শান্ত্রী কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেল। সে নাসের ও তার সাথীদের জন্য আহারের ব্যবস্থা করল। খেতে অস্বীকার করল নাসের। ভাবল, খাবারে হয়ত আবারো হাশীশ দেয়া হয়েছে। তাকে খুব কষ্টে বুঝানো হল যে, এই খাবারে কোন নেশাদ্রব্য দেয়া হয়নি। নাসের ও তার সাথীরা ছিল খুবই ক্ষুধার্ত। লোভনীয় খাবার সামনে দেখে তাদের পেটের ক্ষুধাটা আরো তীব্র হয়ে উঠল। পেটের জ্বালা মেটাতে খাবারে নেশা মেশানোর আশঙ্কা মেনে নিয়েই আহারে প্রবৃত্ত হল তারা।
শেখ সিনান তেরেসাকে বলল, তুমি চলে যাও, লিজাকে আমার কাছে রেখে যাও।
তেরেসা বলল, তিন চার দিন আমরা বিরামহীনভাবে সফর করেছি। উভয়েই খুব ক্লান্ত। এখন আমাদের বিশ্রাম দরকার। আগে বিশ্রাম করতে দিন। তারপর লিজা খুশী হয়েই আপনার কাছে চলে আসবে।
কিন্তু সিনান মানুষ নামের একটা পাষণ্ড। মানবিক মূল্যবোধ সিনানের মধ্যে ছিল না। লিজার ক্লান্তি শ্রান্তি ও দেহ মনের প্রফুল্লতার দিকে নজর দেয়ার মেজাজ সিনানের থাকবে কেন। সে প্রথমে লিজাকে উত্যক্ত করতে শুরু করল। সিনানের মানসিক অত্যাচার সে মুখ বুজে সহ্য করল তেরেসার কথায়। সিনানের কজা মুক্ত হওয়ার চিন্তাও করতে লাগল লিজা। কিন্তু সিনান আরো ভয়ংকর হয়ে উঠল। উন্মত্ত পশুর মতো লিজাকে খুবলে খেয়ে ফেলার মতো শুরু করল উন্মাদনা। এমন সময় হঠাৎ দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করল খাস প্রহরী। বলল, আপনার সাথে এক লোক দেখা করতে চায়। গর্জে উঠল সিনান। বলল, এখন কারো দেখা করার অনুমতি নেই। বল, এখন দেখা করা যাবে না।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞা আর অনুমতির তোয়াক্কা না করে খাস প্রহরীকে ঠেলে কক্ষে ঢুকে পড়ল আগন্তুক।
লোকটি এক উঁচু পদের খৃস্টান। তাকে দেখে স্মীত হেসে নাম ধরে ডাকল সিনান। বলল, বেশ বেশ, তুমি এসেছ, ভালই হলো। তবে আজ রাতে আর কথা নয়, সকালে কথা বলব। এখন মেহমান খানায় গিয়ে আরাম কর।
হ্যাঁ, আগামী সকালেই আপনার সাথে আমি দেখা করতাম। কিন্তু এখানে এসেই শুনেছি, লিজা ও তেরেসা আপনার এখানে। এদের সাথে এক্ষুণি কথা বলা দরকার। আমি এদের নিয়ে গেলাম।
তেরেসার কাঁধে হাত রেখে বলল সিনান, ওকে নিয়ে যাও, আর লিজাকে নিজের কোলের দিকে টেনে বলল, ওকে আমি এখানেই রেখে দিচ্ছি।
চোখ লাল হয়ে উঠল খৃস্টান কর্মকর্তারা বলল, শেখ সিনান! আপনি জানেন, আমি কেন এসেছি। এই তরুণীদের কাজ সম্পর্কেও আপনি অবগত। আপনার বাহুবন্দী হয়ে থাকা এদের কাজ নয়, উভয়কেই আমি নিয়ে যাচ্ছি। খৃস্টান কর্মকর্তা লিজা ও তেরেসার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, আমার সাথে চল।
লাফিয়ে উঠল দুই তরুণী। উভয়েই গিয়ে দাঁড়াল খৃস্টান কর্মকর্তার পাশে।
