আমাকে দিচ্ছ এক দিনের শ্রমশক্তির দাম, অথচ ব্যবহার করছ ৩ দিনের শ্রমশক্তি। এটা আমাদের চুক্তির তথা বিনিময়-নিয়মের পরিপন্থী। সুতরাং আমি দাবি করছি একটি স্বাভাবিক দৈর্ঘ্যের শ্রম-দিবস এবং আমি এটা দাবি করছি তোমার সহৃদয়তার কাছে কোনো আবেদন ছাড়াই, কেননা আর্থিক ব্যাপারে ভাবাবেগের স্থান নেই। হতে পারে তুমি একজন আদর্শ নাগরিক, হয়ত পশুকেশ-নিবারণী সমিতির একজন সদস্য, অধিকন্তু, পবিত্রতার খ্যাতিতে খ্যাতিমান, কিন্তু আমার মুখোমুখি যে জিনিসটির তুমি প্রতিনিধিত্ব কর, তার বুকের ভিতরে কোনো হৃদয় নেই। সেখানে যে-জিনিসছি স্পন্দত হয় বলে মনে হয় সেটি আমারই হৃদয়-স্পন্দন। আমি দাবি করি একটি স্বাভাবিক শ্রম-দিবস, কেননা, অন্য প্রত্যেকটি বিক্রেতার মতই আমিও দাবি করি আমার পণ্য মূল্য।[৬]
আমরা তা হলে দেখছি যে, চরম নমনীয় সীমানা ছাড়া, পণ্য বিনিময়ের প্রকৃতি নিজে এম-দিবসের উপরে, উদ্ধও শ্রমের উপরে কোনো সীমা আরোপ করে না। যখন সে শ্রম দিবসকে যথাসম্ভব দীর্ঘ করতে চায় এবং যখনি সম্ভব, একটি এম-দিবস থেকেই দুটি শ্রম-দিবস আদায় করতে চায়, তখন সে ক্রেতা, হিসাবে তার অধিকার প্রয়োগ করে। অন্য দিকে বিক্রীত পণ্যটির স্ব-বিশেষ প্রকৃতিই ক্রেতা-কর্তৃক সেই পণ্যের পরিভোগর উপরে একটি সীমা টেনে দেয় এবং শ্রমিক যখন শ্রম-দিবসকে, একটি স্বাভাবিক দৈর্ঘে শ্ৰম-দিবসে কমিয়ে আনতে চায়, তখন সেও বিক্রেতা হিসাবে তার অধিকার প্রয়োগ করে। সুতরাং এখানে একটি বিরোধিতা থেকে যায়, অধিকারের বিরুৰে অধিকার—দুটিই অবশ্য বহন করে বিনিময়ের নিয়মের ছাপ। দুটি সমান অধিকারের মধ্যে এই সংঘাত শক্তির দ্বারা মীমাংসিত হয়। এই কারণেই, যাকে বলা হয় শ্রম-দিবস, তার নির্ধারণের ঘটনাটি ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের ইতিহাসে আত্মপ্রকাশ করে একটি সংগ্রামের পরিণতি হিসাবে-যৌথ মূলধন অর্থাৎ ধনিক-শ্রেণী এবং যৌথ শ্রম অর্থাৎ শ্ৰমিক-শ্রেণীর মধ্যে সংগ্রাম হিসাবে।
————
১. একদিনের শ্রম কথাটি অস্পষ্ট; তা দীর্ঘও হতে পারে, হ্রস্বও হতে antal” (“An Essay on Trade and Commerce,” Containing Observations on Taxes &c. London, 1770, p. 73 )
২. এই প্রশ্নটি স্যার রবার্ট পীল বার্মিংহাম বণিক সমিতির কাছে যে বিখ্যাত প্রশ্নটি করেছিলেন একটি পাউণ্ড কাকে বলে? ‘র চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রশ্নটি উত্থাপন করা গিয়েছিল কেবল এই কারণে যে অর্থের প্রকৃতি সম্পর্কে পীল যেমন অজ্ঞ ছিলেন, বার্মিংহামের “ক্ষুদে শিলিং-ব্যাপারীরাও তেমন অজ্ঞ ছিল।
৩. ধনিকের লক্ষ্য হচ্ছে তার ব্যয়িত মূলধনের সাহায্যে যত বেশি সম্ভব এমের পরিমাণ আয়ত্ত করা (d obtenir du capital depense la plus forte somme de travail possible ).” J. G. courcelle seneuil, “Traite theorique et pratique des entreprises industrielles” 2nd ed. paris 1857, p. 63)
৪. “এক দিনে এক ঘণ্টার এম হারানো একটি বাণিজ্যিক রাষ্ট্রের পক্ষে বিরাট ক্ষতি। এই রাজ্যের গরিব মানুষদের মধ্যে, বিশেষ করে কল-কারখানার শ্রমিক সংখ্যার মধ্যে বিলাস-দ্রব্যের বিপুল পরিভোগ চালু আছে, যার মাধ্যমে তারা তাদের সময়ও পরিভোগ করে—যেটা হল সব রকমের পরিভোগর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক পরিভোগ।” An Essay on Trade and Commerce &c.”, p. 47 and 153.
৫. “Si le manouvrier libre prend un instant de repos, l’econo mie sordide qui le suit des yeux avec inquietude pretend qu’il la vole.” N. Linguet, “Tborie des Lois Civiles &c.” London 1767, t. II p. 466.
