নাসেরের সাথে গোমশতগীন ও খৃস্টান অফিসার যখন কথা বলছিল, তখন নাসেরের সাথীরা একটি বৃহদাকার কক্ষের আরামদায়ক বিছানায় বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। সেখানকার এক সেবকের কাছ থেকে নাসেরের সাথীরা জেনে নিয়েছিল দুর্গের ভিতরে এই কক্ষটির অবস্থান কোথায় এবং দুর্গের কোথায় কি রয়েছে। সেবক তাদের বলল, এটি একটি অতিথিশালা। বিশেষ মেহমানরা এখানে থাকে। তিন গুপ্তসৈনিক অনুভব করছিল, তাদের সাথে প্রকৃতপক্ষে বন্দীদের ব্যবহার নয় সম্মানিত অতিথিসুলভ ব্যবহারই করা হচ্ছে।
খৃস্টান কর্মকর্তা ও গোমশতগীন দীর্ঘসময় নাসেরকে বসিয়ে রেখে নানা কথার অবতারণা করল। নাসেরকে তারা যথোপযুক্ত সমীহ ও সম্মান দেখাচ্ছিল। ফলে এদের প্রতি বিতৃষ্ণা ও ক্ষোভ আনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছিল নাসেরের মনে।
অপরদিকে লিজা কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। দীর্ঘ আলাপচারিতার পর নাসের যখন খৃস্টান কর্মকর্তা ও গোমশতগীনের কক্ষ ত্যাগ করে তার জন্যে বরাদ্দকৃত কক্ষের দিকে এগুচ্ছে তখনও কক্ষে প্রবেশ করেনি। একটি করিডোর পেরিয়ে যাওয়ার পথে ক্ষীণ আওয়াজের একটি নারী কণ্ঠের আহ্বান ভেসে এলো তার কানে। জায়গাটি ছিল আবছা অন্ধকার। সুনির্দিষ্ট আহ্বানে ঠায় দাঁড়িয়ে গেল নাসের। একটি ছায়ামূর্তির মতো এগিয়ে এলো নাসেরের দিকে। তার বাজু ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, এখন তো বিশ্বাস হলো, আমি জিন নই মানুষ। ছায়ামূর্তিটি আর কেউ নয় লিজা।
আমি এখনও বুঝে উঠতে পারছি না আসলে কি সব ঘটছে।
তোমার উদ্বেগ যথার্থ। বলল লিজা। তুমি ব্যাপারটিকে গভীরভাবে বুঝতে চেষ্টা কর। গোমশতগীন তোমাকে বলেই দিয়েছে, সে আইয়ূবীর বিরোধিতা ত্যাগ করেছে। এখন সে আইয়ূবীর কোন সৈনিককে বাগে পেলেও বন্দী করবে না। তুমি ও তোমার বন্ধুদের সৌভাগ্য যে, তোমরা এখানে এসে গোমশতগীনকে পেয়ে গেছো। তোমার জন্যে দ্বিতীয় সৌভাগ্য আমি। তুমি হয়তো আমাকে চরিত্রহীনা মেয়ে ভাবছো, মনে করছো আমি জাগতিক মোহে আমীর শেরিফদের মনোরঞ্জনে শরীর বৃত্তে জড়িত। আসলে তোমার এ ধারণা ভিত্তিহীন। লিজা নাসেরের হাত ধরে বলল, এসো, একটু নিরিবিলি বসে কথা বলি। এসো না…., আমি তোমার ভ্রান্ত ধারণা দূর করার চেষ্টা করব। আগে আমার কথা শোন। এরপর তোমার যা ইচ্ছা তা ভেবো। সে ব্যাপারে তুমি স্বাধীন।
দুর্গের এ অংশটি ছিল জনশূন্য এবং নিরিবিলি। নানা গাছ-গাছালী ও ফুল-পুষ্পে সজ্জিত ছিল এ পাশটি। লিজা নানা কথাচ্ছলে নাসেরকে নিয়ে যখন আড়ালে যাচ্ছিল, খৃস্টান কর্মকর্তা ও তেরেসা তখন একটি দেয়ালের আড়াল থেকে লিজার ও নাসেরের গোপন অভিসার প্রত্যক্ষ করছিল।
