আমার তখন মনে হতে লাগল, যুগ যুগ ধরে তোমাকে ভালোবাসি আমি। তোমার জন্যে আমার জীবন, ইজ্জত-আব্রু সব কুরবান করে দিতেও আমার কুণ্ঠা নেই।
সত্যই কি আব্রু কুরবান করে দিয়েছো? উল্কণ্ঠিতভাবে জিজ্ঞেস করল নাসের।
না, তাকে আমি নানা বাহানায় ভুলিয়ে রেখেছি। তবে সে বলেছে, তোমরা সবাই আমার দুর্গে আজাদ থাকবে বটে তবে নজরবন্দী, কখনও ইচ্ছে মতো বেরিয়ে যেতে পারবে না।
আমি তোমার ইজ্জত রক্ষা করবো লিজা!
তুমি আমার ভালোবাসা গ্রহণ করেছো?
একথায় নাসের কোন জবাব দিল না। নাসেরকে ট্রেনিংকালে বলা হয়েছিল, ইহুদী-খৃস্টানরা মুসলিম সেনা ও উমারাদের কজা করতে রূপসী তরুণীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলতে লেলিয়ে দেয়। বস্তুতঃ নাসেরের কাছে ট্রেনিংকালের সেই কথা এখন তিক্ত উপদেশবাণীর মতোই রূঢ় বলে মনে হতে লাগল। কারণ, এই ধরনের নারীর ফাঁদ থেকে বাঁচার কোন বাস্তব ট্রেনিং তো আর তাকে দেয়া হয়নি এবং তা দেয়া সম্ভবও ছিল না। এখন খৃস্টান তরুণীর পাতা ফাঁদে সে ধীরে ধীরে আটকে যেতে লাগল। তার মধ্যে জেগে উঠতে শুরু করল পৌরুষিক সত্তা। তরুণীর প্রতি তার মোহ সৃষ্টি হতে লাগল। লিজার তপ্ত নিঃশ্বাস, শরীরের গন্ধ আর রেশমী চুল ও ত্বকের মোহনীয় স্পর্শ ওকে ভুলিয়ে দিতে শুরু করল সে যে একজন তেজস্বী কমান্ডার। রুক্ষ মরু, কঠিন রণক্ষেত্রে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে অভ্যস্ত সে। কিন্তু লিজার কোমল স্পর্শ, বিগলিত নিবেদন আর ডাগর চোখের কাতর চাহনী লৌহ মানব নাসেরের মধ্যেও জন্ম দিতে শুরু করল আদিম উন্মাদনা। সে অনুভব করল, শরীরের মধ্যে পৌরুষিক শিহরণ। অন্য রকম এক অনুভূতি।
বহুবার এমন হয়েছে যে, শত্রুবাহিনীর তীর ওর গা ঘেঁষে চলে গেছে। শত্রুদের বর্শার আঘাতে আহত হয়েছে অসংখ্য বার। শত্রু বাহিনীর নিক্ষিপ্ত তীর বৃষ্টি, বর্শার শত আঘাতে কখনও তার মধ্যে বিন্দুমাত্র ভয়ের উদ্রেক করেনি। কিন্তু বিধর্মী তরণীর স্পর্শ, কমনীয়তা ও যাদুমাখা কণ্ঠের মায়াবী আবেদন নাসেরের হৃদয় রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিল।
পেশাগত বহু অপারেশনে জ্বলন্ত আগুন থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে এসেছে নাসের, এতটুকু দ্বিধা ও ভয় করেনি। হৃদয়ে জাগেনি সামান্যতম উৎকণ্ঠা। কিন্তু এই তরুণীর কোমল স্পর্শ তার মধ্যে যে কম্পন সৃষ্টি করেছে, তাতে তার পৌরুষিক সত্তা উতলে উঠেছে। এই কম্পন ও শিহরণ থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে না নাসের। অথচ যে কোন বিপদাশংকায় তার চেতনা বিদ্যুতের চেয়ে আরো দ্রুতগতিতে কাজ করে। লিজা যতোই নাসেরের ঘনিষ্ঠ হতে লাগল, নাসের ততই অনুভব করতে লাগল লিজার দূরত্ব তার মন বলছে ও যদি আরো ঘনিষ্ঠ হতো।
লিজা ছিল প্রশিক্ষিত। প্রতিপক্ষকে কিভাবে জব্দ করতে হবে দীর্ঘদিন ধরে তাকে সেই ট্রেনিং দেয়া হয়েছে।
