“এখন বিশ্লেষণ (!) করলে দেখা যাবে এই নিয়মে পরিচালিত একটি কারখানায়, গোটা নীট মুনাফাটাই অর্জিত হয় শেষ ঘণ্টাটি থেকে। আমি ধরে নেব যে একজন কারখানা-মালিক বিনিয়োগ করল ৫১,০০,০০০ :-কারখানা ও মেশিনারিতে ৫৮০,০০০ এবং কাচামাল ও মজুরিতে £২০,০০০। মুলধন বছরে একবার আবর্তিত হয় এবং মোট মুনাফা হয় শতকরা ১৫ ভাগ—এটা ধরে নিলে, বার্ষিক প্রতিদান (রিটার্ণ’ ) হওয়া উচিত £১,১৫,০০ . মূল্যের দ্ৰব্যসম্ভার।…এই £১,১৫,০০০-এর মধ্যে, তেইশটি অর্ধ ঘন্টার কাজের প্রত্যেকটি উৎপাদন করে ১ ভাগ বা তেইশ ভাগের এক ভাগ। এই তেইশটি কৃত ভাগ ( যাতে হয় সমগ্র ১,১৫,০০০ ), কুড়িটি অর্থাৎ £১,১৫,০০০-এর মধ্যে ১,০৩,০০, কেবল মূলধনকে প্রতিস্থাপিত করে;-তেইশ ভাগের এক ভাগ ( অথবা £১,১৫,০০০-এ মধ্যে ৫,০০০ ) কারখানা ও যন্ত্রপাতির অবচয় পূরণ করে। বাকি ২৩ ভাগের ২ ভাগ, অর্থাৎ প্রত্যেকটি দিনের তেইশটি অর্ধ-ঘণ্টার সর্বশেষ দুটি অর্থ-ঘণ্টা উৎপাদন করে ১০ শতাংশ নীট মুনাফা। সুতরাং, যদি (দাম একই আছে ) বিনিয়োজিত আবর্তনশীল মূলধনের সঙ্গে আরো প্রায় ২,৬০০ যোগ করে কারখানাটিকে সাড়ে-এগারো ঘণ্টার পরিবর্তে তের ঘণ্টা চালু রাখা যেত, তা হলে নীট মুনাফা দ্বিগুণেরও বেশি হত। অন্য দিকে, যদি কাজের ঘণ্টা দৈনিক এক ঘণ্টা করে কমানো হত ( দাম একটি আছে ধরে নিয়ে, তা হলে নীট মুনাফা ধ্বংসপ্রাপ্ত হত—যদি তা দেড-ঘণ্টা করে কমানো হত তা হলে মোট মুনাফাও ধ্বংস হয়ে যেত।“[১]
এবং অধ্যাপক মহোদয় একে বলেন “বিশ্লেষণ*! কারখানা-মালিকদের সোরগোলের উপরে আস্থা স্থাপন করে, তিনি যদি বিশ্বাস করে থাকেন যে কর্মীরা দিনের সর্বশ্রেষ্ঠ অংশটি ব্যয় করে বাড়ি-ঘর, যন্ত্রপাতি, তুলো, কয়লা ইত্যাদির উৎপাদনে অর্থাৎ পুনরুৎপাদনে বা প্রতিস্থাপনে, তা হলে তার বিশ্লেষণ বাহুল্য মাত্র। তার উত্তরটি হত সরল :-ভদ্রমহোদয়গণ, যদি আপনারা আপনাদের কারখানাগুলি ১১২ ঘন্টার পরিবর্তে ১০ ঘণ্টা রাখেন, তা হলে, বাকি সব কিছু অপরিবর্তিত থাকলে, তুলো, যন্ত্রপাতি ইত্যাদির দৈনন্দিন পরিভোগও আনুপাতিক ভাবে কমে যেত। আপনারা যতটা লাভ করতেন, ততটাই হারাতেন। আপনাদের কর্মীরা ভবিষ্যতে অগ্রিম-প্রদত্ত মূলধনের পুনরুৎপাদনে তথা প্রতিস্থাপনে দেড-ঘণ্টা করে কম সময় ব্যয় করত।