তুমি কি আমার শত্রু সেজে মোকাবেলায় নামতে চাও? ক্ষোভে অপমানে চোখ রক্তবর্ণ হয়ে গেল সিনানের। জান, মেহমানের মর্যাদা থেকে তোমাকে আমি কয়েদী বানাতে পারি। ভুলে গেছো, এখন তুমি আমার দুর্গে অবস্থান করছো? আমি তোমাকে বলছি–এই মেয়েটিকে রেখে কক্ষত্যাগ করতে পার।
শেখ সিনান তখন নেশাগ্রস্ত। তাছাড়া সে ফেদাঈ সম্রাট। এ অঞ্চলের যে কোন রাজা বাদশাহকে সে যে কোন মুহূর্তে খুন করাতে পারে। কেউ জানতে পারবে না যে, এ হত্যাকাণ্ড শেখ সিনানের লোকেরা ঘটিয়েছে। ইতিমধ্যে সে বহু খৃস্টান অফিসার হত্যা করিয়েছে। খৃস্টানরা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট শত্রুতার কারণে প্রতিপক্ষকে হত্যা করাতে শেখ সিনানের স্মরণাপন্ন হতো।
ঈসিয়াত দুর্গে থাকতো মানুষরূপী দৈত্য। দুর্গের অভ্যন্তরে মানুষ প্রবেশ করে হারিয়ে গেলে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ফেদাঈরা উন্মাদের মতো মানুষ হত্যা করে উল্লাস করে। মানুষ খুন করা ওদের কাছে মুখের থুথু ফেলার মতো। শেখ সিনানের বালাখানাটি ছিল রঙ-বেরঙের বাহারী ফানুস দ্বারা সাজানো। মহলের ছাদ ও দেয়ালে সীসা, তামা ইত্যাদি দিয়ে কারুকার্য করা। মহলের সৌন্দর্য দেখে কেউ মনে করতে পারবে না যে, এই দুর্গের চারপাশ দুর্ধর্ষ পাশবিকতার জালে ঘেরা। দুর্গের অভ্যন্তরভাগ দেখে কারো পক্ষে অনুমান করা সম্ভব নয় এর বাইরে প্রাণঘাতি রুক্ষ মরু আর পাথুরে পাহাড়, পর্বত, টিলার সমাহার।
নিজের এই দুর্গে শেখ সিনান ছিল রাজা। দুর্গ রাজ্যে সে ছিল ইচ্ছাপতি। তার বিরুদ্ধাচরণ করার মতো চারপাশে কেউ ছিল না। এ কারণে দুর্গরাজ্যে শেখ সিনান নিজের সাধ-আহ্লাদ মিটাতে হেন কোন অমানবিকতা নেই যা সে অপহরণকৃত তরুণীদের উপর প্রয়োগ করতো না। তার শিষ্যরা প্রভুকে খুশী রাখার জন্যে সুকৌশলে সুন্দরী মেয়েদেরকে অপহরণ করতো। এছাড়া খৃস্টানরা ইচ্ছে করেও সুন্দরী মেয়েদেরকে পাঠাতো শেখ সিনানের মনোরঞ্জন করে তাকে বাগে রাখার জন্যে। লিজার মতো অপরূপা সুন্দরী তরুণী দেখে সিনানের ভোগবাদী পাশবিকতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। সিনানের মতো পাকা শিকারী লিজাকে বাগে পেয়েও হাতছাড়া করার কথা ভাবতে পারে না। তার প্রমোদে বাধ সাধায় সে খৃস্টান কর্মকর্তার উপর ভীষণ ক্ষেপে গেল। খৃস্টানের উদ্দেশে বলল, তোমাকে আমি ভেবে দেখার অবকাশ দিচ্ছি। তুমি আমার সাথে বিরোধে যেতে চাওয়ার আগে ভেবে দেখো, আমার এই দুর্গে জিনও যদি গায়েব করে ফেলা হয় তবে শয়তানও এর পাত্তা পাবে না। এই তরণীকে কিছুতেই দুর্গের বাইরে যেতে দেবো না আমি। ইচ্ছে করলে তোমাকেও দুর্গের ভিতরে লাপাত্তা করে দিতে পারি।
