হ্যাঁ, ফেদাঈদের সম্পর্কে জানি আমি। এখন বুঝতে পারছি তোমরাও ফেদাঈ। একথাও জানতাম ফেদাঈদের কাছে সুন্দরী তরুণী রয়েছে, যাদেরকে দুষ্কৃতকর্মে ব্যবহার করা হয়।
ওদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমার নাম লিজা।
তোমার সাথে তো আরেকজন ছিল?
তার নাম তেরেসা। বলল লিজা। সেই তো তোমাদেরকে হাশীশে নেশাগ্রস্ত করে এখানে নিয়ে এসেছে।
লিজা এর বেশী কিছু বলতে পারল না। হঠাৎ দরজার পাশে এসে দাঁড়াল তেরেসা। তেরেসা চোখের ইশারায় লিজাকে বেরিয়ে আসতে বললে, লিজা বাইরে গেল।
এখানে কি করছ? লিজাকে জিজ্ঞেস করল তেরেসা। এই লোকটির সাথে মিশে বসতে তোমার এতটুকু ঘৃণা লাগেনি? তুমি কি জানো না মুসলমানরা ঘৃণিত? তুমি কি বেঈমানীর শাস্তি ভোগ করতে চাও?
তেরেসার কথায় লিজা বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কোন কথাই বেরুল না তার মুখ থেকে। আবেগের বশীভূত হয়ে মুসলমান কর্তাব্যক্তিদের ব্ল্যাকমেইল করার কাজের প্রতি তার অনীহা জন্মে ছিল। তার মনে নিজ পেশার প্রতি ঘৃণা এতো প্রকট হয়ে পড়েছিল যে, তার পক্ষে আর নিজ পেশা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। আমিও তোমার মতই যুবতী। মুসলিম সৈনিক নাসেরকে আমারও ভাল লাগে। এমন সুদর্শন সুঠাম যুবককে কার না ভাল লাগবে। তুমি যদি বল যে, আমি এই যুবকের প্রেমে পড়ে গেছি; তাতেও আশ্চর্য বোধ করব না আমি। আমি বুঝি, এইসব মুসলিম উমারা, আর বয়স্ক মুসলিম দুর্নীতিবাজ আমলাদের প্রতি তোমার মনে প্রচণ্ড ঘৃণা, এদের হাতের পুতুল হতে তোমার মোটেও ইচ্ছে করে না, সব ঠিক কিন্তু তোমার মিশন ক্রুশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা আর প্রত্যেক মুসলমান তোমার জাতশত্রু। এদিকটি তুমি সামনে রাখো; তাহলে আর অসুবিধা হবে না। বলল তেরেসা।
না, না, তেরেসা। ওর প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আকর্ষণ নেই, তুমি ভুল বুঝছো, আতংকিত কণ্ঠে বলল লিজা।
যদি আকর্ষণই না থাকবে তাহলে ওর কাছে এভাবে গা জড়িয়ে বসেছিলে কেন?
কথা জড়িয়ে গেল লিজার। জড়ানো কণ্ঠে বলল, আমি ব্যাপারটি তোমাকে বুঝাতে পারব না, কি মনে করে যে ওর কাছে এভাবে বসলাম!
কি কথা বলেছে ওর সাথে?