অন্য দিকে, যদি তিনি আরো অনুসন্ধান না করে তাদের বিশ্বাস না করতেন, বরং এই জাতীয় বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবার দরুন বিবেচনা করতেন যে একটা বিশ্লেষণ আবশ্যিক, তা হলে এমন একটা প্রশ্নে যা একান্ত ভাবেই শ্রম-দিবসের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে নীট মুনাফার সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত, তা হলে তার উচিত ছিল সব কিছুর আগে কারখানা-মালিককে সতর্ক হতে অনুরোধ করা যেন সে যন্ত্রপাতি, কর্মশালা, কাচামাল ও শ্রমকে দলা পাকিয়ে না ফেলে, বরং সৌজন্যভরে বাড়িঘর, যন্ত্রপাতি, কঁচামাল ইত্যাদির বিনিয়োজিত স্থির মূলধনকে হিসাবের এক দিকে রাখে এবং মজুরি বাবদ অগ্রিম-প্রদত্ত মূলধনকে রাখে অন্য দিকে। অধ্যাপক মহোদয় যদি তখন দেখেন যে, কারখানা-মালিকদের হিসাব অনুযায়ী, শ্রমিক তার মজুরি পুনরুৎপাদন বা প্রতিস্থাপন করছে ২টি অর্ধ-ঘণ্টায়, তা হলে তার উচিত হবে তার বিশ্লেষণটি এই ভাবে চালিয়ে যাওয়া :
আপনাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী শ্রমিক তার মজুরি উৎপাদন করে শেষ ঘণ্টার আগের ঘণ্টায় এবং আপনাদের উদ্বৃত্ত-মূল্য বা নীট মুনাফা উৎপাদন করে শেষের ঘণ্টায়। এখন, যেহেতু সমান সময়কালে সে উৎপাদন করে সমান পরিমাণ মূল্য, সেই হেতু শেষ ঘণ্টার আগের ঘণ্টার উৎপাদনের মূল্য নিশ্চয়ই শেষ ঘণ্টার উৎপাদনের মূল্যের সমান হবে। অধিকন্তু, সে যখন শ্রম করে কেবল তখনি সে আদৌ কোনো মূল্য উৎপাদন করে না, এবং তার শ্রমের পরিমাপ করা হয় তার শ্রম-সময়ের দ্বারা। আপনারা বলেন, এর পরিমাণ পঁাড়ায় দিনে ১১২ ঘণ্টা। এই ১১ ঘণ্টার মধ্যে একটা অংশ সে নিয়োগ করে তার মজুরি উৎপাদন বা প্রতিস্থাপন করতে আর বাকি অংশ নিয়োগ করে আপনাদের নীট মুনাফা উৎপাদন করতে। এর বাইরে আদৌ কিছু করে না। কিন্তু যেহেতুই আপনাদের ধারণা মতে, তার মজুরি এবং যে উদ্বৃত্ত মূল্য সে দেয়। তা পরস্পরের সমান, সেহেতু এটা পরিষ্কার, সে তার মজুরি উৎপাদন করে ৫ ঘণ্টার এবং আপনাদের নীট মুনাফা বাকি ৫৪ ঘণ্টায়। আবার, যেহেতু ২ ঘণ্টায় উৎপাদিত সুতোর মূল্য তার মজুরি এবং আপনাদের নীট মুনাফার মূল্যটির যোগফলের সমান, সেহেতু এই সুতোর মূল্যের পরিমাপ অবশ্যই হবে ১১৫ ঘণ্টা, যার মধ্যে ৫ ঘণ্টা হল শেষের ঘণ্টার আগেকার ঘণ্টায় উৎপাদিত সুতোর মূল্যের পরিমাপ এবং ৫৪ ঘণ্টা হল শেষের ঘণ্টায় উৎপাদিত সুতোর মূল্যের পরিমাপ। এবারে আমরা একটি সূক্ষ্ম ব্যাপারে এসে পড়ি; সুতরাং একটু মনোযোগ দিন। কাজের শেষ ঘণ্টার আগেকার ঘণ্টাটি, প্রথম ঘণ্টাটির মতই, একটি মামুলি কাজের ঘণ্টা, তার চেয়ে কিছু বেশিও নয়, কমও নয়। তা হলে কেমন করে কাটুনী পারে এক