জন্য ধনিকের লালসায় নিয়মিত সরকারী তথ্য সরবরাহ করেন।
এখন একবার কারখানা পরিদর্শকদের বক্তব্য শোনা যাক।[৯] প্রতারক কারখানা মালিক সকাল ৬টার ১৫ মিনিট আগে ( কখনো বেশি, কখনো কম) কাজ শুরু করে এবং ১৫ মিনিট পরে কাজ শেষ করে। প্রাতঃরাশের আধ ঘণ্টার শুরুতে পাঁচ মিনিট এবং শেষে পাঁচ মিনিট সে কেটে নেয় এবং প্রধান আহারের জন্য নির্দিষ্ট এক ঘণ্টার শুরুতে দশ মিনিট এবং শেষে দশ মিনিট ফাকি দেয়। শনিবার বেলা ১টার পর সে আরও ১৫ মিনিট ( কখনো বেশি, কখনো কম ) কাজ করায়।
এইভাবে তার লাভ হয়,—
সকাল ৬টার আগে ——- ১৫ মিনিট
সন্ধ্যা ৬টার পরে———১৫ মিনিট
প্রাতঃরাশের সময়——–১০ মিনিট
মধ্যাহ্ন ভোজের সময় —-২০ মিনিট
—————————–
মোট ৬০ মিনিট
৫ দিনে—৩০০০ মিনিট
শনিবার সকাল ৬টার আগে ——-১৫ মিনিট
প্রাতঃরাশের সময় ——–১০ মিনিট
বেলা ২টার পরে ———১৫ মিনিট
———————————
মোট ৪০ মিনিট
সপ্তাহে –৩৪০ মিনিট
অথবা সপ্তাহে ৫ ঘণ্টা ৪০ মিনিট যাতে বৎসরে ৫ টি কাজের সপ্তাহে ( দুটি সপ্তাহ ছুটি সাময়িক বন্ধের জন্য ) এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২৭টি শ্রম-দিবস।
“প্রতিদিন ৫ মিনিটের মাথায় বাড়তি খাটুনিকে সপ্তাহের সংখ্যা দিয়ে গুণ করলে বছরের ২২ দিনের উৎপাদনের সমান হয়।
“সকাল ৬টার আগে, বিকেল ৬টার পরে এবং খাবার সময়ের আগে ও পরে অল্প অল্প সময় নিয়ে দিনে যদি বাড়তি ১ ঘণ্টা হয় তাহলে তাতে বছরে প্রায় ১৩ মাসের সমান হয়।”
সংকটের সময়ে যখন উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং কারখানাগুলি ‘কম সময় অর্থাৎ সপ্তাহের একটি অংশমাত্র কাজ চালায়, এতে কিন্তু শ্ৰম-দিবসকে বাড়াবার প্রবণতা কমে না। ব্যবসায়ে যত মন্দা আসে ততই চলতি ব্যবসায়ে বেশি বেশি লাভের চেষ্টা করতে হয়। যত কম সময় কাজ চলে তত বেশি ঐ সময় থেকে, উদ্বৃত্ত শ্রম-সময় বের করতে হয়।
এই জিনিসটাই ১৮৫৭ থেকে ১৮৫৮ খ্ৰীষ্টাব্দ পর্যন্ত সংকটের যুগে কারখানা পরিদর্শকের রিপোর্টে ফুটে উঠেছে :
“এটি একটি অসঙ্গতি বলে মনে হতে পারে যে যখন ব্যবসায়ে এত মন্দা তখনো বাড়তি খাটুনি চলতে পারে। কিন্তু ঐ মন্দার জন্যই অসৎ লোকের! আইন লংঘন করে যাতে তারা বাড়তি মুনাফা পেতে পারে … পূর্ববর্তী ৬ মাসে, লিওনার্ড হনরি বলেছেন, আমার জেলায় ১২২টি কারখানা উঠে গিয়েছে; ১৪ ৩ টি মাত্র চালু ছিল তবু আইনসঙ্গত ঘণ্টার পরেও বাড়তি খাটুনি চলেছে।”[১৩]
মি: হাউয়েল বলেছেন, “বাণিজ্যে মন্দার জন্য বেশির ভাগ সময় অনেক কারখানা একেবারে বন্ধ ছিল এবং তার চেয়ে একটি বড় সংখ্যার কারখানা অল্প সময় কাজ চালাত। কিন্তু আমি ঠিক আগের মতই অভিযোগ পেয়ে চলেছি যে বিশ্রাম ও আহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় কেটে শ্রমিকদের প্রতিদিন আধ ঘণ্টা থেকে পৌনে এক ঘণ্টা বঞ্চিত করা হচ্ছে।[১৪] ১৮৬১-১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত ভয়াবহ তুলো-সংকটের সময় অপেক্ষাকৃত অল্প হারে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়।[১৫] যখনি আহারের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে অথবা অন্য কোন অবৈধ সময়ে দেখা যায় যে শ্রমিকরা কারখানার কাজ করছে তখন এরকম কৈফিয়তও দেওয়া হয় যে শ্রমিকরা নির্দিষ্ট সময়ে কিছুতেই কারখানার কাজ ত্যাগ করে না এবং কাজ বন্ধ করাবার জন্য { যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করা ইত্যাদি) তাদের বাধ্য করতে হয়, বিশেষতঃ শনিবার বিকেল বেলায়। কিন্তু যদি যন্ত্রপাতি থেমে যাবার পরও কোন কারখানায় শ্রমিকরা থাকে তাহলে তাদের বিশেষ করে যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করবার জন্য সকাল ৬টার আগে অথবা শনিবার বিকালে বেলা ২টার আগে, যথোপযুক্ত সময় নির্দিষ্ট থাকত, তাহলে তাদের ঐ কাজ করতে হত না।[১৬]
