যে চারজন পাঠিয়েছি, এরা আমার শেষ পুঁজি। আমার কাছে খুনীর অভাব নেই। কিন্তু আইয়ূবীকে হত্যার বেলায় আমি ব্যর্থ। তাকে আমি ভয় করি।
কেন? জানতে চাইলো গোমশতগীন। আইয়ূবী কি তোমাকে কোন দুর্গ দিয়ে দিয়েছে নাকি?
না, জবাব দিল সিনান। আইয়ূবীকে খুন করতে গিয়ে আমি কজন অভিজ্ঞ ফেদাঈ হারিয়েছি, আমার ফেদাঈ ঘুমের মধ্যে তাকে হামলা করেও নিজেরাই খুন হয়ে গেছে। একবার তীর চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। আমার এখন মনে হয় আইয়ূবীর উপরে আল্লাহর হাত রয়েছে। তার কাছে এমন কোন শক্তি আছে, খঞ্জর, তীর কিছুই তাতে কাজ করে না। আমার গোয়েন্দারা বলেছে, যে কয়বার তার উপর আক্রমণ করা হয়েছে, আক্রমণ ভণ্ডুল করে সে ক্লান্ত হয় না, ক্ষুব্ধ হয় না বরং মুচকী হাসে। জীবন হরণকারী ঘটনাকে সে বেমালুম ভুলে যায়।
কত লাগবে বল সিনান? জিজ্ঞেস করল গোমশতগীন। মনে হয় তুমি আনাড়ী খুনী পাঠিয়েছিলে।
না, যাদের পাঠিয়েছিলাম, এরা ছিল এখানকার সেরা। এদের কোন টার্গেট কখনও ব্যর্থ হয়নি। এদের টার্গেট থেকে এ পর্যন্ত কেউ রেহাই পায়নি। অবশ্য আমার কাছে উস্তাদেরও উস্তাদ আছে। কিন্তু গোমশতগীন ভাই! তোমরা বিশাল বাহিনী পাঠিয়ে আইয়ূবীর কিছু করতে পারনি; আর আমি মাত্র তিন চারজন লোক পাঠিয়ে ঝুঁকি নিতে চাই না।
আমার মনে হয় আইয়ূবী হত্যার ব্যাপারে তোমার অনাগ্রহী হওয়ার অন্য কোন কারণ আছে! সংশয় প্রকাশ করল গোমশতগীন।
কারণ একটাই, আইয়ূবীর সাথে আমার ব্যক্তিগত কোন বিরোধ নেই। হাসান বিন সাবাহ নবী হতে চেয়েছিল, আমি এসবে বিশ্বাস করি না। খুন ও হাশীশ আমার পেশা ও নেশা। আইয়ূবী আমাকে বেশী পারিশ্রমিক দিলে তোমাকেও হত্যা করতে আমার আপত্তি থাকবে না।
আইয়ূবী কাপুরুষের মতো কাউকে হত্যা করে না, এজন্য কোন কাপুরুষ তাকে হত্যা করতে পারবে না। বলল লিজা।
ওহ্! সুন্দরী, অট্টহাসিতে উল্লাসে ফেটে পড়ল সিনান। লিজাকে বেগলদাবা করে বলল, দারুণ কথা বলেছে। কাপুরুষ কখনও সুপুরুষের ক্ষতি করতে পারে না। গোমশতগীন ভাই! মালিক, সাইফুদ্দীন, তুমি আর খৃস্টানরা মিলে আইয়ূবীর বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়েছে আইয়ূবী তোমাদের সবার প্রতিপক্ষ বলে। আসলে তোমাদের মধ্যেওতো বিশ্বাস নেই। আইয়ূবী মারা গেলেতো তোমরাই শুরু করবে পারস্পরিক সংঘাত। একথা জেনে রেখো, আইয়ূবী মরে গেলেও তার রাজত্বের এক হাতও পাবে না তোমরা। তার অনুসারী ও ভাইয়েরা বিশ্বস্ত ও নীতিবান, ওরা তার রাজত্ব আগলে রাখবে। তুমি যদি কাউকে শেষ করে ফায়দা নিতে চাও, তবে সাইফুদ্দীনকে সাফাই করে আলেপ্পো কজা করে ফেল। একাজটা তুমি নিজেই করতে পারবে, কারণ সাইফুদ্দীন এখন তোমার মিত্র।
গভীর চিন্তায় ডুবে গেল গোমশতগীন। অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে বলল গোমশতগীন–ঠিক আছে সাইফুদ্দীনকেই খুন করিয়ে দাও, বল-কত লাগবে?
