ঐতিহাসিক কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তাঁর স্মৃতিচারণ গ্রন্থে লিখেছেন, সেনাপতি আযুদ্দীনের চোখে পানি দেখে সুলতান বললেন, আযুদ্দীন! জানি আমার প্রস্তাব ও তোমার চাচার করুণ পরিস্থিতিতে তুমি দুঃখ পেয়েছে। চাচার জন্যে তোমার দুঃখ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ভুলে যেয়ো না, আমরা আল্লাহর নির্দেশ পালন করছি মাত্র। আজ যদি আমার বিপক্ষে আমার ছেলেও দাঁড়াতো আমি তাকে রেহাই দিতাম না। জিহাদের পথে আমার আপন সন্তান বাধা হয়ে দাঁড়ালে আমার তরবারী তার মাথা দ্বিখণ্ডিত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। জেনে রেখো, চাচার করুণ পরিণতি দেখে তোমার চোখে পানি এসে গেছে, কিন্তু এমনটা হলে আমার পুত্রের মাথা দ্বিখণ্ডিত করেও আমার চোখে পানি আসবে না।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে একটু সরে গিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্যে শিবির স্থাপন করলেন সুলতান। সুলতান যেখানে শিবির স্থাপন করলেন সেখান থেকে মাত্র পনের মাইল দুরে আলেপ্পোর অবস্থান। আলেপ্পো তখন মালিক আস্-সালেহ্-এর দখলে। মালিক সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নিজেকে স্বাধীন সুলতান ঘোষণা করে সাইফুদ্দীন ও গোমশতগীনের সাথে জোট বেঁধেছে। জোট বাহিনীর হেড কোয়ার্টার আলেপ্পো। আলেপ্পো শহর রক্ষা প্রাচীর খুবই মজবুত। আর অধিবাসীরা লড়াকু। ইতিপূর্বে দীর্ঘ সময় অবরোধ করেও সুলতান আলেপ্পাকে দখলে নিতে পারেননি। আর এখন আলেপ্পো দখলের আগে তার নিজের বাহিনীকে মজবুত করার প্রয়োজনীয়তা বেশী। এদিকেই নজর দিলেন সুলতান।
শিবিরে থাকাকালীন সময়ে বোজা ও নবজ এর শাসকদের নামে সুলতান দুটি চিঠি পাঠালেন। বোজায় পাঠালেন সেনাপতি আযুদ্দীনকে। আর ফখরুদ্দীনকে সুলতানের বিশেষ দূত হিসেবে নবজ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। এ কয়দিনের ভদ্রতা, শিষ্টাচার ও উন্নত মানবিকতা দিয়ে সুলতান ফখরুদ্দীনকে জয় করে নিয়েছিলেন। তিনি ফখরুদ্দীনকে নবজ-এ বিশেষ দূত হিসেবে পাঠানোর প্রস্তাব করলেন। ফখরুদ্দীন একথা শুনে চোখ বড় বড় করে সুলতানের দিকে তাকিয়ে রইল। সুলতান ফখরুদ্দীনের বিস্ময়ভরা চাহনী দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার, আপনি এমন করে তাকাচ্ছেন কেন? আপনার কি বিশ্বাস হচ্ছে না? নিজেকে কি আপনি মুসলমান মনে করেন না? না নিজের ঈমানের প্রতি বিশ্বাস নেই আপনার। শুনুন, নবজ দুর্গের নিয়ন্ত্রণ আমার দরকার। এজন্য আপনাকে আমার বিশেষ দূত হিসেবে পাঠানোর চিন্তা করেছি, আমি খুনোখুনি চাই না। আপনি গিয়ে নবজ এর গভর্নরকে বলবেন, খুনখারাবী না করে দুর্গ আমাদের হাতে হস্তান্তর করুক এবং তার সেনাবাহিনীকে আমাদের বাহিনীতে লীন করে দিক।
আযুদ্দীন ও ফখরুদ্দীন বিশেষ দূত হিসেবে নবজ ও বোজায় চলে গেলেন।
বাজার শাসক আযুদ্দীনকে তোপধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানাল। সে সুলতান সালাউদ্দীন আইয়ূবীর পয়গাম পড়ল। আইয়ূবী লিখেছেন, প্রিয় ভাই! আমরা সবাই এক আল্লাহ্, এক রাসূল ও এক কুরআনের পূজারী। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ আমরা সবাই ছিন্নভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছি। বিচ্ছিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কি কখনও কিছু করতে পারে? বিচ্ছিন্ন কোন অঙ্গ কি কোন উপকারে আসতে পারে? অথচ রাসূলের ভাষায় আমরা সবাই একই দেহের অভিন্ন অংশ ছিলাম। অভিন্নতা আমরা রক্ষা না করে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় আমাদেরকে খৃস্টানরা শকুনের মতো টুকরো টুকরো করে চিরে খাচ্ছে। উম্মতে মুসলিম হিসেবে আমাদেরকে অবশ্যই একত্রিত হতে হবে। অন্যথায় শত্রুরা কাউকেই অক্ষত থাকতে দিবে না। আমি আপনাকে উম্মতে মুসলিমার অংশ হিসেবে ঐক্য স্থাপনের জন্যে দাওয়াত দিচ্ছি। কুরআনে কারীমের আহ্বান আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব পালন করছি মাত্র। আমার আহ্বান বুঝার চেষ্টা করুন এবং তদনুযায়ী কাজ করার প্রস্তুতি নিন।
আপনার প্রথম কাজ হবে ইসলামী সালতানাতের কাছে আপনার দুর্গের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করে আমার আনুগত্য স্বীকার করে নেয়া। তা করলে আপনার সেনা বাহিনী আমার বাহিনীতে একীভূত করা হবে এবং আপনাকে দুর্গের অধিপতি করে দুর্গে আমাদের পতাকা উড়িয়ে দেয়া হবে। এই প্রস্তাব মানতে অস্বীকৃতি জানালে আমার সেনাদের অবরোধ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিন। আলেপ্পো, হিরন ও মৌসুলের গভর্নর ও যৌথ বাহিনীর করুণ পরিণতি গভীরভাবে দেখলে আপনার সিদ্ধান্তে পৌঁছা সহজ হবে। আমি আশা করি, আমার প্রস্তাব আপনি সাগ্রহে গ্রহণ করবেন এবং আপনার সাথে সদ্ব্যবহারের সুযোগ দিবেন। মনে রাখবেন, আপনার সাথে আমার ব্যক্তিগত কোন বিরোধ নেই, আমি যা করছি সবই আল্লাহর হুকুম ও শরীয়তের নির্দেশ পালনার্থে করছি।
বোজার শাসক সুলতানের পত্র পাঠান্তে আযুদ্দীনের দিকে তাকালে আযুদ্দীন বললেন, সম্মানীত আমীর! আপনার দুর্গ অতোটা মজবুত নয়, তাছাড়া আপনার সেনাবাহিনীও ছোট, আমি আশা করি আমাদের মোকাবেলায় যুদ্ধে নেমে আপনি আমাদের সৈন্যদের হাতে আপনার সৈন্যদের হতাহতের দিকে ঠেলে দিবেন না।
বোজার শাসক সুলতানের প্রস্তাব মেনে নিয়ে সুলতানকে লিখিত আমন্ত্রণে দুর্গের অধিকার নেয়ার আহ্বান জানালেন।
নবজ এর শাসকও সুলতানের প্রস্তাব কবুল করে নিল। ফখরুদ্দীন তাকে দিয়ে জবাবী পয়গাম লিখিয়ে নিয়ে সুলতানের কাছে ফিরে এলেন।