লিজা ওকে কজা করে ফেলেছে। বলল কর্মকর্তা।
মেয়েটি অতি মাত্রায় আবেগ প্রবণ। নিজের কর্তব্য ভুলে গিয়ে ওই যোদ্ধার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করছিল সে। আমি তাকে সতর্ক করে দিয়েছি। অবশ্য সে এতোটা কাঁচাও নয়।
আসলে এতো অল্প বয়সে ওকে কঠিন মিশনে পাঠানো উচিৎ হয়নি। আমাদের উপস্থিতিতে সে কোন উল্টা-পাল্টা করবে না এই বিশ্বাস আমার আছে। বলল কর্মকর্তা।
লিজা নাসেরকে বলল, তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে, কেন আমি তোমার প্রতি এতোটা দয়ার্দ্র হয়ে উঠেছি। অবশ্য আমি তোমাকে একথা বুঝাতে পারিনি যে, তোমার আমার মধ্যে বিরোধের দেয়াল আমাদের শাসকদের সৃষ্ট এবং জাতিগত, মূলতঃ তোমার আর আমার মধ্যে কোন শত্রুতা নেই।
শত্রুতা নেই বটে তবে বন্ধুত্বেরই বা কি ভিত্তি আছে? বলল নাসের।
লিজা একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নাসেরের কাঁধে হাত রেখে বলল, তুমি একটা পাথর। আমি জানতাম, মুসলমানের হৃদয় নাকি খুব নরম হয় কিন্তু তুমি এর ব্যতিক্রম। একটু সময়ের জন্যে এসব ধর্মানুরাগ রেখে দাও, ভুলে যাও, তুমি আর আমি ভিন্ন দুটি গোত্রের নারী ও পুরুষ। একটু ভেবে দেখো, তুমি আর আমি মানুষ। তুমি পুরুষ আর আমি নারী। আচ্ছা, তোমার মধ্যে কি দয়ামায়া, প্রেমপ্রীতি, কোন কিছুর প্রতি আগ্রহ, কারো প্রতি অনুরাগ নেই? অবশ্যই আছে। কেননা, তুমি একজন সুঠাম পুরুষ। তুমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পার, কিন্তু আমি নিজেকে এতোটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমি অনিয়ন্ত্রিত। তোমার মহব্বত আমার হৃদয়ে শিকড় গেড়ে বসেছে।
তোমাদেরকে হাশিশ খাইয়ে নেশাগ্রস্ত করে যেদিন সিনানের দুর্গে নিয়ে এসেছিলাম, সেদিন সিনান তোমাদেরকে কারাগারে নিক্ষেপ করতে চেয়েছিল, এই বদমাশ বুড়োটার সাথে তেরেসা ও আমাকে অনেকক্ষণ তর্ক-বিতর্ক করতে হয়েছে, তোমাদেরকে কয়েদখানার লৌহ প্রাচীরের বাইরে রাখতে। তোমাদেরকে জেলখানায় বন্দী করে ফেললে আর জীবন্ত বের হওয়া সম্ভব ছিল না। এমতাবস্থায় তোমার মতো সুন্দর যুবকের সান্নিধ্য থেকে আমাকে বঞ্চিত হতে হতো। তুমি জেলখানায় ধুকে ধুকে মৃত্যুবরণ করো এটা আমি কিছুতেই বরদাশত করতে পারছিলাম না। বুড়োটা আমাকে প্রস্তাব করল, তুমি যদি এদেরকে জেলখানায় বন্দী করা থেকে বাঁচাতে চাও; তবে আমার শয্যাসঙ্গী হতে হবে। একথায় বুড়োটার প্রতি আমার মনে প্রচণ্ড ঘৃণা জন্মে গেল। আমি ওকে মুখের উপর কিছু শুনিয়ে দিলাম। এতে সে আরো ক্ষেপে গেল। বলল, হয় এরা জেলখানায় থাকবে নয়তো তুমি আমার সয্যাসঙ্গী হবে এর অন্যথা হবে না।
