এত চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর শেখ সিনানের তো হতাশ হওয়ারই কথা। বলল খৃস্টান কর্মকর্তা। ফেদাঈরা হাশীশে নেশাগ্রস্ত হয়ে আইয়ূবী হত্যা মিশনে বের হয়। এজন্য তাদের ব্যর্থ হতে হয়। তাদেরকে বুঝতে হবে, আইয়ূবীকে হত্যা করা কোন মাতাল কিংবা অসচেতন ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। আইয়ূবীকে হত্যা করতে হলে তার মতো বিচক্ষণ দূরদর্শী ও ধর্মানুরাগের লেবাস ধারণ করতে হবে। আপনি হয়তো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে বেশী বুঝেন না। আইয়ূবীকে নেশাগ্রস্ত হয়ে যারা হত্যা করতে যায় তারা নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, যখন তাদের সামনে কোন অঘটন ঘটতে শুরু করে তখন তাদের নেশা উবে যায়, আক্রমণকারীরা নিজের জীবন বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠে। এর বিপরীতে আইয়ূবীর বিরুদ্ধে যৌক্তিকভাবে উত্তেজিত ও আবেগপ্রবণ করে নেশাছাড়া কাউকে পাঠান, সে অবশ্যই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে সফল হবে।
শেখ সিনান আমাকে আইয়ূবীর চার যোদ্ধা দিয়েছে। বলেছে, এদেরকে তৈরী করে সাইফুদ্দীনকে হত্যা করিয়ে ফেল। কারণ এরা সাইফুদ্দীনকে শত্রু মনে করে, এজন্য এরা সাইফুদ্দীনের হত্যা মিশনে সফল হবে।
সাইফুদ্দীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার না করে এদেরকে আইয়ূবীর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্যে তৈরী করা যায় না কি? বলল খৃস্টান কর্মকর্তা। এদের উপর হাশীশ বা এ জাতীয় মাদক প্রয়োগ না করে আবেগের নেশা দিয়ে তৈরী করতে হবে।
এ ধরনের নেশা আপনিই তৈরী করতে পারবেন। বলল গোমশতগীন।
খৃস্টান কর্মকর্তা তেরেসা ও লিজার দিকে তাকিয়ে মুচকী হাসল।
লিজা বলল, আমি আইয়ূবীর গোয়েন্দা দলের কমান্ডারকে তৈরী করতে পারব, আপনি অন্যদের দায়িত্ব নিন।
ঠিক আছে, তুমি কমান্ডারকেই সামলাও। আর অন্যদেরকে তাদের অবস্থার উপরেই ছেড়ে দাও। বলল খৃস্টান কর্মকর্তা। মানুষের স্বভাব সম্পর্কে আমি যতটুকু জানি, নাসের নিজেই অন্যদেরকে সামলাবে।
কর্মকর্তা বলল, ওরা কোথায়? এদেরকে এখানে নিয়ে এসো। নাসেরকে এবং অন্যদের কক্ষ ভিন্ন করে দাও। আর তোমরাও একটু সচেতন থেকো। সিনান লিজার উপর শ্যেনদৃষ্টি রাখছে, লিজাকে সিনানের এতোই ভাল লেগেছে যে, ওকে কাছে পেতে লোকটি মরিয়া হয়ে উঠেছে। সে আমাকে হুমকি দিয়ে বলেছে, লিজাকে তার কাছে ছেড়ে না দিলে সে আমাকে বন্দী করে ফেলবে। লিজাকে তার কাছে ছেড়ে দেব কি দেবো না এজন্য ভাবতে আমাকে একরাত অবকাশ দিয়েছে সিনান।
এ ব্যাপারে আপনি চিন্তা করবেন না। শেখ সিনানের সম্মতি নিয়েই চার গোয়েন্দাকে আমি সাথে নিয়ে যাচ্ছি, আপনি এবং এই তরুণীও আমার সাথে যাবেন। বলল গোমশতগীন।