না! তেমন বিশেষ কোন কথা হয়নি।
কর্তব্য কাজে অবহেলা করছো তুমি। এটা পরিষ্কার বেঈমানী। যার অনিবার্য শাস্তি মৃত্যু। বলল তেরেসা।
তেরেসা শোন! ওই বুড়োটার কাছে আমি একাকী যেতে পারব না। ও যদি আমার সাথে জোড়াজুড়ি করে তবে ওকে মারব না হয় নিজেই আত্মহত্যা করব।
তেরেসা একটি সুদৃশ্য পাথরের মতো। তার দেহ সৌন্দর্য আকর্ষণ করতো সবাইকে, সবাইকে কাছে টানতো সে; কিন্তু কাউকেই নিজের করে নিতো না। তার নিজের মধ্যে কারো প্রতি অনুরাগ-বিরাগ ছিল না। লিজা এখনও সেই জায়গা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। তেরেসা মানসিক অনুভূতিতে আক্রান্ত হয় না। রাগ-অনুরাগ, আবেগ-বিরাগ তার নিয়ন্ত্রণে।
আমি বুঝতেই পারিনি তুমি এতোটা আবেগপ্রবণ হয়ে উঠবে। এমনটি জানলে তোমাকে নিয়ে আসতাম না। কিন্তু এখানে আসা ছাড়া আমার কোন উপায়ও ছিল না। এই দুরবস্থার মধ্যে ত্রিপলী পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব ছিল না বলে সবচেয়ে নিকটবর্তী এই মিত্রদুর্গে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। লিজা! আমি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসব থেকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করবো এবং শেখ সিনানের দ্বারা তুমি যাতে পীড়িত না হও সে চেষ্টায়ও ত্রুটি করবো না। আমার অনুরোধ, এই দুঃসময়ে তুমি নিজের মর্যাদার ব্যাপারে এতোটা আবেগ প্রবণ হয়ো না।
তেরেসা! তোমাকে আমি মনের কথাটা বলেই ফেলি। বলল লিজা। আমি চাচ্ছি এই গোয়েন্দাদেরকে ব্যবহার করে এখান থেকে তুমিসহ পালিয়ে যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করতে। এদের যা সাহস এবং এদের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে আমি যা শুনেছি, তাতে আমার বিশ্বাস জন্মেছে, এদেরকে একটু সুযোগ করে দিলে ওরা আমাদের নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে। এপথ ছাড়া এখান থেকে মুক্তির আর কোন পথ দেখছি না।
এদের যোগ্যতা ও সাহসকে আমি সম্মান করি। বলল তেরেসা। কিন্তু তুমি কি একথা ভেবেছো, আমরা উভয়েই বা তুমি একা যদি এদের সাথে চলে যাও তবে এরা আমাদেরকে গন্তব্যে যেতে না দিয়ে ওদের সাথে নিয়ে যাবে। লিজা! মিথ্যা আশায় বুক বেঁধো না…… শোন! এখন তুমি গোসল করে কাপড় বদলে নাও। আমাদেরকে নৈশভোজে দাওয়াত করেছেন শেখ সিনান। তার সাথে তোমাকে কি করতে হবে তা আমি বলে দেবো। দৃশ্যতঃ হাবভাবে বুঝাবে, তুমি তার প্রতি বিরাগ নও এবং এখান থেকে পালানোর চিন্তাও তুমি করছো না। এই মাত্র আমি জানতে পেরেছি, হিরনের শাসক গোমশতগীন এখানে এসেছেন। গোমশতগীন কে তা তুমি জানো, এটাও জানো, আইয়ূবীর সবচেয়ে বড় স্বজাত শত্রু গোমশতগীন। এসব মুসলিম নেতাকে বহু কষ্টে আমরা হাত করেছি, তাকে তুমি নিজেদের লোক মনে করো।
* * *
লিজাকে তেরেসা এসে নিয়ে যাওয়ায় গভীর চিন্তায় পড়ে গেল নাসের। নিশ্চিত হলো সে, তরুণী দুজন জিন নয়, মানুষ। কিন্তু এটা বুঝে উঠতে পারছিল না, লিজা তাদের প্রতি এতোটা দয়ার্দ্র হয়ে উঠলো কেন? লিজা যখন তাকে বলল, হাশীশ খাইয়ে নেশাগ্রস্ত করে তাদেরকে এখানে নিয়ে এসেছে তারা, তখন সে বুঝল, ফিদাঈ সম্পর্কে ট্রেনিংকালেই অবগত করা হয়েছে তাদেরকে। তারা জানে ফেদাঈনরা সুন্দরী মেয়েদেরকে ব্যবহার করে। এই মেয়ে দুটোকে ব্যবহার করে হয়তো এরা চাচ্ছে তাদেরকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে।
