শেষ পর্যন্ত ওর প্রতিও বীতশ্রদ্ধই থাকা উচিত। বলল তেরেসা। ভালবাসার যাদুটিকে আরো মোহনীয় ও ধারালো করে নিও। মনে রাখবে, ওকে দিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু আইয়ূবীকে খুন করাতে হবে। এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
লিজাকে আরো অনেক পরামর্শ দিল তেরেসা। দু চারটি অভিনব কৌশল প্রয়োগের কথাও বলল। এরপর উভয়েই শুয়ে পড়ল।
নাসেরও শুয়ে পড়েছিল কিন্তু তার চোখে ঘুম আসছিল না। একাকী লিজার প্রেম নিবেদনের ব্যাপারটিকে বিস্ময়াভিভূত হয়ে ভাবছিল, এ নিয়ে তার মনে জন্ম নিল দুটি ধারা। ট্রেনিংকালের সতর্কবাণী মনে পড়ল তার, সাথে সাথে মনে হলো লিজা একটি আলেয়া। খৃস্টান মেয়েরা শত্রুর যাদুর কাঠি। এভাবে মায়াবী আচরণ ও প্রেমের ফাঁদ তৈরী করেই এরা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে। পাশাপাশি তার মনে একথা আরো প্রবল হতে থাকল, প্রেমের ফাঁদের আশংকা যথার্থ হলেও লিজা সেই ফঁদ নয়। লিজার প্রেম ও ভালোবাসা নিখাদ। সুন্দর সুঠাম দেহের যুবক নাসের। চেহারা অবয়বে হাজার যুবকের চেয়ে সে আকর্ষণীয়। নিজের এই সৌন্দর্যের অনুভূতি বুঝতো নাসের। নিজের সৌন্দর্যের প্রতি মুগ্ধতা আর লিজার মতো রূপসী তরুণীর যাদুকরী সান্নিধ্য ও অকৃত্রিম প্রেম নিবেদন নাসেরের হৃদয়কে দুভাগ করে ফেলল। সে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল না, লিজাকে প্রত্যাখ্যান করবে, না জীবনের মতো করে ভালবাসবে। এমন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল নাসের।
ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে এক লোক জাগিয়ে দিল নাসেরকে। লোকটি বলল, তেরেসা তোমাকে ডাকছে।
নাসের উঠে লোকটির সাথে তেরেসার কক্ষে গিয়ে তার সামনে বসল। তেরেসা বলল, গতরাত তুমি লিজাকে নিয়ে গিয়েছিলে, না লিজা তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল, আমি সেকথা জিজ্ঞেস করব না। আমি শুধু বলতে চাই, মেয়েটি খুবই সরল সহজ। সে তোমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। কিন্তু আমি চাই না, তুমি লিজাকে নিয়ে রাতের পর রাত বাইরে কাটিয়ে দাও, আমি চাই লিজাকে তুমি প্রেমের
অভিনয় করে বিভ্রান্ত করবে না।
আমি এমনটি কখনও করিনি। জবাব দিল নাসের। কথা বলতে বলতে অবশ্য একটু দূরে চলে গিয়ে ছিলাম।
আমি লিজাকে একথা বলতে পারছি না যে, তোমার প্রেমে যেন সে ডুবে ডুবে পানি না খায়। তোমাকে আমি সতর্ক করে দিচ্ছি, মেয়েটির সারল্যপনার সুযোগ নিয়ে তুমি কোন অপচেষ্টা করো না।
লিজাও তোমার মতই রাজকন্যা। আর আমি তোমাদের বন্দী। রাজকন্যা যদি কোন বন্দীকে মন দিয়ে বসে, তাহলে বন্দীকেই শাহজাদা মনে করে নিজেকে বন্দীর কয়েদী ভাবতে থাকে। আমি তোমাদের বন্দী। বন্দী আর শাহজাদীর মধ্যে কি প্রেম হতে পারে?
