সাথীদের জাগিয়ে দিল নাসের। ঘুম থেকে জেগে ওরা বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে দেখতে লাগল চারপাশ। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সবাই নাসেরের দিকে তাকাল।
বন্ধুগণ! আমরা ফেদাঈদের জালে আটকা পড়েছি। এটি ফেদাঈদের দুর্গ। এখানে ফেদাঈ নেতা শেখ সিনান ও তার বাহিনী থাকে। যে দুই তরুণীকে আমরা জিন মনে করেছিলাম এরা জিন নয় ফেদাঈন তরুণী। আমি এখনও জানি না, আমাদের ভাগ্যে কি ঘটবে। তোমরা জানো ফিদাঈ গোষ্ঠী খুবই ভয়ানক। ওদের কাছে যথাসম্ভব কম কথা বলতে চেষ্টা করবে। যদি বাইরে বের হওয়ার সুযোগ পাই তবে ফেরার হওয়ার কথা ভাববো।
এরা কি আমাদেরকে জেলখানায় বন্দী করে ফেলবে? জানতে চাইল এক সাথী।
জেলখানায় বন্দী করে রাখলে তা আমাদের জন্যে সৌভাগ্যের কারণ হতো, কিন্তু ফেদাঈনরা হাশীশ ও নারী ব্যবহার করে আমাদের দেমাগ বিগড়ে ফেলবে, তখন আমরা আমাদের ধর্ম, কর্ম ও কর্তব্য সব ভুলে যাবো।
ফেরার হওয়া ছাড়া মনে হয় আর কোন পথ নেই। বলল নাসেরের অপর এক সাথী।
ঈমান হারা হওয়ার চেয়ে আমাদের মৃত্যুবরণ করাও ভাল। বলল অপর একজন।
নিজেরা সচেতন থেকো, আর আল্লাহর উপর ভরসা রাখো, বলল নাসের। এতো সহজে আমাদেরকে এরা কাবু করতে পারবে না।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। এক লোক দুটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখে গেল ঘরের মেঝেতে। তারা আগন্তুকের সাথে কোন কথা বললো না। ক্ষুধায় পেট জ্বলে যাচ্ছে সবার। কক্ষ থেকে অদূরে অন্য একটি ঘরে শেখ সিনানের নৈশভোজ চলছে। সেখানে জমজমাট আসর। বাহারী ভোজ আয়োজন, সুরা ও নারীর সম্মিলন। খাবারের ঘ্রাণ ও শরীরে ব্যবহৃত খুশবুতে গোটা দুর্গ মোহিত। শেখ সিনান খাবার মজলিসে রাজকীয় আসনে উপবিষ্ট, তার একপাশে লিজা অপর পাশে তেরেসা আর মুখোমুখি সামনে গোমশতগীন বসে আহার করছে।
সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গীর সময়ে গোমশতগীন ছিল হিরনের গভর্নর। জঙ্গীর মৃত্যুর পর সে নিজেকে হিরন এলাকার স্বাধীন খলিফা ঘোষণা করে। এভাবে কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সাইফুদ্দীন ও মালিক আস সালেহ। এই তিন বিদ্রোহী একত্রিত হয়ে জোট বাঁধে কেন্দ্রীয় শাসক আইয়ূবীর বিরুদ্ধে। খৃস্টানদের সাথে গড়ে তোলে সখ্যতা। খৃস্টানরা গোমশতগীনকে সরাসরি সৈন্য দিয়ে সহযোগিতা করেনি বটে, কিন্তু গুপ্ত ঘাতক, সন্ত্রাসী এবং মদ-নারী ও প্রচুর নগদ অর্থ সাহায্য করে।
