সিনিয়র তার শেষ ঘণ্টার রণ-হুংকার উদ্ভাবন করেছিলেন ১৮৩৬ সালে।[৩] ১৮৪৮ সালে ১৫ই আগষ্টের লণ্ডন ইকনমিস্ট-পত্রিকায় সেই একই রণহুংকার আবার তোলেন একজন উচ্চ-মর্যাদা সম্পন্ন অর্থ নৈতিক রাজপুরুষ, জেমস উইলসন : এইবারে প্রস্তাবিত ১০ ঘণ্টার আইনের বিরোধিতায়।
————
১. সিনিয়র, পূর্বোক্ত, পৃঃ ১২, ১৩। যেসব অসাধারণ ধারণা আমাদের কাজে গুরুত্বহীন, সেগুলি আমরা পরিহার করছি; যেমন, এই উক্তিটি যে, যন্ত্রপাতির ক্ষয়ক্ষতি পূরণের জন্য অর্থাৎ মূলধনের অংশবিশেষ প্রতিস্থাপনের জন্য। যে-পরিমাণটির দরকার হয়, কারখানা-মালিক সেটাকে তার মোট বা নীট মুনাফার অংশ বলে গণ্য করে। তেমনি তার পরিসংখ্যানের যথার্থতার প্রশ্নটিও আমরা উপেক্ষা করি। মিঃ সিনিয়র-এর কাছে একটি পত্র”, লণ্ডন, ১৮৩৭ শীর্ষক লেখাটিতে লিওনার্ড হর্নার দেখিয়েছেন যে তথাকথিত “বিশ্লেষণ”-এর তুলনায় এই পরিসংখ্যানের বেশি কিছু মূল্য নেই। লিওনার্ড ছিলেন ১৮৩৩ সালে কারখানা-তদন্ত কমিশন’-এর অন্যতম এবং ১৮৫৯ সাল পর্যন্ত ছিলেন কারখানা পরিদর্শক, বরং কারখানা-পরীক্ষক (সেন্সর’)। ইংল্যাণ্ডের শ্ৰমিক-শ্রেণীর স্বার্থে তার অবদানের মৃত্যু নেই। কেবল ক্রুদ্ধ মালিকদের বিরুদ্ধেই নয়, এমনকি মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধেও আজীবন সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছেন-যে মন্ত্রিসভার কাছে কারখানার “হাতগুলির কাজের ঘণ্টার সংখ্যার চেয়ে মালিকদের ভোটর সংখ্যা ছিল চের বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নীতির ক্ষেত্রে ভুল-ভ্রান্তি ছাড়াও, সিনিয়রের বক্তব্যটি গোলমেলে। যেমন শ্রম দিবসকে, তেমন শ্রম-বর্ষকেও ১১ ঘণ্টা বা ২৩টি অর্ধ-ঘণ্টা দিয়ে গঠিত বলে ধারণা করা যায়, তবে প্রত্যেকটিকেই বছরের শ্রম-দিবসের সংখ্যা দিয়ে গুণ করতে হবে। এই ধারণার ভিত্তিতে, ২৩টি অর্ধ-ঘণ্টা দেয় £১,১৫,০০০ মূল্যের বার্ষিক উৎপাদন; একটি অর্ধ-ঘণ্টা দেয় ১/২৩ x ৪১, ১৫,০০০; ২০টি অর্ধ-ঘণ্টা দেয় ২০/২৩ x £১,১৫,০০০, তার মানে তারা অগ্রিম-প্রদত্ত মূলধনের চেয়ে বেশি কিছু প্রতিস্থাপিত করে না। অতঃপর থেকে যায় ৩টি অর্ধ-ঘণ্টা, যা দেয় ৩/২৩ x£১,১৫,০০০ = £১৫, ০০, যেটা মোট মুনাফা। এই ৩টি অর্ধ-ঘণ্টার মধ্যে একটি দেয় ১/২৩x৪১,১৫,০০০ = £৫,০০০, যা যন্ত্রপাতির ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে; বাকি ১টি অর্ধ-ঘণ্টা অর্থাৎ শেষের ঘণ্টাটি দেয় ২/২৩x১,১৫,০০০ = ৩,০০০, যেটা হচ্ছে নীট মুনাফা। বইতে সিনিয়র উৎপন্ন প্রব্যের ২/২৩ অংশকে রূপান্তরিত করেছেন খোদ শম-দিবসেরই অংশে।
