দানিয়ুবের তীরবর্তী রাজ্যগুলিতে উদ্ধও শ্রমের প্রতি লোভের সঙ্গে ইংল্যাণ্ডের কারখানাগুলিতে ঐ একই লোভের তুলনা করলে একটি গুরুত্ব আছে, কারণ চুক্তিবদ্ধ শ্রমে উদ্বৃত্ত শ্রমের একটি স্বতন্ত্র ও প্রত্যক্ষ রূপ ছিল।
ধরা যাক শ্রম-দিবসের মধ্যে ৬ ঘণ্টা আবশ্যিক শ্রম এব’ ৬ ঘন্ট! উদ্ধও শ্রম আছে। এই ক্ষেত্রে প্রাত সপ্তাহে একজন স্বাধীন শ্রমিক ধনতান্ত্রিক মালিককে ৬ X৬ অথবা ৩৬ ঘণ্টা উত্ত শ্রম দেয়। একই ফল হত যদি সে সপ্তাহে ৩ দিন নিজের জন্য কাজ করত এবং ৩ দিন মূলধনকে বিনামূল্যে দিয়ে দিত; কিন্তু এটি ওপর থেকে দেখলে ধরা যায় না। উদ্ধত শ্রম ও আবশ্যিক শ্রম একে অপরের সঙ্গে মিশে থাকে। অতএব, আমি ঐ একই সম্পর্ককে নিমোক্তভাবে প্রকাশ করতে পারি, যেমন শ্রমিক তার প্রতি মিনিট কাজের মধ্যে ৩০ সেকেণ্ড নিজের জন্য কাজ করে এবং ৩০ সেকেণ্ড ধনকের জন্য করে ইত্যাদি। কিন্তু কভি বা চুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অন্যরকম; ওয়াল্লাচিয়ান কৃষক নিজের ভরণপোষণের জন্য যে আবশ্যিক শ্রম কবে তা স্পষ্টতঃ ভূস্বামীর জন্য করা উত্ত শ্রম থেকে পৃথক। প্রথমটি সে করে নিজের ক্ষেতে, দ্বিতীয়টি ভূস্বামীর জমিতে। অতএব উভয় প্রকারের শ্রম-সময় পাশাপাশি স্বতন্ত্রভাবে থাকে। কবুভি-র ক্ষেত্রে উও শ্রম পরিষ্কারভাবে আবশ্যিক শ্রম থেকে পৃথক। এতে অবশ্য উদ্ধত্ত শ্রম বা আবশ্যিক শ্রমের পরিমাণগত সম্পর্কের কোন তারতম্য হয় না। সপ্তাহে ৩ দিনের উত্ত এম সেই ৩ দিনই থেকে যায় যার থেকে শ্রমিক কোন সমার্ঘ সামগ্রী, পায় না, সেই শ্রমিককে কভি অথবা মজুরি-প্রথা যে-কোন নামেই কাজ করানো হোক না কেন। কিন্তু ধনিকের ক্ষেত্রে উদ্ধও শ্রমের লালসা ফুটে ওঠে যখন শ্রম-দিবসকে সীমাহীনভাবে সম্প্রসারণের চেষ্টা চলে ভূস্বামীর ক্ষেত্রে অনেক সোজা সুজিভাবে কভির দিনের সংখ্যা বাড়াবার জন্য প্রত্যক্ষভাবে তাডা দেওয়া হয়।[৪]
দানিয়ুবের তীরবর্তী রাজ্যগুলিতে কভি-র সঙ্গে শস্যকর ও দাসত্বের অন্যান্য ব্যপারগুলি মিশে থাকত, কিন্তু কভি-ই ছিল শাসক-শ্রেণীকে দেয় সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ কর। যেখানে এই অবস্থা দেখা যেত, সেখানে কদাচিৎ ভূমিদাসত্ব থেকে করভি দেখা দিত; তার চেয়ে অনেক বেশি দেখা যেত যে, কবুভি থেকেই ভূমি দাসত্বের উদ্ভব হচ্ছে।[৫] রুমানিয়ার প্রদেশগুলিতেও ঠিক এই ব্যাপারটি ঘটেছিল। তাদের উৎপাদনের আদিম পদ্ধতির ভিত্তি ছিল জমির সমষ্টিগত মালিকানা, কিন্তু এই মালিকানার রূপটি স্লাভ বা ভারতীয়ের মতো নয়। জমির কিছু অংশ সমাজের লোকের। স্বাধীন স্বত্বাধিকারী হিসেবে পৃথক পৃথক চাষ করতে, আর একটি অংশ (অ্যাগার পাবলিকা) তারা সমষ্টিগতভাবে চাষ করত। এই সমষ্টিগত পরিশ্রম থেকে পাওয়া ফসল অংশতঃ অজন্ম ও অন্যান্য দুর্বিপাকের সময় ব্যবহারের জন্য সঞ্চিত থাকত, অংশতঃ একটি সাধারণ পোলায় সঞ্চয় করে যুদ্ধের খরচ, ধর্মানুষ্ঠান ও অন্যান্য সাধারণ ব্যায় নির্বাহ করা হত। কালক্রমে সময়-নায়ক ও ধর্মযাজকেরা সাধারণ জমির সঙ্গে এই এমকেও আত্মসাৎ করল। সাধারণ জমিতে স্বাধীন কৃষকের শ্রম হয়ে উঠল সাধারণ জমির অপহরণকারীদের প্রাপ্য বা কভি। শীঘ্রই এই কভি-ই হয়ে উঠল একটি দাসত্বমূলক সম্পর্ক যার অস্তিত্ব আইনের মধ্যে না থাকলেও বাস্তবে ছিল, যতদিন না পর্যন্ত পৃথিবীর মুক্তিদাতা হিসাবে রাশিয়া ভূমিদাসত্ব রদ করার অছিলায় এটিকে আইনসঙ্গত করল। কভি সংক্রান্ত আইন যেটি রাশিয়ার সেনাপতি কিসেলের ১৮৩১ খ্ৰীষ্টাব্দে ঘোষণা করেন, ঐটি অবশ্য ভূস্বামীদের-ই নির্দেশে তৈরি হয়েছিল। এইভাবে রাশিয়া এক ধাক্কায় দানিয়ুবের তীরবর্তী প্রদেশগুলির ভূস্বামীদের হৃদয় জয়। করল এবং ইউরোপের সর্বত্র উদারতার মুখোশধারীদের বাহবা পেল।
