এখন দেখানো হল, উৎপন্ন দ্রব্যের বিবিধ সংগঠনী অংশ—যে অংশগুলি কাজের দিক থেকে পরস্পর-বিভিন্ন সেগুলি কি ভাবে স্বয়ং উৎপন্ন দ্রব্যটির তদনুষঙ্গ আনুপাতিক অংশগুলির দ্বারা প্রকাশিত হয়।
উৎপন্ন দ্রব্যকে এই ভাবে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করা, যে অংশগুলির একটি প্রকাশ করে, কেবল উৎপাদন-উপায়সমূহের উপরে পূর্বে ব্যয়িত শ্রম, বা স্থির মূলধন, আর একটি অংশ প্রকাশ করে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যয়িত কেবল আবশ্যিক শ্রম এবং আরো একটি অংশ, সর্বশেষ অংশ, যা প্রকাশ করে ঐ একই প্রক্রিয়ায় ব্যয়িত কেবল উত্ত এম, উদ্বৃত্ত-মূল্য; এটা করা যতটা সহজ, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়-সেটা বোঝ। যাবে পরে, যখন জটিল ও এতাবৎকাল সমাধান হয়নি এমন সব সমস্যায় এটাকে প্রয়োগ করা হবে।
পূর্ববর্তী অনুসন্ধান আমরা মোট উৎপন্ন দ্রব্যটিকে গণ্য করেছি ১২ ঘণ্টার একটি এম-দিবসের চুড়ান্ত ফল হিসাবে, যে-ফলটি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। আমরা কিন্তু মোট উৎপন্ন দ্রব্যটিকে তার উৎপাদনের সকল পর্যায়ের মধ্য দিয়ে অনুসরণ করতে পারি; এবং এইভাবে আমরা আগেকার মত একই সিদ্ধান্তে উপনীত হব—যদি আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে উৎপাদিত আংশিক দ্রব্যগুলিকে চূড়ান্ত বা মোট উৎপন্ন দ্রব্যের কার্যগত ভাবে বিভিন্ন অংশ হিসাবে গণ্য করি।
কাটুনী ১২ ঘণ্টায় উৎপাদন করে ২০ পাউণ্ড সুতে অর্থাৎ ১ ঘণ্টায় ১৩ পাউণ্ড, কাজে কাজেই, ৮ ঘণ্টায় সে উৎপাদন করে ১৩৪ পাউণ্ড অর্থাৎ ১টি আংশিক উৎপন্ন দ্রব্য যা একটি গোটা দিনে বোনা সমস্ত তুলোর মূল্যের সমান। অনুরূপ ভাবে পরবর্তী ১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিটের সময়কালের আংশিক উৎপন্ন দ্রব্য দাঁড়ায় ২ পাউণ্ড সুতো : এটা প্রকাশ করে ১২ ঘণ্টায় পরিভুক্ত এম-উপকরণসমূহের মূল্য। পরবতী ১ ঘন্টা ১২ মিনিটে এই কাটুনী উৎপাদন করে ৩ শিলিং মূল্যের ২ পাউণ্ড সুতো, যে মূল্যটি তার ৬ ঘণ্টার আবশ্যিক শ্রমের সৃষ্ট গোটা মূল্যের সমান। সর্বশেষে, শেষ ১ ঘণ্টা ও ১২ মিনিটে সে উৎপাদন করে আরো ২ পাউণ্ড সুতো, যার মূল্য তার অর্ধ-দিবসের উত্ত শ্রমের দ্বারা সৃষ্ট উত্তমূল্যের সমান। হিসাবের এই পদ্ধতিটি ইংরেজ ম্যানুফ্যাকচার কারীদের দৈনন্দিন কাজে লাগে, তার মতে এই পদ্ধতিটি প্রমাণ করে যে শ্রম-দিবসের প্রথম ৮ ঘণ্টায় অর্থাৎ ৪ ভাগে, সে ফিরে পায় তার তুলোর মূল্য; এবং বাকি ঘণ্টাগুলিতেও তেমন তেমন। এটা একটি নিখুত নিভুল পদ্ধতিও বটে। আসলে এটা উপরে বর্ণিত প্রথম পদ্ধতিটিই বটে, পার্থক্য কেবল এই যে, যেখানে সম্পূর্ণায়িত উৎপন্ন দ্রব্যটির বিভিন্ন অংশগুলি পাশাপাশি সাজানো থাকে, সেই স্থান’ ( ‘স্পেস)-এর ক্ষেত্রে প্রযুক্ত না হয়ে এটা প্রযুক্ত হয়েছে কাল’ ( ‘টাইম’)-এর ক্ষেত্রে, যেখানে ঐ অংশগুলি পর-পর উৎপাদিত হয়। কিন্তু