সুলতান নিজে উভয় দুর্গে গিয়ে দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে দুর্গাভ্যন্তরের সৈন্যদেরকে তার সেনা শিবিরে পাঠিয়ে দিলেন আর নিজস্ব সৈন্যদের একটি দলকে দুর্গাভ্যন্তরে ঢুকিয়ে দিলেন। সুলতান সৈন্যদেরকে দুর্গবন্দী করলেন না। আলেপ্পোর কাছেই ছিল ইজাজ নামে অপর একটি দুর্গ। ইজাজ দুর্গের অধিপতি ছিল আলেপ্পো শাসক মালিক আস-সালেহ্-এর অনুগত। সুলতান আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়ার আগে ইজাজ দুর্গের কর্তৃত্ব নিজ হাতে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আল হামীরী নামের এক সেনাপতিকে পয়গাম দিয়ে ইজাজ দুর্গপতির কাছে পাঠালেন।
বোজা ও নবজ দুর্গপতির কাছে যে ভাষায় পয়গাম লিখা হয়েছিল, সে ভাষায়ই পয়গাম পাঠানো হয়েছিল ইজাজ দুর্গপতির কাছে। ইজাজ দুর্গপতি সুলতানের পয়গাম পাঠ করে দূত আল-হামীরীর দিকে ছুঁড়ে মারল এবং বলল, তোমার সুলতান আলেপ্পো অবরোধ করে একবার মজা দেখেছে, এবার গিয়ে বল, সাধ থাকলে ইজাজ অবরোধ করে মজা দেখুক।
আপনি কি মুসলমানদের খুনোখুনি পছন্দ করবেন? আমরা পরস্পর ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধে হতাহত হই আর খৃস্টানরা তা দেখে মজা করুক, আপনি কি তাই পছন্দ করেন?
তোমার সুলতানকে গিয়ে বল খৃস্টানদের সাথে যুদ্ধ করতে, আমাদের পক্ষে খৃস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়।
দূত আল হামীরী বললেন, আপনি কি খৃস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চান না? আপনি কি খৃস্টানদের শত্রু মনে করেন না?
এ মুহূর্তে আমরা আইয়ূবীকেই শত্রু মনে করি। সে আমাদের হুমকি দিচ্ছে এবং তরবারীর জোরে আমাদের দুর্গ ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছে বলল দুর্গপতি। আল আমীরী বহু যুক্তিপূর্ণ কথা বলেও ইজাজ দুর্গপতিকে দুর্গ হস্তান্তরে সম্মত করাতে পারেননি। দুর্গপতি তাকে অসম্মান করে বেরিয়ে যেতে নির্দেশ দিল।
* * *
ঈসিয়াত দুর্গে খৃস্টান কর্মকর্তা গোমশতগীনের মুখোমুখি উপবিষ্ট। তেরেসা ও লিজাও পাশে বসা। কর্মকর্তা ও গোমশতগীন পূর্ব পরিচিত। খৃস্টান কর্মকর্তা বলল, শুনলাম, আপনি আইয়ূবীকে হত্যা করতে করতে এখন সাইফুদ্দীনকে খুন করার কথা ভাবছেন?
আপনি কি শুনেননি, সাইফুদ্দীন কেমন কাপুরুষের পরিচয় দিয়েছে? বলল গোমশতগীন। এই মেয়েরাই তো বলেছে, সাইফুদ্দীন আমাদের যৌথ বাহিনীকে এমন বিপর্যয়ে ঠেলে দিয়েছে যে, আমাদের সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য পুনর্বার তৈরী করতে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে। আমি বিক্ষিপ্ত সৈন্যদেরকে একত্রিত করে আলেপ্পোর বাইরেই আইয়ূবীকে রুখে দিতে চাই, কিন্তু সাইফুদ্দীন পরাজয়ের গ্লানি দূর করতে আবারো সেনাকমান্ড নিজের হাতে নিতে মরিয়া হয়ে উঠবে আর আমাদেরকে আরেকটি বিপর্যয়কর পরাজয় বরণ করতে হবে। এর চেয়ে কি তাকে ঠিকানায় পৌঁছে দেয়া দুষণীয় হবে?