কভি সংক্রান্ত এই আইন যার নাম হচ্ছে ‘রেগ লিমেন্ট অর্গানিক’, এই আইন অনুযায়ী প্রত্যেক ওয়াল্লাচিয়ান কৃষককে অন্যান্য বহুবিধ জিনিসপত্র দেবার বাধ্য বাধকতা ছাড়াও ভূস্বামীকে দিতে হত : (১) ১২ দিন সাধারণ শ্রম; (২) ১ দিন ক্ষেতের কাজ; (৩) ১ দিন কাঠ বহন। সর্বসাকুল্যে বছরে ১৪ দিন। অর্থততে গভীর অন্তদৃষ্টি নিয়েই এম-দিবসকে এখানে তার মামুলি অর্থে নেওয়া হয়নি, একটা গড়পড়তা দৈনিক উৎপাদন উৎপন্ন করতে যতটা সময় লাগে সেই অর্থে, এবং ঐ গড়পড়তা দৈনিক উৎপাদন এত ধূর্ততার সঙ্গে নির্ধারিত হয় যে কোন দৈত্যও ১৪ ঘণ্টা খেটে সে কাজ করতে পারে না। সাদা কথায় রেগ লিমেন্ট নিজেই খাঁটি রুশীয় পরিহাসের সঙ্গে ঘোষণা করছে যে ১২টি শ্রম-দিবস বললে বুঝতে হবে ৩৬ দিনের কায়িক শ্রমের উৎপন্ন জিনিস, ক্ষেত-খামারে একদিনের শ্রম মানে ৩ দিনের শ্রম এবং একদিনের কাঠ বওয়া ঐ একই অর্থে তার তিনগুণ। সর্বসাকুল্যে ৪২ দিনের বেগার খাটুনি বা কভি। এর সঙ্গে অবশ্য যযাগ করতে হবে তথাকথিত ‘জোবাগী অর্থাৎ বিশেষ বিশেষ উপলক্ষ্যে ভূস্বামীর জন্য যে-সব কাজকর্ম করতে হত। নিজ নিজ জনসংখ্যার অনুপাতে প্রত্যেকটি গ্রামকে বছরে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষকে এই অতিরিক্ত বেগারের দরুন বছরে ১৪ দিন করে দিতে হত। এইভাবে নির্দিষ্ট কভি ছিল বৎসরে ৫৬টি শ্রম-দিবস। কিন্তু জলবায়ুর কঠোরতার জন্য ওয়াল্লাচিয়ার একটি কৃষি-বৎসরে মাত্র ২১ দিন আছে, যার মধ্যে রবিবার ও। ধর্মানুষ্ঠানে ৪ টি দিন চলে যায়, গড়ে ৩০টিতে খারাপ আবহাওয়া থাকে, সব মিলিয়ে ৭০ দিন কোনো কাজে আসে না। তাহলে থাকে ১৪ . টি শ্রম-দিবস। কবুভির সঙ্গে আবশ্যিক শ্রমের অনুপাত হচ্ছে ওই অথবা ৬৬ শতাংশ এতে ইংল্যাণ্ডের কৃষি শ্রমিক অথবা কারখানা-শ্রমিকের শ্রম থেকে পাওয়া উদ্বৃত্ত মূল্যের চেয়ে অনেক কমই পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এইটি হচ্ছে শুধুমাত্র আইন-সম্মত কভি। এবং ইংল্যাণ্ডের কারখানা-আইনের চেয়ে অনেক উদারতার সঙ্গে, রেগ লিমেন্ট অর্গানিক এই আইন ফাকি দেবার সুবিধাজনক রাস্তা রেখেছিল। ১২ দিনকে ৫৬ দিনে পরিণত করে তারপর আবার এই ৫৬টি বেগার দিনের প্রত্যেকটি দিনের কাজ এমনভাবে করান হত যাতে একদিনের কাজ একটি অংশ পরের দিন পড়ে। উদাহরণ স্বরূপ একদিনে যে পরিমাণ জমির আগাছা তুলতে হয়, তাতে, বিশেষতঃ ভুট্টার ক্ষেতে, লাগে দ্বিগুণ সময়। কৃষিতে কোন কোন গ্রমের ক্ষেত্রে আইনসঙ্গতভাবে দিনের কাজকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে শ্রমের দিন শুরু হয় মে মাসে এবং শেষ হয় অক্টোবরে। মোল্ডাভিয়ার অবস্থা আরও সাংঘাতিক। ‘বিজয়মদে মত্ত এক ভূস্বামী চিৎকার করে বলেছিলেন, যে রেগ লিমেন্ট অর্গানিকে কভি-র ১২ দিন বৎসরে ৩৬৫ দিনে দাড়ায়।[৬]