২. এক দিকে, সিনিয়র যদি প্রমাণ করে থাকেন যে, মালিকের নীট মুনাফা, ইংল্যাণ্ডের তুলে শিল্পের অস্তিত্ব এবং বিভিন্ন বাজারের উপরে ইংল্যাণ্ডের কর্তৃত্ব নির্ভর বরে ‘কাজের শেষ ঘণ্টা’র উপরে, অন্য দিকে আবার ডঃ উরে দেখান যে যদি ১৮ বছরের কম-বয়সী শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের কারখানার উষ্ণ ও নৈতিক আবহাওয়ায় পুরো ১২ ঘণ্টা না রেখে, তাদের এক ঘণ্টা আগে এই হৃদয়হীন সংযমহীন বাইরের জগতে বের করে দেওয়া হয়, তা হলে তারা তাদের আত্মার মুক্তিলাভের সকল আশা থেকে বঞ্চিত হবে। ১৮৪৮ সাল থেকে কারখানা-পরিদর্শকের অক্লান্ত ভাবে এই ‘শেষ’, এই ‘মারাত্মক ঘণ্টাটি নিয়ে টিটকারি দিয়ে চলেছেন। যেমন হাওয়েল তার ১৮৫৫ সালের ৩১শে মে’র রিপোর্টে লিখেছেন : যদি নিচেকার এই সুকৌশলে রচিত হিসাবটি (তিনি সিনিয়য় থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যদি সঠিক হত, তা হলে যুক্তরাজ্যের প্রত্যেকটি তুলো-কারখানাই ১৮৫০ সাল থেকে লোকসানে চলত। (কারখানা-পরিদর্শকদের রিপোর্ট’, ১৮৫৫ পৃঃ ১৯, ২.)। ১৮৪৮ সালে ১০ ঘণ্টার আইনটি পাশ হয়ে যাবার পরে, ডর্মেট ও সমার্সেট-এর সীমানায় ইতস্তত বিক্ষিপ্ত শণ-কলের কয়েকজন মালিক তাদের কিছু কর্মীর উপরে ঐ আইনটির বিরুদ্ধে একটি আবেদন চাপিয়ে নিল। উক্ত আবেদনটির একটি অনুচ্ছেদ এই : আপনার আবেদনকারীরা মাতা-পিতা হিসাবে মনে করেন যে অন্য কিছুর তুলনায় অতিরিক্ত এক ঘণ্টার বিশ্রামই শিশুদের অধিকতর নৈতিক অধঃপতন ঘটাবে, কেননা তারা বিশ্বাস করেন যে আলস্যই হচ্ছে সকল পাপের জনক। এই প্রসঙ্গে ১৮৪৮ সালের ৩১শে অক্টোবরের কারখানা-রিপোর্টে বলা হয়েছে : ‘এই ধর্মনিষ্ঠ ও কোমল প্রাণ মাতাপিতাদের শিশুরা যে পরিবেশে কাজ করে, তা কাচামাল থেকে ছড়িয়ে পড়া ধূলো ও আঁশে এমন ভারাক্রান্ত যে এমনকি ১০ মিনিটের সুতো কাটার ঘগুলিতে দাড়িয়ে থাকা চরম কষ্টকর, কেননা সঙ্গে সঙ্গে আপনার চোখ, কান, নাসারন্ধ্র ও মুখগহ্বর শণের ধুলোর মেঘে ভরে যাবে এবং আপনি অত্যন্ত যন্ত্রণাকর সংবেদন ছাড়া দাড়িয়ে থাকতে পারবেন না; এই ধূলোর মেঘ থেকে কোনো নিস্তার নেই। যন্ত্রের তীব্র ক্ষিপ্রগতির দরুন শুধু শ্রমের জন্যই চাই তীক্ষ ও অবিশ্রান্ত তদারকির নিয়ন্ত্রণের অধীনে দক্ষতা ও তৎপরতার অবিরত ব্যবহার এবং মাতাপিতার। যখন তাদের নিজেদেরই শিশুদের