শেখ সিনান! আপনি চালে ভুল করছেন। আমার এক সাথী আগে চলে গেছে, সে জানে আমি লিজা ও তেরেসার খোঁজে এখানে এসেছি। দুই/তিন দিন এখানে থেকে পরে চলে যাবো। আপনি জানেন, আপনার সাথে সহযোগিতামূলক চুক্তির অধীনে আমরা এই দুর্ভেদ্য দুর্গ আপনাকে উপহার দিয়েছি। এটি আমাদের বিশ্রামাগার এবং বিকল্প আশ্রয় স্থল। আপনি আমার হাড়গোড় নিশ্চিহ্ন করে দিলেও আপনার কাছে জিজ্ঞেস করা হবে আমাদের দুটি মেয়ে ও কর্মকর্তা কোথায়?
আপনি যদি আইয়ূবীকে হত্যা করাতে পারেন, তবে এমন এক ডজন মেয়ে আপনাকে দেয়া হবে। আপনি তো দীর্ঘ দিন যাবত আমাদের টাকা হজম করছেন কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করতে পারছেন না। আমরা জানি, আপনি আইয়ূবীকে হত্যা করতে চার ফেদাঈ পাঠিয়েছেন কিন্তু আমাদের কাছে সবই ধোকাবাজী মনে হয়। আমরা দেখতে পাচ্ছি, আইয়ূবী এখনও জীবিত এবং সে একের পর এক বিজয় অর্জন করছে।
ধোঁকা নয়, আমি ঠিকই চার ফেদাঈ পাঠিয়ে দিয়েছি, দেখবে অল্প দিনের মধ্যেই আইয়ূবী খুন হয়ে যাবে। রাগে ক্ষোভে জড়ানো গলায় বলল সিনান।
তাই যদি হয়, তবে শুনে রাখুন, আমি নিজ থেকে আপনাকে এই লিজার চেয়েও বেশী সুন্দরী দুই তরুণী উপহার দেবো। তা ছাড়া আমাদের কর্তাদের কাছ থেকে তো আপনি বেহিসাব উপহার উপঢৌকন পাবেনই।
সেটা পরে দেখা যাবে। আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি, এই মেয়েটিকে তুমি এখন আমার কক্ষ থেকে নিয়ে যেতে পারো কিন্তু দুর্গের বাইরে নিয়ে যেতে পারবে না। এখন তুমি একে তোমাদের জন্যে সংরক্ষিত অতিথিশালায় নিয়ে যাও। সেখানে খাও দাও, আরাম-আয়েশ কর এবং চিন্তা কর এই মেয়েকে আমার কাছে আবার ফিরিয়ে দেবে কি-না?
কর্মকর্তা উভয় তরুণীকে নিয়ে বাইরে চলে এল। লোকটি ছিল খৃস্টান গোয়েন্দা বিভাগের শীর্ষ অফিসার। আইয়ূবী শাসিত অঞ্চলের খোঁজ খবর নিয়ে দফতরে পৌঁছার পথে সে শেখ সিনানের দুর্গে এসেছিল। দুর্গে পৌঁছার সাথে সাথেই এক প্রহরী তাকে বলে দিয়েছিল এখানে দুই খৃস্টান তরুণী কয়েকজন শত্রু পক্ষের যোদ্ধাকে পথ ভুলিয়ে নিয়ে এসেছে। তারা এখন শেখ সিনানের কক্ষে রয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তা খৃস্টান মেয়েদের কথা শুনে তাদের সাথে দেখা করার জন্যে সিনানের কক্ষে ঢুকে অনাকাঙ্ক্ষিত বিরূপতার মুখোমুখি হয়ে পড়ে। অতঃপর পরিস্থিতি তাকে সিনানের কজা থেকে তরুণীদের উদ্ধারে বৈরী আচরণে বাধ্য করে। যার ফলে তরুণীদের নিয়ে সে সিনানের কক্ষ ত্যাগ করে অতিথিশালায় চলে আসে।
খৃস্টান কর্মকর্তা তরুণীদের নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর শেখ সিনান তার বিশ্বস্ত প্রহরীকে ডেকে নির্দেশ দিল, এই দুই তরুণী ও খৃস্টান পুরুষ আমাদের বন্দী নয়, তবে তাদের ইচ্ছে মতো যখন তখন দুর্গের বাইরে যেতে দেবে না। ওদের প্রতি এখন থেকে কড়া নজর রাখবে। আর গোমশতগীন পুনর্বার ফিরে এলে বন্দী চারজনকে নিয়ে যেতে দিবে। গোমশতগীন যখন ইচ্ছা আসতে পারবে যেতে পারবে, তার উপর কোন বিধি-নিষেধ নেই।
