অতএব, শ্রম-দিবস একটি স্থির রাশি নয় বরং একটি পরিবর্তনীয় রাশি। তার একটি অংশ নিশ্চয়ই নির্ধারিত হয় স্বয়ং শ্রমিকের শ্রমশক্তির পুনরুৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম-সময়ের দ্বারা। কিন্তু তার মোট পরিমাণ পরিবর্তিত হয় উত্ত শমের মেয়াদের সঙ্গে। সুতরাং এম-দিবস নির্ধারণযোগ্য কিন্তু, আপাততঃ অনির্ধারিত।[১]
যদিও শ্রম-দিবস একটি অব্যয় রাশি নয়, একটি বহতা রাশি, তা হলেও অন্য দিকে, তা কেবল কয়েকটি সীমার মধ্যেই তা পরিবর্তিত হতে পারে। ন্যূনতম সীমাটি অবশ্য অনির্দেশ্য, যাই হোক, যদি আমরা প্রসারিত অংশ খগ-কে অর্থাৎ উত্তমকে ধরি=০, তা হলে আমরা একটি ন্যূনতম সীমা পাই, যা হল দিনের সেই অংশটি যখন শ্রমিক তার নিজের ভরণপোষণের জন্য আবশ্যিক ভাবেই কাজ করবে। যাই হোক, ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের ভিত্তিতে, এই আবশ্যিক এম কেবল একটি এম-দিবসের অংশবিশেষই হতে পারে, স্বয়ং শ্রম-দিবসটিকে কখনো এই ন্যনতম সীমায় পর্যবসিত করা যায় না। অপর পক্ষে, শ্রম-দিবসের একটি উচ্চতম সীমা আছে। একটি বিন্দুর বাইরে আর তাকে দীর্ঘায়িত করা যায় না। এই উচ্চতম সীমাটি দুটি শর্তের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রথমত, এম-শক্তির শারীরিক সীমাবদ্ধতার দ্বারা। একটি প্রাকৃতিক দিবসের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একজন মানুষ তার জীবনীশক্তির একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মাত্র ব্যয় করতে পারে। যেমন একটি ঘোড়া দিনের পর কেবল ৮ ঘণ্টা করে কাজ করতে পারে। দিনের একটা অংশে এই শক্তিকে বিশ্রাম করতে হবে, ঘুমোতে হবে; আর এক অংশে মানুষটিকে অন্যান্য দৈহিক প্রয়োজন মেটাতে হবে, নিজেকে খাওয়াতে, খোয়াতে এবং পরাতে হবে। এই সব বিশুদ্ধ দৈহিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াও, শ্রম-দিবসকে দীর্ঘায়িত করার পথে বিবিধ নৈতিক সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হতে হয়। তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক তাগিদগুলি মেটাবার জন্যও তার সময় চাই, যে-তাগিদগুলি নিয়ন্ত্রিত হয় সামাজিক অগ্রগতির সার্বিক পরিস্থিতির দ্বারা। সুতরাং শ্রম-দিবসের হ্রাস-বৃদ্ধি শারীরিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে ওঠা-নামা করে। কিন্তু এই উভয়বিধ সীমাগত শর্তগুলি খুবই স্থিতিস্থাপক প্রকৃতির এবং সর্বাধিক অবকাশের সুযোগ দেয়। অতএব, আমরা দেখতে পাই ৮, ১০, ১২, ১৪, ১৬, ১৮ ঘণ্টার অর্থাৎ সর্বাপেক্ষা বিভিন্ন দৈর্ঘ্যর শ্রম-দিবস।
ধনিক শ্রমশক্তিকে ক্রয় করেছে দৈনিক ভিত্তিতে। একটি এম-দিবসের শ্রম শক্তির ব্যবহার-মূল্য তার সম্পত্তি। সুতরাং সে শ্রমিককে দিয়ে তার জন্য একটি দিন জুড়ে কাজ করার অধিকার অর্জন করেছে। কিন্তু একটি এম-দিবস কাকে বলে?[২]
সর্বক্ষেত্রেই তা একটি প্রাকৃতিক দিবসের তুলনায় ছোট। কিন্তু কতটা ছোট? এই পরম প্রশ্নটি সম্পর্কে শ্রম-দিবসের আবশ্যিক সীমা সংক্রান্ত প্রশ্নটি সম্পর্কে ধনিকের নিজস্ব মতামত আছে। ধনিক হিসাবে সে কেবল মূলধনের ব্যক্তি-মূর্তি। তার আত্মা হচ্ছে মূলধনের আত্মা। কিন্তু মূলধনের আছে একটি মাত্র জৈব তাড়না, মূল্য এবং উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টির প্রবণত, তার স্থির উপাদানকে দিয়ে উৎপাদনের উপায়সমূহকে দিয়ে, যত বেশি সম্ভব উত্ত-শ্রমকে আত্মীকৃত করে নেওয়া।[৩]