উপরে—যারা খাবার সময়ের পরেই এই কাজে পুরো ১০ ঘণ্টা শৃংখলিত থাকে, তাদের উপরে আলসেমি’ শব্দটা প্রয়োগ করেন, তখন বেশ কঠোর শোনায়। এই শিশুরা আশেপাশের গ্রামগুলির শ্রমিকদের চেয়ে ঢের বেশি। সময় খাটে। আলস্য ও পাপ সম্পর্কে এই ধরনের নিষ্ঠুর কথাকে নির্ভেজাল ভাওতা ও নির্লজ্জতম শঠতা বলে চিহ্নিত করা উচিত। জনসাধারণের যে অংশ, যারা প্রায় ১২ বছর আগে এই নিশ্চিত ঘোষণার দ্বারা বিস্ময়হত হন, উচ্চতম কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পুষ্ট যে-ঘোষণাটিতে সরবে ও সাগ্রহে বিঘোষিত হয়েছিল যে কারখানা-মালিকের গোটা নীট মুনাফাটাই উদ্ভূত হয় শেষ ঘণ্টার শ্রম থেকে এবং, সেই কারণে, কাজের দিনটি যদি এক ঘণ্টা কমানো হয়, তা হলে তার নীট মুনাফাটা ধ্বংস হয়ে যাবে, জনসাধারণের সেই অংশটি তাদের নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারবেন না যখন দেখতে পাবেন যে ‘শেষ ঘণ্টা’-র মূল গুণগুলির তারপর থেকে এতটা উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে, যে তাদের মধ্যে কেবল নৈতিকতাই নয় সেই সঙ্গে মুনাফাও অন্তভুক্ত হয়েছে, যার ফলে শিশুদের কাজের সময় যদি পুরো ১০ ঘণ্টাতে কমিয়ে আনা যায় তা হলে এক দিকে শিশুদের নীতিবোধের সঙ্গে সঙ্গে মালিকদের নীট মুনাফাও অন্তহিত হয়ে যাবে, কেননা দুটোই নির্ভর করে সেই শেষ তথা মারাত্মক ঘণ্টাটির উপরে। (দ্রষ্টব্য : কারখানা পরিদর্শকের বিপোর্ট, ৩১শে অক্টোবর, ১৮৪৪, পৃঃ ১০১)। সেই একই রিপোর্টে তারপরে দেওয়া হয়েছে এই পূতচিত্ত মালিকদের নীতি ও ধর্ম বোধের কয়েকটি দৃষ্টান্ত প্রথমে অসহায় শ্রমিকদেরকে এই জাতীয় আবেদনে সই করাবার জন্য এবং পরে সেগুলিকে একটি গোটা শিল্প-শাখার, এমনকি গোটা দেশের আবেদন হিসাবে পার্লা মেণ্টের উপরে চাপিয়ে দেয়ার জন্য কি কি চালাকি, ছলাকলা, স্তোকবাক্য, ভীতি প্রদর্শন ও মিথ্যাচারের আশ্রয় তারা নিয়ে থাকে, তার কয়েকটি দৃষ্টান্ত। তথাকথিত অর্থনৈতিক বিজ্ঞানের বর্তমান মর্যাদার পক্ষে এটা অত্যন্ত বৈশিষ্টসূচক, কেন না সিনিয়র নিজে—যার সম্মানার্থে এটা বলা উচিত যে তিনি পরবর্তী এক সময়ে প্রবল ভাবে কারখানা-আইনের সমর্থনে পঁড়ান, না, তার বিরোধীদের একজনও-প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কেউ-মূল আবিষ্কারটি’-র মিথ্যা সিদ্ধান্তগুলি ব্যাখ্যা করতে পেরেছেন। তারা আবেদন করেছেন বাস্তব অভিজ্ঞতার কাছে, কিন্তু কার্যকারণ রহস্যাবৃতই থেকে গিয়েছে।