তরুণীদ্বয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে জানাল, শেখ সিনানের কাছে হিরনের গভর্নর গোমশতগীন এসেছিল। সে এখন বাইরে গেছে। গোমশতগীন সাইফুদ্দীনকে হত্যা করানোর পরিকল্পনা করেছে।
* * *
সুলতান সালাহ উদ্দীন আইয়ূবী মোজাফফর উদ্দীনের আক্রমণ প্রতিরোধে সফল ও প্রতিআক্রমণে অব্যর্থ হওয়ায় মোজাফফর উদ্দীন ময়দান ত্যাগ করে চলে গেল। কিন্তু বহু সংখ্যক শত্রুসেনার সাথে ধরা পড়ল সাইফুদ্দীনের ডান হাত ও প্রধান উজীর ফখরুদ্দীন। সুলতান অন্যান্য বন্দীদের থেকে ফখরুদ্দীনকে আলাদা করে নিজের কক্ষে এনে পরিপূর্ণ সম্মান ও মর্যাদায় রাখলেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গনীমতের সম্পদ বণ্টন করার আগেই তিনি ঘোষণা করলেন, শত্রুবাহিনীর পশ্চাদ্ভাবন করার প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ ঐতিহাসিক, আইয়ূবীর এই সিদ্ধান্তকে ভুল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন কিন্তু গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, আইয়ূবী যদি সেদিন শত্রুবাহিনীর পশ্চাদ্ভাবনের নির্দেশ দিতেন তবে তার গোটা বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হতো, শত্রুবাহিনী তার অস্তিত্বে চরম আঘাত হানতো, হতে পারতো তার ইতিহাস সেখানেই থেমে যেতো।
মোজাফফর উদ্দীনের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে সুলতানের সৈন্য বাহিনীর ব্যাপক শক্তি ক্ষয় হয়। মোজাফফর উদ্দীনের মোকাবেলায় বিজয়ের জন্যে সুলতানকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শত্রুবাহিনীকে তাড়া করতে হলে তাকে একান্ত নিরাপত্তা ইউনিটকে ব্যবহার করতে হতো। বলার অপেক্ষা রাখে না, একান্ত নিরাপত্তা বাহিনীকে পাঠালে শত্রুবাহিনী এই সুযোগে তার অস্তিত্ব বিনাশে মরণ আঘাত হানতো। তা ছাড়া মুসলমানদের ভ্রাতৃঘাতি লড়াইয়ে সব সময়ই তিনি চাইতেন যাতে লোকক্ষয় কম হয়। যেহেতু বিজয় তার হয়েছে; পিছু তাড়া করে বিভ্রান্ত মুসলিম সৈন্যদের হত্যা করে খুনাখুনির সংখ্যা বৃদ্ধি করা থেকে বিরত থেকেছেন তিনি।
সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ূবী নিজের তাঁবুতে দাঁড়িয়ে সাইফুদ্দীনের আপন ভাতিজা সেনাপতি আযুদ্দীন ফররাখ শাহকে ডেকে পাঠালেন। আযুদ্দীন ছিলেন সুলতানের সেনাবাহিনীর অন্যতম সেনাপতি। সে সময়ের পরিস্থিতি ছিল ভয়ানক। আপন ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে, চাচা ভাতিজার বিরুদ্ধে, মামা ভাগ্নের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। আযুদ্দীনকে ডেকে সুলতান মুচকি হেসে বললেন, এই তাঁবু তোমার চাচার। সব কিছুতো বণ্টন হয়ে গেল, চাচার উত্তরাধিকারী হিসেবে তুমি এই তাবু ও সমুদয় সম্পদের অধিকারী। তুমি এসব নিয়ে যেতে পার। এটি তোমারই প্রাপ্য। সুলতানের কথায় সেনাপতি আযুদ্দীনের চোখে পানি এসে গেল।