মরুর তৃষ্ণা নাসেরকে যতোটুকু না দুর্বল ও অবচেতন করেছিল, তরুণীর সন্নিধ্য ও স্পর্শ তার চেয়ে অনেক বেশী অবচেতন করে দিল নাসেরকে। রাত যতই বেড়ে যাচ্ছিল লিজাকে আরো ঘনিষ্ঠভাবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে তীব্র হয়ে উঠছিল, নাসেরের যোদ্ধাসত্তা বিলীন হয়ে সেখানে স্থান করে নিচ্ছিল এক আদিমতা। শুরুতে নাসেরের অন্তরাত্মা লিজার স্পর্শে কেঁপে উঠেছিল, নিষিদ্ধ নারীর স্পর্শে তার মধ্যে জেগে উঠেছিল ঈমানী চেতনা। কিন্তু এক্ষণে সেখানে জায়গা করে নিয়েছে অন্য এক অনুভূতি, ভিন্নতর এক শিহরণ।
হ্যাঁ, আমি তোমার ভালবাসাকে গ্রহণ করে নিয়েছি, আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলল নাসের। কিন্তু এই ভালবাসার পরিণতি কি হবে? তুমি কি আমাকে একথা বলবে যে, আমি তোমার সাথে চলে যাবো? আমাকে কি একথাও বলবে যে, তুমি ধর্ম ত্যাগ করে আমাকে বিয়ে করে আমার দেশে চল?
এমন কোন কথা আমি এখনও ভাবিনি। বলল লিজা। তবে তুমি যদি আমাকে জীবনের জন্য বরণ কর তাহলে আমি ধর্ম ত্যাগ করে তোমার সাথে চলে যেতে দ্বিধা করব না। তুমি আমার কাছে যতো ইচ্ছা কঠিন ত্যাগ প্রত্যাশা করতে পারো কিন্তু আমার অনুরোধ, তুমি আমাকে নিখাদ ভালোবাসা দিবে সে কথা দাও। কৃত্রিম ভালোবাসা আমি যে কারো কাছ থেকে পেতে পারি কিন্তু তোমাকে আমার মনের মতো করে পেতে চাই।
ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে গেল নাসের। এদিকে তখন রাত অর্ধেক পেরিয়ে গেছে। তবুও নাসের লিজার সান্নিধ্য থেকে উঠার কথা ভাবতে পারছে না। লিজা তাকে স্মরণ করিয়ে দিল, তুমি কক্ষে চলে যাও, এ অবস্থায় ধরা পড়লে পরিণতি ভাল হবে না।
* * *
নাসের যখন কক্ষে প্রবেশ করল তখন তার সাথীরা ঘুমে অচেতন। শুয়ে পড়ল নাসের। কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই। লিজা যখন শোয়ার কক্ষে প্রবেশ করল তখন
তেরেসার চোখ খুলে গেল।
এতো দেরী! লিজাকে প্রশ্ন করল তেরেসা।
কি বল, পাথর কি এক ফুৎকারেই মোম বানানো যায়? বলল লিজা।
পাথর বটে, কিন্তু তেমন শক্ত তো নয়। বলল তেরেসা।
ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা আমারও ছিল না, তবে শেষ অস্ত্রটাও আমাকে ব্যবহার করতে হয়েছে, অবশ্য এখন সে আমার গোলাম। বলল লিজা।
এটা বলার দরকার নেই। তবে নিজেই মোম হয়ে গলে যেয়ো না কিন্তু। লিজার উদ্দেশে বলল তেরেসা।
লোক খুব সুন্দর। হাসতে হাসতে বলল লিজা। খুবই সাদামাটা লোক। আমার এমন লোককে খুব ভালো লাগে। তাই বলে আমাকে এতোটা বোকা মনে করো না তুমি। সাদাসিধে মানুষদের আমার ভাল লাগে। হতে পারে আমার এই ভাললাগা ধুরন্ধর, প্রতারক ও বিলাসী সাইফুদ্দীনের মতো কপট লোকদের সংস্পর্শে থেকে জন্ম নিয়েছে। বিলাসীদের প্রতি আমি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছি।