মূলধন হল মৃত শ্রম, যা রক্তচোষা বাদুড়ের মত কেবল জীবিত শ্রমকে চুষেই বেঁচে থাকে, এবং যত বেশি বাচে তত বেশি চুষে নেয়। শ্রমিক যে সময় কাজ করে সেই সময়টা ধনিক তার কাছ থেকে ক্রয় করা শ্রমশক্তিটা পরিভোগ করে।[৪]
শ্রমিক যদি তার ব্যবহারযোগ্য এম নিজের জন্যই পরিভোগ করে, তা হলে সে ধনিককে লুণ্ঠন করে।[৫]
ধনিক তখন পণ্য-বিনিময়ের নিয়মটির আশ্রয় নেয়। অন্যান্য সকল ক্রেতার মত সে-ও তার পণ্য থেকে যথাসম্ভব সর্বাধিক সুবিধা সংগ্রহ করতে সচেষ্ট হয়। সহসা উখিত হয় শ্রমিকের কণ্ঠস্বর, যা এতকাল রুদ্ধ ছিল উৎপাদন-প্রক্রিয়াব ঝড়ে ও তাড়নায়।
যে-পণ্যটি আমি তোমার কাছে বিক্রি করেছি, তা এই ব্যাপারে বাকি সমস্ত পণ্য থেকে আলাদা যে আমরা এই পণ্যটি সৃষ্টি করে ব্যবহার-মূল্য এবং এমন একটি মূল্য যা তার নিজের মূল্যের চেয়ে বেশি। সেই কারণেই তুমি তা ক্রয় করেছ। তোমার কাছে যা দেখা দেয় মূলধনের স্বতঃস্ফুর্ত সম্প্রসারণ হিসাবে, আমার কাছে তা এম-শক্তির বাড়তি ব্যয়। তুমি এবং আমি বাজারে কেবল একটি নিয়মই জানি-পণ্য-বিনিময়ের নিবমটি। এবং পণ্যের পরিভোগের মালিক বিক্রেতা নয় যে তা হাতছাড়া করে, মালিক হল ক্রেতা-যে তা করায়ত্ত করে। সুতরাং তুমি হলে আমার দৈনিক শ্রম শক্তি ব্যবহারের অধিকারী। কিন্তু এই শ্রমশক্তির জন্য তুমি প্রতিদিন যে-দাম দেবে ত! এমন হতে হবে যা দিয়ে আমি দৈনিক তা পুনরুৎপাদন করতে পারি, এবং, আবাব তা বিক্রি করতে পারি। বয়স ইত্যাদির দরুন স্বাভাবিক ক্ষয় ছাডা, আমি যেন পবের দিন আজকের মতই স্বাভাবিক পরিমাণে শক্তি, স্বাস্থ্য ও সজীবতা নিয়ে কাজ করতে পাবি! তুমি আমার কানে নিরন্তর “ঞ্চয়” ও “ভোগ-সংবরণ’-এর বাণী শোনাও। ভাল কথা! একজন বুদ্ধিমান সঞ্চয়ী মালিকের মত আমার একমাত্র ধন যে শ্রমশক্তি তাব সাশ্রয় করব এবং বোকার মত তা অপচয় করা থেকে সব সময়ে নিজেকে সংবরণ করব। আমি প্রতিদিন ব্যয় করব, গতিশীল করব, সক্রিয় করব কেবল সেই পরিমাণ শ্রমশক্তি যা তার স্বাভাবিক স্থায়িত্ব ও স্বাস্থ্যসম্মত বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শ্রম দিবসের সীমাহীন সম্প্রসারণের দ্বার। তুমি এক দিনে এমন পরিমাণ শ্রমশক্তির ক্ষয় করে দিতে পার যা পূরণ করতে আমার তিন দিনেরও বেশি সময় লাগবে। যা তুমি এমের অঙ্কে লাভ কর, আমি তা জীবনশক্তির অঙ্কে হারাই। আমার শ্রমের ব্যবহার এবং তার বিনষ্টি সাধন দুটি সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। যদি একজন গড় শ্রমিক ( যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ কাজ করে ) গড়ে ৩০ বছরকাল বাঁচে, তা হলে আমার শ্ৰম-শক্তির মূল্য যা তুমি আমাকে দিনকে দিন দাও, তা বাড়ায় তার মোট মূল্যেরতড়ত অথবা ত কিন্তু যদি তুমি ১০ বছরে তা পরিভোগ কর এবং দৈনিক তার মোট মূল্যের তত ভাগের বদলে দাও তা হলে তুমি আমাকে দিচ্ছ তার মোট মূল্যের উ ভাগ এবং প্রতিদিন লুণ্ঠন করছ আমার পণ্যের ১ ভাগ। তুমি