নারীর চরিত্র সম্পর্কে হয়তো তুমি এতোটা জানো না। শাহজাদী প্রেমের টানে গোলামের কাছে নিজেকে সোপর্দ করে সকল খান্দানী সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে। লিজার সাথে কথা বলেছি আমি। সে বলেছে, আমার জীবন-মরণ সবকিছু নাসেরের জন্যে। সে যদি আমাকে ধর্ম ত্যাগ করতে বলে তবে গলা থেকে ক্রুশ ছুঁড়ে ফেলে দেবো আমি। তুমি জানো না নাসের! তোমার প্রেমে পড়ে লিজা দুর্গপতি শেখ সিনানকে পাত্তা দেয়নি। তাকে অপমান করে ক্ষেপিয়ে দিয়েছে। শেখ সিনান, তোমাকে ও তোমাদের সাথীদেরকে কয়েদখানায় বন্দী করতে চেয়েছিল, কিন্তু লিজা সিনানের প্রতিপক্ষ সেজে তোমাদেরকে জেলখানায় পাঠাতে দেয়নি। শেখ সিনান লিজাকে এমন কঠিন শর্ত দিয়েছে যা একজন প্রেমিকের জন্যে খুবই অবমাননাকর। ঘটনাক্রমে আমরা যদি এই দুর্গ থেকে বের না হতে পারি তবে মহা বিপদে পড়তে হবে। আমার মনে হয় তোমাকে বাঁচাতে লিজা শেখ সিনানের শর্ত মানতেও রাজী হবে।
না। এমনটি হতে দেবো না আমি। প্রয়োজনে লিজার ইজ্জতের জন্যে আমি জীবন দিয়ে দেবো।
লিজা তোমাকে যেভাবে ভালোবাসে, তুমিও কি তাকে ততটাই ভালোবাসো?
মেয়ে হয়ে সে যদি তার ভালোলাগার কথা প্রকাশ করতে কুণ্ঠাবোধ না করে তবে আমি অস্বীকার করবো কেন। আমি পুরুষ, লিজাকে আমি সত্যিই ভালোবাসি।
আমি শুধু এতটুকুই প্রত্যাশা করি যে তুমি মেয়েটিকে ধোঁকা দিবে না। বলল তেরেসা। আর মনে রেখো, এখন তোমরা এখানে বন্দী নও, তোমরা স্বাধীন। এছাড়া হিরনের দুর্গপতি গোমশতগীন তোমাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে এখানে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি তোমাদেরকে তার মেহমান মনে করেন।
নাসেরের মনের সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তেরেসার কথায় দূরে সরে গেল। তাতে লিজার প্রতি আকর্ষণ আরো বেড়ে গেল। উদগ্রীব হয়ে উঠলো সে লিজার জন্যে, লিজাকে দেখতে। তেরেসার কাছেই সে জিজ্ঞেস করে বসল, লিজা কোথায়? তেরেসা জামাল, সারারাত জেগে ছিল এখন পাশের কক্ষে ঘুমাচ্ছে। তেরেসার নিক্ষিপ্ত তীর লক্ষ্যভেদী প্রমাণিত হলো। সে কৌশল করে নাসেরের মনে লিজার প্রেমকে আরো তীব্র করে দিল। তেরেসা দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষিত, অভিজ্ঞ শিকারী। পুরুষের দুর্বল মানবিক ব্যাপারগুলো তার কাছে পানির মতো পরিষ্কার, সে মানুষের মানবিক দুর্বল জায়গাগুলোকে নিয়ে খেলতে অভ্যস্ত। নাসের যখন তেরেসার কক্ষ ত্যাগ করে নিজ কক্ষের দিকে যাচ্ছিল, তখন প্রেমের হাওয়াই রথে সে ঊর্ধ্বগামী। নিজেদের কক্ষে গেলে সাথীরা তাকে জিজ্ঞেস করল, এতোক্ষণ তুমি কোথায় ছিলে? সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলল, সব ঠিকই আছে, শীঘ্রই মুক্তির ব্যবস্থা হয়ে যাবে তোমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পার। প্রকৃতপক্ষে কমান্ডার নাসের তার কর্তব্য ভুলে লিজার প্রেমে ডুবে যেতে শুরু করল।