৬. শ্রম-দিবসকে ৯ ঘণ্টায় হ্রাস করার দাবিতে ১৮৬০-৬১ সালে লণ্ডনের নির্মাণকামীরা যে বিরাট ধর্মঘট করেছিল, সেই ধর্মঘট চলাকালে তাদের কমিটি একটি ইশতাহার প্রকাশ করেছিল, যার মধ্যে বিস্তৃত হয়েছিল আমাদের শ্রমিকের এই যুক্তি। ঐ ইশতাহারটিতে পরিহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে নির্মাণ-শিল্পের মালিকদের মধ্যে যে-লোকটা সবচেয়ে বেশি মুনাফা-শিকারী, সেই লোকটিই—জনৈক স্যার এম পেটোই হচ্ছে পবিত্রতার খ্যাতিতে খ্যাতিমান। ( এই একই পেটো ১৮৬৭ সালে স্ট্রাউসবাগ এর নির্দেশিত পথে অন্তিম দশাপ্রাপ্ত হলেন।)
.
.
১০.২ উদ্বৃত্ত শ্রমের লালসা। কারখানা–মালিক এবং বয়ার্ড
উদ্বৃত্ত শ্রম মূলধনের উদ্ভাবন নয়। যেখানেই সমাজের একটি অংশ উৎপাদনে উপায়গুলির একচেটিয়া মালিকানা ভোগ করে, সেখানেই শ্রমিককে, সেই শ্রমিক স্বাধীন বা গোলাম যাই হোক না কেন, তাকে নিজের ভরণপোষণের জন্য আবশ্যক শ্রম-সময়ের সঙ্গে উৎপাদনের উপায়সমূহের মালিকদের প্রয়োজন পূরণের জন্য কিছু উদ্ধও শ্রম-সময় দিতে হয়,[১]–এই মালিক এথেনীয় প্যাট্রিস হোন, ইট্রাস্কান, পুরোহিত, রোমের নাগরিক, নর্মান ভূস্বামী, আমেরিকার দাস-মালিক, ওয়াল্লা-চিয়ান বয়ার্ড, আধুনিক জমিদার অথবা ধনিক, যিনি হোন না কেন[২] কিন্তু এটি বেশ বোঝা যায় যে সমাজের অর্থনৈতিক সংগঠনের কোন একটি বিশেষ অবস্থায় যেখানে উৎপন্ন দ্রব্যের বিনিময়মূল্য প্রাধান্য লাভ না করে ব্যবহার-মূল্যেরই প্রাধান্য আছে, সেখানে উত্ত এম বিশেষ একপ্রস্ত প্রয়োজন দ্বারা সীমাবদ্ধ, ঐ প্রয়োজনগুলির কমবেশি হতে পারে কিন্তু উৎপাদনের প্রকৃতি এমন যে সেখানে উদ্ধত্ত শ্রমের জন্য সীমাহীন লালসা দেখা যায় না। এইজন্য প্রাচীন যুগে শুধু সেখানেই উপরি-খাটুনি ভয়ংকর রূপ নিয়েছে যেখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে সুনির্দিষ্ট স্বতন্ত্র অর্থরূপে বিনিময়মূল্য হস্তগত করা, যেমন, সোনা ও রূপোর উৎপাদন। বাধ্যতামূলক আমাণ কাজ হচ্ছে এক্ষেত্রে উপরি-খাটুনির একটি প্রচলিত ধরন, এর প্রমাণ পেতে ভিয়েভোরা সিকিউলা-এর রচনা পড়াই যথেষ্ট।[৩] তবু প্রাচীন যুগে এই ব্যাপাবগুলি হচ্ছে ব্যতিক্রম মাত্র। কিন্তু যেইমাত্র এইসব লোক যাদের উৎপাদন-প্রণালী এখনও দাস-এম চুক্তি-শ্রম প্রভৃতি নিম্নস্তরের রূপগুলির মধ্যে আবদ্ধ রয়েছে, এরা যখন ধনতান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতি দ্বারা প্রভাবিত আন্তর্জাতিক বাজারের আবর্তনের মধ্যে এসে পড়ে এবং তাদের উৎপন্ন জিনিস রপ্তানির জন্য বিক্রয় করাই মূল উদ্দেশ্য হয়েও ওঠে, তখন সভ্যযুগের উপরি-খাটুনির ভয়াবহতার সঙ্গে যুক্ত হয় দাসপ্রথা ভূমিদাসপ্রথা প্রভৃতির বর্বরোচিত ভয়াবহতা। এইজন্য দেখা যায় যে যতদিন পর্যন্ত উৎপাদনের মূল লক্ষ্য ছিল প্রত্যক্ষ স্থানীয় পরিভোগ, ততদিন পর্যন্ত আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলিতে নিগ্রো শ্রমিকদের মধ্যে পিতৃপ্রধান সামাজিক চরিত্রের কিছুটা অবশিষ্ট ছিল। কিন্তু যেমনি এই রাজ্যগুলিতে তুলোর রপ্তানি পরম স্বার্থ হয়ে উঠতে থাকল, ঠিক সেই অনুপাতেই নিগ্রোদের উপরি খাটুনি এবং মাত্র সাতবছরের পরিশ্রমে তাদের জীবনযাত্রার সমাপ্তি হয়ে উঠল একটি পরিকল্পিত পদ্ধতির হিসেবের ব্যাপার। এখন আর প্রশ্ন এই রইল না যে তার কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ব্যবহার-যোগ্য দ্রব্য পেতে হবে। এখন প্রশ্ন হয়ে উঠল স্বয়ং উদ্ধও শ্রমের উৎপাদন ঠিক এই জিনিসটি চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও দেখা গেল, যেমন দানিয়ুব নদীর পাশের রাজ্যগুলিতে ( বতমান রুমানিয়)।
