৩. যাই হোক, ম্যাঞ্চেস্টার সফরের ফলে এই পণ্ডিতপ্রবর অধ্যাপকটির কিছু উপকার হয়নি, এমন নয়। কারখানা-আইন প্রসঙ্গে পত্রাবলী’-তে তিনি মুনাফা’, ‘সুদ ও এমনকি ‘আরো বেশি কিছু সমেত গোটা নীট লাভকে উপস্থিত করেন একটি মাত্র ঘন্টার মজুরি-বঞ্চিত শ্রমের উপরে নির্ভরশীল বলে। এক বছর আগে, তার রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির রূপরেখা’-য় (আউটলাইনস অব পলিটিক্যাল ইকনমি’-তে) তিনি রিকার্ডোর শ্রমের দ্বারা মূল্য-নির্ধারণের তত্ত্বের বিরোধিতা করতে গিয়ে এটাও আবিষ্কার করেছিলেন যে, মুনাফার উদ্ভব ঘটে ধনিকের শ্রম থেকে এবং সুদের উদ্ভব ঘটে তার ‘কৃচ্ছসাধন’ থেকে অর্থাৎ তার ভোগ-সংবরণ থেকে। কৌশলটা পুরনো তবে ‘ভোগ-সংবরণ কথাটা নূতন! হের রশার সঠিক ভাবেই কথাটার অনুবাদ করেছেন “Enthaultung*। তার কিছু দেশবাসী, যেমন জার্মানির ব্রাউন, জোন, রবিনসন প্রভৃতিরা ল্যাটিন ভাষায় তার মত পারদর্শী ছিলেন না। তাই তারা কথাটা অনুবাদ করেছেন, সাধু-সন্তদের মত “Entsagung” (বৈরাগ্য)।
.
.
৯.৪ উদ্বৃত্ত উৎপন্ন
উৎপন্ন দ্রব্যের যে অংশ উদ্বৃত্ত-মূল্যকে প্রতিফলিত করে ( দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের দৃষ্টান্তটিতে : ২০ পাউণ্ডের এক-দশমাংশ বা ২ পাউণ্ড সুলতা), তাকে আমরা বলি “উত্ত-উৎপন্ন”। ঠিক যেমন উদ্ব-মূল্যের হার মোট মূলধনের সঙ্গে তার সম্পর্কের দ্বারা নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় তার অস্থির অংশের সঙ্গে সম্পর্কের দ্বারা, সেইভাবেই উদ্বৃত্ত-উৎপন্নের আপেক্ষিক পরিমাণ উৎপন্ন দ্রব্যের বাকি পরিমাণের সঙ্গে তার অনুপাতের দ্বারা নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় সেই অংশের সঙ্গে তার অনুপাতের দ্বারা যে-অংশটির মধ্যে বিস্তৃত হয় আবশ্যিক শ্রম। যেহেতু উহুত্ত মূল্যের উৎপাদনই হচ্ছে ধনিকের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, সেই হেতু এটা স্পষ্ট যে কোন ব্যক্তির বা জাতির ধনসম্পদের বিরাটত্ব পরিমাপ করতে হবে উত্ত-উৎপাদনের আপেক্ষিক আয়তনের দ্বারা-মোট উৎপন্নের আপেক্ষিক পরিমাপের দ্বারা নয়।[১]
আবশ্যিক শ্রম এবং উদ্বৃত্ত শ্রমের যোগফল অর্থাৎ যে-সময়ে শ্রমিক তার নিজের শ্রম শক্তির মূল্য প্রতিস্থাপন করে এবং যে-সময়ে সে উদ্ব-মূল্য উৎপাদন করে—এই দুয়ের যোগফল—এই যোগফলই গঠন করে তার শ্রম-দিবস অর্থাৎ সত্যিকার সেই সময়, যে সময় জুড়ে সে কাজ করে।
————-
১. £২০,০০০ পাউণ্ড মূলধনের মালিক এমন একজন ব্যক্তি, যার মুনাফা হয়। বার্ষিক £২, ০৩, তার কাছে তার মূলধন ১০০ লোককে বা ১০ ০ ০ ০ লোককে খাটায় কিনা, উৎপন্ন পণ্যটি ¢১৭,০০০ বা £২০,০০০-এ বিকোয় কিনা, তাতে কিছু এসে যায়না—যদি তার মুনাফা কোন ক্ষেত্রেই ৫২, ৭০-এর নীচে না নামে। জাতির আসল স্বার্থও কি একই রকম নয়? কোন জাতির লোকসংখ্যা ১০০ লক্ষই হোক ১২০ লক্ষই হোক, তার কোনো গুরুত্ব নেই—যদি তার আসল নীট আয়, তার খাজনা ও মুনাফা একই থাকে। ( রিকার্ডো, পূর্বোক্ত, ৭১৬)। দীর্ঘকাল আগে, আর্থার ইয়ং যিনি ছিলেন উত্ত-উৎপন্নের একজন প্রবল প্রবক্তা কিন্তু বাকি সব বিষয়ে একজন এলোমেলো ও ভাসাভাসা লেখক, যার খ্যাতি তার কৃতির সঙ্গে বিপরীত সম্পর্কে সম্পকিত, সেই আর্থার ইয়ং বলেন, একটি আধুনিক রাজ্যে একটি গোটা দেশ যদি এই ভাবে বিভক্ত হয় (পুরনো রোমের মত, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন চাষীদের দ্বারা ), তা যতই ভাল ভাবে কর্ষিত হোক না কেন, তা কোন কাজে লাগে—একমাত্র মানুষ প্রজননের কাজ ছাড়া, যাকে একক ভাবে দেখলে, সবচেয়ে অকেজো কাজ?’ (আর্থার ইয়ং “পলিটিক্যাল অ্যারিথমেটিক ইত্যাদি”, লণ্ডন ১৭৭৪ পৃঃ ৪৭)।
“নীট ধনকে শ্রমজীবী শ্রেণীর পক্ষে কল্যাণকর হিসাবে দেখাবার প্রবণতা খুবই আশ্চর্যজনক, যদিও তা স্পষ্টতই নীট বলে নয়।” (হপকিন্স, “অন রেন্ট অব ল্যাও,” লণ্ডন, ১৮২৮, পৃঃ ১২৬)
১০. শ্রম-দিবস
দশম অধ্যায় — শ্রম–দিবস
১০.১ শ্রম–দিবসের সীমা
আমরা শুরুতে ধরে নিয়েছিলাম যে শ্রমশক্তিকে তার মূল্য অনুসারে ক্রয়-বিক্রয় কৰা হয়। অন্য সব পণ্যের মূল্যের মত, তার মূল্য নির্ধারিত হয় তার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমের দ্বারা। যদি শ্রমিকের দৈনিক জীবনধারণের উপায় উপকরণ উৎপাদন করতে গড়পড়তা ৬ ঘণ্টা লাগে, ত হলে তাকে দৈনিক শ্রমশক্তি উৎপাদন করতে বা তার বিক্রয়লব্ধ মূল্য পুনরুৎপাদন করতে তাকে প্রতিদিন গড়পড়তা ৬ ঘণ্টা করে কাজ করতে হবে। তার শ্রম-দবসের আবশ্যিক অংশ দাড়ায় ৬ ঘণ্টা এবং অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, এই আবশ্যিক অংশ দা চায় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ। এই সঙ্গে স্বয়ং শ্রম-দিবসের দৈর্ঘ্য কিন্তু এখনো নির্দেশিত হয়নি।
ধরা যাক যে, ক খ রেখাটি আবশ্যিক শ্রম-সময়ের দৈর্ঘ্যের প্রতিনিধিত্ব করেছে, যেমন ৬ ঘণ্টা। ক খ রেখাটিকে ছাড়িয়ে যদ শ্রমকে ১, ৩, বা ৬ ঘণ্টা বাজানো যায়, তা হলে আমরা আরো ৩টি রেখা পাই :
১নং এম-দিবস ২নং শ্রম দিবস ৩নং শ্রম দিবস
ক—খ-গ ক—খ—গ ক—খ—গ
এই ৩টি ভিন্ন ভিন্ন শ্রম-দিবস যথাক্রমে ৩, ৯ ও ১২ ঘণ্টার শ্রম-দিবসের প্রতিনিধিত্ব করছে। ক খ রেখাটির প্রসারিত অংশ খ গ প্রতিনিধিত্ব করছে উদ্ধও শ্রমে। যেহেতু এম-দিবস হচ্ছে ক + গ অর্থাৎ ক গ, সেইহেতু পরিবর্তনীয় রাশি এ গ-র পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এম-দিবসেও পরিবর্তিত হয়। যেহেতু কথা হচ্ছে স্থির, সেইহেতু ক খ-র সঙ্গে এ গ-র অনুপাত সব সময়েই হিসাব করা যায়। ১নং শ্রমদিবসে, ক -র সঙ্গে এই অনুপাত দাড়ায় ৫, ২নং শ্রম-দিবস ২, ৩নং এম-দিবসে। অধিকন্তু যেহেত উদ্ধও শ্রম-সময়। আবশ্যিক শ্রম-সময়। হারটি নির্ধারণ করে, সেইহেতু এই শেষোক্তটি নির্দেশিত হয় ক -র সঙ্গে খ গ অনুপাতের দ্বারা। ৩টি ভিন্ন শ্রম-দিবসে উদ্ধও-মূল্যের হারটি দাড়ায় যথাক্রমে ১৬, ৫০ এবং ১০। অন্যদিকে উত্তমূল্যের হারটি একক ভাবেই আমাদের কাছে শ্রম-দিবসের দৈর্ঘ্য নির্দেশ করে না। যদি এই হার হত ধরা যাক, ১০০ শতাংশ, তা হলে এম-দিবস হতে পারত ৮, ১০, ১২ কিংবা আরো বেশি ঘণ্টা। তা থেকে এটা বোঝা যেত যে শ্রম-দিবসের দুটি সংগঠনী অংশ, যথা আবশ্যিক শ্রম-সময় উত্তম-সময়, দৈর্ঘ্যে সমান, কিন্তু এটা বোঝা যেত না যে এই দুটি অংশের প্রত্যেকটি কতটা দীর্ঘ।