এর সঙ্গে অত্যন্ত বর্বর-সুলভ ধারণাও জড়িত হয়ে যেতে পারে, আরো বিশেষ ভাবে তাদের হাতে যারা কার্যক্ষেত্রে মূল্য দিয়ে মূল্য জন্মানোতেও যেমন আগ্রহী, তত্ত্বক্ষেত্রে ঐপ্রক্রিয়াটিকে ভুল বুঝতেও তেমনি আগ্রহী। এইসব লোকদের মাথায় এমন একটি ধারণা ঢুকে যেতে পারে যে, দৃষ্টান্ত হিসাবে ধরা যাক, আমাদের কাটুনীটি তার শ্রম-দিবসের প্রথম ৮ ঘণ্টায় উৎপাদন করে বা প্রতিস্থাপন করে তুলোর মূল্য; পরের ১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিটে ক্ষয়ে-যাওয়া শ্ৰম উপকরণগুলির মূল্য; পরের ১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট মজুরির মূল্য; এবং সে মালিকের জন্য উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের জন্য নিয়োগ করে কেবল সেই সু-পরিচিত ‘শেষের ঘণ্টাটি’। এই ভাবে সেই বেচারা কাটুনীকে বিবিধ ভেলকি সম্পাদন করতে হয়—কেবল সে যখন তুলো টাকু, স্টিম ইঞ্জিনের কয়লা, তেল ইত্যাদির সাহায্যে সুতো বোনে সেই একই সময়ে সেগুলিকে উৎপাদন করার ভেলকিটিই নয়, তার উপরে আবার একটি শ্রম-দিবসকে পাচটি শ্রমদিবসে পরিণত করার ভেলকিটিও বটে। কেননা আমাদের আলোচ্য দৃষ্টান্তটিতে কাচামাল ও শ্রম-উপকরণগুলির উৎপাদানের জন্য চাই প্রত্যহ ১২ ঘণ্টা করে ৪টি এম-দিবস এবং সেগুলিকে সুতোয় রূপান্তরিত করতে চাই আরো একটি এম-দিবস। ধনের প্রতি লিপ্সা যে এই ধরনের ভেলকিতে সহজ বিশ্বাস সৃষ্টি করে এবং সেটা প্রমাণ করার জন্য যে জোহুজুর তত্ত্ববাগীশদের কখনো অভাব হয় না, তার প্রমাণ ইতিহাস বিত এই নিয়োক্ত ঘটনাটি।
.
.
৯.৩ সিনিয়র–এর “শেষ ঘণ্টা”
১৮৩৬ সালে এক শুভ প্রভাতে নাসাউ ডবলু সিনিয়রকে, যাকে বলা যায় ইংরেজ অর্থনীতিবিদদের মাথা এবং যিনি তার অর্থনৈতিক বিজ্ঞান”-এর জন্য এবং সুন্দর রচনা-ভঙ্গির জন্য সমভাবে সুপরিচিত, তাকে ডেকে পাঠানো হল অক্সফোর্ড থেকে ম্যাঞ্চেস্টারে, যাতে তিনি শেষোক্ত জায়গায় শিখতে পারেন সেই রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, যা তিনি শেখান প্রথমোক্ত জায়গায়। কারখানা-মালিকেরা তাকেই নির্বাচন করল তাদের প্রবক্তা হিসাবে—কেবল নূতন পাশ-করা কারখানা-আইনের বিরুদ্ধেই নয়, সেই সঙ্গে তার চেয়েও আরো আতংকজনক দশ-ঘণ্টা আন্দোলনের বিরুদ্ধে। তাদের স্বাভাবিক ব্যবহারিক তী-বুদ্ধির সাহায্যে তারা ধরে ফেলেছিল যে প্রাজ্ঞ অধ্যাপকটির আরো বেশ কিছু তালিমের দরকার আছে;” এই আবিষ্কারের জন্যই তারা তার জন্য একটি পুস্তিকা লিখতে উদ্বদ্ধ হলেন, যার নাম : “কারখানা-আইন সম্বন্ধে পত্রাবলী : কিভাবে এই আইন তুলা-শিল্পকে আঘাত করে”, লণ্ডন, ১৮৩৭। অন্যান্য জিনিসের মধ্যে এখানে আমরা এখানে পাই এই স্বস্তিবিধায়ক অনুচ্ছেদটি: “বর্তমান আইনের অধীনে, ১৮ বছরের অনূর্ধ্ব বয়স্ক ব্যক্তিরা কাজ করে এমন কোনো কারখানা দিনে ১১২ ঘণ্টার বেশি চালু রাখা যায় না, তার মানে সপ্তাহে ৫ দিন ১২ ঘণ্টা করে এবং শনিবারে ১ ঘণ্টা করে।”