ঘণ্টায়, সুতোর আকারে এমন একটি মূল্য উৎপাদন করতে যা মূর্তায়িত করে ৫ ঘণ্টায় শ্রম? সত্য কথা এই যে সে এমন কোনো ভেলকি ঘটায় না। এক ঘণ্টায় তার দ্বারা উৎপাদিত ব্যবহার মূল্য হল একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সুতো। এই সুতোর মূল্যের পরিমাপ হল ৫৪ কাজের ঘণ্টা, যার মধ্যে ৪৪ ঘণ্টা, তার কোনো সহায়তা ছাড়াই, আগেই মূর্তায়িত হয়েছিল উৎপাদনের উপায় সমূহের মধ্যে, তুলো, যন্ত্রপাতি ইত্যাদির মধ্যে; একমাত্র বাকি একটি ঘণ্টাই সংযোজিত হয়েছে তার দ্বারা, যেহেতু তার মজুরি উৎপাদিত হয় ৫৪ ঘণ্টায় এবং এক ঘণ্টায় উৎপাদিত সুতোও ধারণ করে ৫৪ ঘণ্টার কাজ, সেহেতু ঐ ফলের মধ্যে কোনো ভোজবাজি নেই, তার ৫৪ ঘণ্টা সুতো ােেনার ফলে সৃষ্ট মূল্যটি এক ঘণ্টায় বোনা উৎপন্ন দ্রব্যটির মূল্যের সমান। আপনার সম্পূর্ণ ভুল করবেন যদি ভাবেন যে তুলো যন্ত্রপাতি ইত্যাদির মূল্য পুনরুৎপাদনে বা প্রতিস্থাপনে সে একটি মাত্র মুহূর্তও হারায়। উটো, যেহেতু তার শ্রমই তুলো আর টাকুকে সুতোয় রূপান্তরিত করে, সেই সুতো কাটে সেহেতুই তুলল আর টাকুর মূল্য তাদের স্বেচ্ছায় সুতোয় চলে যায়। এই ফল তার শ্রমের গুণমান থেকে উদ্ভূত, পরিমাণ থেকে নয়। এটা সত্য যে, অর্ধ-ঘণ্টায় সে যতটা মূল্য স্থানান্তরিত করবে তার চেয়ে এক ঘণ্টায় সে তুলোর অকারে, সুতোয় বেশি মূল্য স্থানান্তরিত করবে, কিন্তু সেটা কেবল এই কারণে যে অর্ধ-ঘণ্টায় সে যতটা তুলোকে সুতোয় পরিণত করতে পারে, এক ঘণ্টায় সে তার চেয়ে বেশি তুলোকে সুতোয় পরিণত করতে পারে। তা হলে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, শেষ ঘণ্টার আগের ঘণ্টায় শ্রমিক তার মজুরির মূল্য উৎপাদন করে এবং শেষ ঘণ্টায় করে আপনাদের নীট মুনাফা—আপনাদের এই উক্তির মানে এর চেয়ে বেশি কিছু নয় যে, সে ২টি কাজের ঘণ্টায় যে-সুতো উৎপাদন করে, তা সেই ঘণ্টা দুটি প্রথম ২ ঘণ্টাই হোক বা শেষ ২ ঘণ্টাই হোক, সেই সুতোয় বিধৃত হয় ১১২ কাজের ঘণ্টা অর্থাৎ ঠিক একটি গোটা দিনের কাজ; যার মানে তার নিজের কাজের ২ ঘন্টা এবং অন্যান্য লোকের কাজের ১২ ঘণ্টা। এবং আমার বক্তব্য যে, প্রথম ৫ ঘণ্টায় সে উৎপাদন করে তার মজুরি আর শেষ ৫ ঘণ্টায় আপনাদের নীট মুনাফা, সেই বক্তব্যের মানে দাঁড়ায় এই যে আপনারা তাকে প্রথমটির জন্য পারিশ্রমিক দেন কিন্তু দ্বিতীয়টির জন্য দেন না। শ্রমশক্তির পারিশ্রমিক বলার বদলে আমি যখন শ্রমের পারিশ্রমিক বলি, তখন আমি কেবল আপনাদের