গোমশতগীন ছিল কুচক্রী। ময়দানের ভূমিকার চেয়ে ওর কূটবুদ্ধির জোর ছিল বেশী। শত্রুকে সে মাটির নীচ দিয়ে আঘাত হানতো, মিত্রদেরকেও সুযোগ মতো শায়েস্তা করতে ত্রুটি করতো না। মিত্রদের ঘাড়ে চড়ে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং রাজ্য বিস্তারের স্বপ্নে বিভোর থাকতো। মিত্রদেরকে কখনই সুনজরে দেখতো না গোমশতগীন। বন্ধুদের প্রতিও সে থাকতো সন্দিহান। যৌথ বাহিনীর কমান্ড সাইফুদ্দীনের কজায় চলে যাওয়ার পর তুর্কমানে যাওয়ার পথে শেখ সিনানের দুর্গে চলে এলো। সে বুঝতে পেরেছিল সম্মুখ যুদ্ধে আইয়ূবীকে পরাস্ত করা কঠিন। সাইফুদ্দীন যতোই শক্তি নিয়ে যাক না কেন তাকে নিরাশ হয়েই ফিরে আসতে হতে পারে। গোমশতগীন জানতো ক্ষমতালিম্পু ব্যক্তিদের কর্তৃত্বের হুমকি সেনাবাহিনী। তার সামনে আইয়ূবী ছাড়া আর কোন প্রতিপক্ষ ছিল না। কয়েকবার গুপ্ত ঘাতকের দ্বারা আইয়ূবীকে হত্যার চেষ্টাও সে করেছে কিন্তু সবগুলো চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে গেছে, তাই শেখ সিনানের দুর্গে এসেছে আইয়ূবীকে যাতে নিশ্চিত অব্যর্থ আঘাত হানার ব্যবস্থা করা যায়। ভবিষ্যৎ চক্রান্ত বাস্তবায়নের জন্যে গোমশতগীন ঈসিয়াত দুর্গে পৌঁছে লিজা-তেরেসা আসার একদিন আগে। সাইফুদ্দীনের নেতৃত্বে জোট বাহিনীর পরিণতি সংবাদ জানতো না সে।
* * *
গোমশতগীন ভাই! তোমার বন্ধু তো তুর্কমান থেকে পালিয়েছে। আহার চলাকালীন সময়ে গোমশতগীনের উদ্দেশ্যে বলল শেখ সিনান। তেরেসার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, তাকে খবরটি শুনিয়ে দাও না! যৌথ বাহিনীর পরাজয় ও সাইফুদ্দীনের পালিয়ে যাওয়ার সংবাদে গোমশতগীন এতোই হতাশ হলো যে, তার মুখে কোন কথাই ফুটল না। করুণ দৃষ্টিতে তাকাল তেরেসার দিকে। তেরেসা তাকে জানাল, মাত্র অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে কী নাটকীয়ভাবে আইয়ূবী সাইফুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করেছে। সাইফুদ্দীন সম্পর্কে তেরেসা বলল, আমরা সেখান থেকে আসার আগেই সাইফুদ্দীন পালিয়ে গিয়েছে।
বন্ধুরা আমাকে বিপদে ফেলেছে, বলল গোমশতগীন। যৌথবাহিনীর কমান্ড সাইফুদ্দীনের হাতে দিতে আমি রাজি ছিলাম না। কিন্তু সহযোগিরা আমার কথা শুনলো না। জানি না এখন আমার বাহিনী কোন অবস্থায় আছে!
ভাল নেই। বলল তেরেসা। আইয়ূবীর ঝটিকা বাহিনী আপনার সৈন্যদেরকে নিরাপদে পালিয়ে আসার সুযোগও দেয়নি।
সিনান ভাই! তুমি তো জান, কি জন্যে আসলাম।
হ্যাঁ। জানি, আইয়ূবীকে হত্যার ব্যবস্থা করতে এসেছে।
যা চাও; দেবো। কিন্তু আইয়ূবীকে হত্যা করে দাও।
শোন! বলল শেখ সিনান। খৃস্টান নেতৃবর্গ ও সাইফুদ্দীনের কথায় আমি চার ফেদাঈ আইয়ূবীকে হত্যা করতে পাঠিয়েছি। কিন্তু মনে হয় না তারা সফল হবে।
যৌথ নয়, আমি তোমাকে এককভাবে দায়িত্ব দিলাম। সম্পূর্ণ খরচ আমি একা বহন করব। তুমি আমার কাছে কজন লোক দাও। আমি নিজে তাদের কাজ তদারকি করব।