আপনি যেভাবে দেখছেন সাইফুদ্দীন আসলে অতোটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নয়। বলল খৃস্টান কর্মকর্তা। আমরা যা জানি, আপনি ততোটা জানেন না। আমরা আপনার প্রত্যেকটি বন্ধু ও শত্রুকে আপনার চেয়ে বেশী জানি। এজন্যই আমরা আপনাকে উপদেষ্টা দিয়ে রেখেছি। আইয়ূবীর এলাকায় বেশভূষা বদল করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি আপনার সাম্রাজ্যের পরিধি বৃদ্ধি ও আপনার শাসন সংহত করার জন্যে। আমি নিজে প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে যা দেখে এসেছি, তার মর্ম কথা হলো–আপনার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বি আইয়ূবী। পারলে আইয়ূবীকে আপনি খুন করিয়ে ফেলুন। নুরুদ্দীন জঙ্গী নিহত হওয়ার ফলে আপনি দুর্গপতি থেকে স্বাধীন আমীর হয়েছেন, আইয়ূবী মারা গেলে আপনার রাজ্যের সীমানা আরো বহুগুণে বেড়ে যাবে, তখন আর আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ থাকবে না। আমি শীঘ্রই ত্রিপলী যাচ্ছি। সৈন্য ও রসদের ঘাটতি যথা শীঘ্রই আমি মিটিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করব। প্রয়োজনীয় সংখ্যক অস্ত্রের ব্যবস্থাও আমি করব, আপনি সাহস হারাবেন না। আইয়ূবী মরে গেলে আমরা আপনাকে অতটুকু সহযোগিতা করব যে, মালিক, সাইফুদ্দীন আপনার ধারে কাছেও ঘেষতে পারবে না। বর্তমানে আইয়ূবী যে অবস্থানে রয়েছে আপনি সেই অবস্থানে পৌঁছে যাবেন।
ক্ষমতার মোহ আর বিলাসী জীবনের হাতছানী গোমশতগীনকে এতোটাই বিগড়ে দিয়েছিল যে, খৃস্টান কর্মকর্তা যে খৃস্টানদের স্বার্থেরই প্রতিনিধিত্ব করে এই মোটা বিষয়টি অনুধাবন করার ক্ষমতাও তার ছিল না। এই কর্মকর্তা ছিল খৃস্টান গোয়েন্দা সংস্থার অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তি। সে অবস্থা সরেযমিনে প্রত্যক্ষ করে আইয়ূবীকে কিভাবে পরাস্ত ও ধ্বংস করা যায় এর কৌশল বের করার জন্যে পর্যবেক্ষণে বেরিয়েছিল। প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে আইয়ূবীর বিরুদ্ধে পরাজিত হয়ে অবশেষে খৃস্টানরা এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছিল যে, আইয়ূবীকে খুন করানো ছাড়া তার অগ্রাভিযান রোধ করা অসম্ভব। এ জন্য মুসলিম নেতৃবর্গের মধ্যে বিদ্বেষ ও বিরোধ তৈরী করা ছিল খৃস্টানদের অন্যতম কৌশল। খৃস্টানরা চাচ্ছিল, মুসলিম ক্ষমতালোভী নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ। আত্মকলহে লিপ্ত করে ওদের মৌল শক্তি ক্ষয়ে দিতে। এভাবে এরা দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে উঠলে আইয়ূবীর মৃত্যুর পর গোটা আরব জাহানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা খৃস্টানদের জন্যে সহজ হবে।
আইয়ূবীকে হত্যার ব্যাপারে শেখ সিনানও তো নিরাশ হয়ে পড়েছে। সে বলেছে, আরো চারজন ফেদাঈ সে আইয়ূবীকে খুন করার জন্য নিয়োগ করেছে। কিন্তু তাকে আশাবাদী মনে হলো না। বলল গোমশতগীন।