ব্যবহৃত অশুদ্ধ কথাটাই ব্যবহার করি। এখন, ভদ্রমহোদয়গণ, এখন যদি আপনারা যে-কাজের সময়ের জন্য মূল্য দেন না তার সঙ্গে যে-কাজের সময়ের জন্য মূল্য দেন সেটা তুলনা করেন, তা হলে দেখতে পাবেন যে একটি অর্ধদিবসের তুলনায় আরেকটি অর্ধদিবস যে-বকম, এই দুটি সময়ও পরস্পরের তুলনায় সেই রকম; তা থেকে যে-হারটি বেরিয়ে আসে সেটি হচ্ছে ১০০% এবং এই হারটি অতীব মনোরম। অধিকন্তু এ ব্যাপারে এতটুকুও সন্দেহ নেই যে, ১১২ ঘণ্টার বদলে আপনারা আপনাদের “হাতগুলিকে” ১৩ ঘন্টা পরিশ্রম করতে বাধ্য করেন, এবং আপনাদের কাছ থেকে যেটা প্রত্যাশা করা যায় ঐ বাড়তি দেড় ঘণ্টায় সম্পাদিত কাজকে গণ্য করেন নিছক উত্ত-শ্রম হিসাবে; অতঃপর ঐ উত্ত-শ্রম বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে ৫ ঘণ্টার শ্রম থেকে ৭ ঘণ্টার শ্রমে এবং উদ্বৃত্ত মূল্যের হার বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে ১০০% থেকে ১২৬%। অতএব, আপনারা এই প্রত্যাশায় সম্পূর্ণ সুনিশ্চিত যে, শ্রম-দিবসের সঙ্গে এই ১২ ঘণ্টার সংযোজনের ফলে উদ্ব-মূল্যের হার ১০০% থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ২০ ০% কিংবা আরো বেশি; অর্থাৎ সেটা হবে “দ্বিগুণেরও বেশি। অন্য দিকে—মানুষের হৃদয় একটি আশ্চর্য জিনিস বিশেষ করে যখন তাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া হয় টাকার থলিতে—আপনারা একটি অতিরিক্ত নৈরাজ্যবাদী মনোভাব গ্রহণ করেন, যখন আপনারা আশংকা করেন যে কাজের ঘণ্টাকে ১১২ থেকে ১০-এ কমালে, আপনাদের গোটা নীট মুনাফাটাই গোল্লায় যাবে। মোটেই তা নয়। বাকি সমস্ত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, উদ্বত্ত-শ্রম ৫৪ ঘন্টা থেকে পড়ে যাবে ৪ ঘণ্টায়, যে-সময়টাও এক অতীব লাভজনক উদ্ব-মূল্যের হার দেয়; যথা ৮২৪%। কিন্তু এই যে ভয়ংকর “শেষ ঘণ্টা”, যার সম্পর্কে আপনারা ‘মিলেনিয়াম বাদীরা ( সত্যযুগের অবশ্যম্ভাবিতায় বিশ্বাসীরা) শেষ বিচারের দিন, সম্পর্কে যত গল্পকথা রটনা করেছেন, সেই “শেষ ঘণ্টা” একটা “ষোল আনা বুজরুকি”। যদি এটা হয় তা হলে আপনাদের নীট মুনাফার কিংবা আপনারা যেসব বালক-বালিকাকে নিযুক্ত করেন, তাদের এবং তাদের মনের পবিত্রতার কোনো ক্ষতি হবে না।”[২] যখনি আপনাদের “শেষ ঘণ্টাটি” সত্যি সত্যিই ধ্বনিত হবে, তখনি অক্সফোর্ডের অধ্যাপক মহোদয়ের কথা ভাববেন। এবং এখন ভদ্রমহোদয়গণ “বিদায়। আবার যেন আমাদের দেখা হয় ঐ সুন্দরতর জগতে তবে তার আগে নয়।”