* * *
নাসেরকে খৃস্টান কর্মকর্তার জন্যে সংরক্ষিত কক্ষে নিয়ে যাওয়া হল। নাসের সাথীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে অস্বীকৃতি জানাল। খৃস্টান কর্মকর্তা চাচ্ছিল, নাসেরকে আলাদা করে তেরেসা ও লিজাকে দিয়ে তার ব্রেইনওয়াশ করে ফেলবে।
তুমি তো এদের কমান্ডার। তোমার তো এদের থেকে ভিন্ন থাকা দরকার। বলল খৃস্টান কর্মকর্তা।
আমাদের মধ্যে উঁচু নীচুর বিভেদ নেই। আমাদের সুলতান আমাদের সাথেই থাকেন। আমি তো সামান্য একজন কমান্ডার মাত্র। আমি সাথীদের থেকে আলাদা হয়ে অহংকারের অপরাধী হতে পারব না। বলল নাসের।
আমরা তোমাদের সম্মান করতে চাই। তোমাদের ওখানে গিয়ে তোমরা যা ইচ্ছা তাই করো, কিন্তু এখানে আমাদেরকে আমাদের রীতি পালন করতে দাও। বলল খৃস্টান কর্মকর্তা।
আমাদের গোয়েন্দা ও গুপ্তবাহিনীর কমান্ডারগণ জীবিত মৃত সর্বাবস্থায়ই সহকর্মীদের সাথে থাকে। আমরা আপনাদের এখানে বন্দী এবং মৃত্যুপথযাত্রী না হলে আপনার কথা মানা যেতো। মৃত্যুমুখে আমরা সকল কষ্ট যাতনায় একে অন্যের অংশীদার হয়ে মরতে চাই। আমরা ইচ্ছা করলে একজনের জীবন বাঁচাতে তিনজনের প্রাণ বিসর্জন দিতে পারি। বলল নাসের।
তোমরা কি বন্দী দশা থেকে ফেরার হওয়ার চেষ্টা করবে? মুচকী হেসে বলল গোমশতগীন।
মুক্ত হওয়ার চেষ্টা আমরা অবশ্যই করব। কারণ এটা আমাদের কর্তব্য। হয়তো আমরা মৃত্যুবরণ করে মুক্ত হবে, নয়তো তোমাদের হত্যা করে। আমাদেরকে যদি বন্দী করেই রাখতে চাও তবে পায়ে বেড়ী পরিয়ে দাও। দোহাই! আমাদের সাথে প্রতারণা করো না। আমরা যুদ্ধের সৈনিক, সাইফুদ্দীন ও গোমতগীনের মতো ঈমান বিক্রেতা নই।
আমিই গোমশতগীন, হিরনের স্বাধীন শাসক! তোমরা আমাকে ঈমান বিক্রেতা বললে!
হ্যাঁ! আপনাকে আবারো আমি ঈমান বিক্রেতা বলছি। শুধু ঈমান বিক্রেতা নন, আপনি একজন বেঈমান, গাদ্দারও বটে!
এখন আমি ঈমান বিক্রেতাও নই, বিশ্বাসঘাতকও নই। দেখো, যুদ্ধ হচ্ছে। তুর্কমানে। সেখানে সাইফুদ্দীন যুদ্ধ করছে, আর আমি এখানে তোমাদেরকে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্যে এসেছি। আমি এখন ওদের সাথে নেই। থাকলে তোমাদেরকে এভাবে মুক্ত রাখা হতো না। আমি তোমাদেরকে এখান থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তোমাদের ঠিকানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করব।
নাসেরকে ধোঁকা দেয়ার জন্য অপমান হজম করে কৌশলের আশ্রয় নিল গোমশতগীন।
বেশ, তুমি সাধারণ কমান্ডার হলেও আইয়ূবীর মতো বুকের পাটা তোমার।
সব ঠিক আছে। কিন্তু আমি সাথীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হবো না। দয়া করে আমাকে এই অপরাধ করতে বাধ্য করবেন না।
না দোস্ত! তুমি সাথীদের সাথেই থাকো। তোমাকে আলাদা করা হবে না। বলল খৃস্টান কর্মকর্তা।