সাইফুদ্দীন হত্যার মূল্য হিরন দুর্গ, বলল সিনান।
হু, তোমার দেমাগ ঠিক নেই সিনান! মুদ্রার হিসেবে পারিশ্রমিক চাও।
পারিশ্রমিক হিসেবে মুদ্রা দিতে চাইলে তোমাকে চারজন লোক দিচ্ছি, এরা আমার ফেদাঈ নয় আইয়ূবীর ঝটিকা বাহিনীর সদস্য। এই তরুণীরা এদেরকে হাশীশ খাইয়ে পথ ভুলিয়ে এখানে নিয়ে এসেছে। এদের আমি কাউকে দিতে চাচ্ছিলাম না। এমন অভিজ্ঞ লোক পাওয়া কঠিন। গোমশতগীন ভাই! তুমি জানো, হাশীশ আর আমার এই পরীরা যে কোন মানুষকে এভাবে বদলে ফেলে যে নিজের মা-বাপকে সে অবলীলায় হত্যা করতে পারে। তোমাকে আমি হতাশ করতে পারি না। এদেরকে নিয়ে প্রাসাদের রাজকীয় পরিবেশে রাখো, হারেমের আরাম-আয়েশ দেখাও, আমার পরীরা এদেরকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলবে। হাশীশ, শরাব আর সুন্দরীভোগে অভ্যস্ত করে ফেলো, দেখবে, তোমার কথায় জীবন দিয়ে দেবে।
আইয়ূবীর সৈনিকরা তোমার কথা মতো অতো কাঁচা লোক নয়, সিনান!
গোমশতগীন ভাই! সে কথা আমি জানি। কিন্তু তুমি তো জানো, আমরা ফেদাঈ, মানুষের দেমাগ নিয়েই আমাদের খেলা। আমরা মানুষের মনে এমন কল্পনা ঢুকিয়ে দেই যে, কল্পনাকেই সে বাস্তব মনে করতে থাকে। কোন পুরুষের সামনে সুন্দরীদের অনুভূতি দিতে থাক, আর মদ, নেশা ও নারী সহজলভ্য করে দাও, সে কল্পনা ও অনুভূতির দাসে পরিণত হবে, মদ নারী ও ভোগ বিলাসে অভ্যস্ত করে কট্টর লোকের ঈমানও তুমি সহজে কিনে নিতে পারবে।
এদের নিয়ে যাও তুমি। এদের ব্যবহার নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না। একটু বক্র হাসি দিয়ে শেখ সিনান বলল, ভাই! ভেবে দেখ, মদ নারী ভোগবিলাস তোমাকেই কোথা থেকে কোথায় নামিয়েছে! মুসলিম খেলাফতের রক্ষক হয়েও তুমি এখন খেলাফতের সবচেয়ে বড় শত্রু।
শেখ সিনান গোমশতগীনকে জানাল, কত মূল্য দিতে হবে তাকে……..। কথা পাকা হয়ে গেল। সিদ্ধান্ত হলো, গোমশতগীন চার যোদ্ধাকে নিয়ে যাবে। সিনান বলল, এদের বন্দী না রেখে হারেমে শাহজাদাদের মতো আযাদ করে দেবে। তাতেই রাজী হল। অবশেষে দুদিন পর এসে এদের নিয়ে যাওয়ার কথা বলে সিনানের দুর্গ ত্যাগ করল গোমশতগীন।
শেখ সিনানের কক্ষ থেকে গোমশতগীন বেরিয়ে যাওয়ার পর এক শান্ত্রী কক্ষে প্রবেশ করল। শান্ত্রী জানতে চাইল, আজ যে চারজন লোককে আনা হয়েছে এদের ব্যাপারে হুকুম কি?
হিরনের গভর্নর গোমশতগীন এসেছেন। তিনি এদের নিয়ে যাবেন। এদের খাওয়া-দাওয়া, আরাম আয়েশের ব্যবস্থা কর। তাদেরকে কোথায় পাঠানো হচ্ছে, এটা যেন তারা জানতে না পারে।
